কিন্তু রোজই তো আলো লোক মরে না। তাছাড়া আজকাল কত সব ওষুধ বেরিয়েছে। সহজে লোক মরে না। এদিকে বটুকবাবু এবং ক্লাবের ছেলেদের যেন নেশা ধরে গেছে মড়া বয়ে। মড়া না পেলে মন ভালো থাকে না। সবই অভ্যাস!
তাই কারুর গুরুতর অসুখবিসুখ হলেই ওরা তক্কে তক্কে থাকেন। বাড়ির আনাচেকানাচে ওত পেতে বেড়ান। তারপর যেই কান্নাকাটি শোনেন, অমনি বটুকবাবু একলাফে বাড়িতে ঢুকে হাঁক দেন, কোথায় লাশ?পেছনে তার চ্যালারা বাড়ি কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, বলো হরি হরি বোল।
গণ্ডগোল ঘটেছে দুদিন আগে। সেদিন ছিল শুক্রবার।
মেদিগঞ্জে দুজন প্রমথবাবু আছেন। একজন হলেন প্রