একটা সুদৃশ্য উপত্যকায় সান্যালসায়েবদের লোকেরা কাজ করছে। ছোট নদী আছে। তার দুধারে নিবিড় জঙ্গল। জঙ্গলের একদিকে খনি খোঁড়ার এবং মাটি পরীক্ষার কাজ চলছে। তাঁবুগুলো একটা টিলার গায়ে। কাজের চেয়ে হল্লাটা খুব বেশি মনে হল। সম্ভবত ইয়েতির আতঙ্কে সবাই জড়োসড়ো। এখানে ওখানে আগুন জ্বালানো হয়েছে। তার ওপর এখন নিজেদের জেনারেটর থেকে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আলোয় জায়গাটা দিনের মতো ফর্সা হয়ে রয়েছে। মনে হল, ইয়েতির কর্তাবাবার সাহস হবে না, আবার এখানে এসে ঢু মারে। কর্নেল জায়গাটা দেখতে দেখতে একটু হেসে ঠিক তাই বলে উঠলেন।
খাওয়ার পর ক্যাম্পচেয়ারে বসে সবাই যখন গল্পগুজব শুরু করেছে, আমি তখন তাবুর ভেতরে গড়িয়ে পড়েছি। শরীর একেবারে অচল। ঘুম পাচ্ছে প্রচণ্ড আতঙ্কও হচ্ছে—যদি ইয়েতি এসে আমারও গলা চেপে ধরে।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে অব্দি বাইরে ওদের কথাবার্তার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলুম। কর্নেল বলছিলেন—ইয়েতির চামড়া কেমন মনে হয়েছিল বললেন মিঃ সান্যাল? খসখসে-শক্ত, তাই না? দ্যাটস পসিবি।
হংসধ্বজবাবুর গলা শুনলুম।-হ্যাঁ, খসখসে, শক্ত! কেমন যেন প্লাস্টার আঁটা মানুষের মতো।…
তারপর ঘুমিয়ে গেছি। এমন গভীর ঘুম জীবনে ঘুমোইনি। ইয়েতি এলে দিব্যি আমাকে মেরে যেতে পারত। ঘুম যখন ভাঙল, অভ্যাসমতো হাতঘড়ির দিকে তাকালুমছটা। কিন্তু প্রচুর রোদ ফুটেছে বাইরে। অরুণাচল কি না। তখন নিজের ঘুমের প্রতি ব্যাজার হলুম। এমন ঘুম তো কলকাতায় দেখি না আসতে! এই ইয়েতির জঙ্গলে এত ঘুম!
পাশের ক্যাম্পখাটের দিকে তাকিয়ে দেখি বুড়ো নেই। উঠে পড়লুম। বাইরে যেতেই দেখা হল হংসধ্বজের সঙ্গে। বললেন—গুড মর্নিং মিঃ চৌধুরি!
—গুড মর্নিং! কর্নেল কোথায়?
-উনি তো পাঁচটায় বেরিয়েছেন। ওরা নিষেধ করেছিল—শোনেননি। এখন আগরওয়াল ওঁর খোঁজে গেল। … উদ্বিগ্ন মুখে হংসধ্বজ একথা বললেন।
আমি হেসে বললুম—ভাববেন না। ওঁর নানান বাতিক। সঙ্গে অদ্ভুত ক্যামেরা দেখেছেন? বাইনাকুলারটাও আশা করি দেখেছেন? হয়তো দেখবেন, ইয়েতির ছবি তুলে নিয়েই ফিরে আসবেন।
হংসধ্বজ তবু আশ্বস্ত হতে পারলেন না। বললেন—এলাকার উপজাতীয় কোনও কোনও গোষ্ঠী এখনও খানিকটা বন্য স্বভাবের এবং হিংস্র। সভ্য মানুষ দেখলে মেরে ফেলে। তাছাড়া বৈরী নাগারাও থাকতে পারে! বেশিদূর গিয়ে পড়লে……
বাধা দিয়ে বললুম— কর্নেল তো বলেছিলেন, এলাকা ওঁর চেনা। ভাববেন না। ওই বুড়োকে তো আমি চিনি।
চা-ব্রেকফাস্টের পর আমাকে হংসধ্বজ ওঁদের খনির কাজ দেখাতে নিয়ে গেলেন। সব ঘুরে দেখতে দশটা বেজে গেল। তারপর কর্নেল ফিরলেন। সঙ্গে আগরওয়ালও আছেন। আগরওয়াল এসেই বললেন—সান্যাল! ইউরেকা! এইজন্যেই তো আমি তোমাকে বলেছিলুম-কর্নেল সায়েব ছাড়া এই ইয়েতি রহস্য ফাঁস করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। ক্ল পাওয়া গেছে।
হংসধ্বজ অবাক হয়ে বললেন তার মানে?
–কর্নেল এই ইয়েতির পায়ের ছাপ খুঁজে পেয়েছেন। আমিও গিয়ে স্বচক্ষে দেখলুম। একেবারে মানুষের মতো!
কর্নেল একটু হেসে বললেন—না, কতকটা মানুষের মতো!
হংসধ্বজ উত্তেজিত স্বরে প্রশ্ন করলেন—কোথায় দেখলেন? কত দূরে? কাছাকাছি নাকি?
—খুব বেশি দূরে নয়। ওই নদীর বালিতে—মাত্র তিনশো গজ দূরে।
হংসধ্বজের মুখ সাদা হয়ে গেল।—সর্বনাশ! বলেন কী!
আগরওয়ালকে দেখে মনে হল, ভয় পাননি। বললেন—শুধু তাই নয়। ওই পায়ের ছাপ অনুসরণ করে আমরা ওপারের পাহাড়ের একটা গুহার সামনে পৌঁছলুম। গুহায় অবশ্য ঢুকতে সাহস পাইনি। পরে লোকজন নিয়ে ঢুকব বলে দুজনে বড় একটা পাথর ঠেলাঠেলি করে মুখটা বন্ধ করে লেমু। সান্যাল, অবিকল সেই রাতের মতো বিটকেল গন্ধও আমি টের পেয়েছি সেখানে।
কর্নেল মাথা নেড়ে বললেন—আমি অবশ্য পাইনি।
আমি বললুম-ইয়েতির কাছে ওই পাথরটা কি বাধা হবে মনে করেন কর্নেল?
ও তো এক ধাক্কায় গুহার দরজা ফাঁক করে বেরিয়ে আসবে।
কর্নেল মাথা নাড়লেন আবার।—ইউ আর রাইট, জয়ন্ত।
—তাহলে পাথর ঠেলাঠেলি করতে গেলেন কেন, শুনি?
—আগরওয়াল সায়েব জেদ করলেন, তাই।
আগরওয়াল ব্যস্তভাবে বললেন-কর্নেল! পাথরটা কিন্তু এমনভাবে খাঁজে আটকে দিয়েছি আমরা যে গুহার ভেতর থেকে ঠেলে সরানো অসম্ভব।
কর্নেল তাঁর দিকে ঘুরে বললেন—ইউ আর রাইট।
আমি হতভম্ব। আমাকেও রাইট বললেন, আবার আগরয়ালকেও রাইট বলেন? অর্থাৎ ইয়েতিটা গুহার মুখের পাথর ঠেলে বেরিয়ে আসতে পারবে এবং পারবে না—এমন পরস্পরবিরোধী কথা কেন বললেন কর্নেল? বুড়িয়ে বাহাতুরে ধরেছে নির্ঘাৎ। মনে মনে হাসলুম—আবার উদ্বিগ্নও হলুম।
হংসধ্বজ ভয়ে ভয়ে বললেন—আপনি কি মনে করেন, সত্যি গুহার মধ্যে ইয়েতি আছে?
কর্নেল আবার মাথা নাড়লেন।—জানি না। তবে পায়ের ছাপ আমরা গুহার ভেতর অব্দি দেখেছি। এটুকুই বলতে পারি। যাইহোক, আপনারা তোক জোগাড় করুন। দুঘন্টার মধ্যে আমরা বেরোব…..
একটু পরেই দেখি, খবরটা কীভাবে পাচার হয়ে গেছে। ইতস্তত জটলা এবং আলোচনা চলছে। কুলিকামিন, সার্ভেয়ার গ্রুপ সবাই উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। হংসধ্বজ এবং আগরওয়াল বেগতিক দেখে সবাইকে সাহস দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সেই ফাঁকে কর্নেল আমার হাত ধরে টানলেন। তারপর একটা গাছের তলায় গিয়ে চাপা এবং গম্ভীরস্বরে বললেন—জয়ন্ত! এক অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছি এখানে এসে। মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না। কিন্তু এখানে এসে যা বুঝতে পারছি তাতে….
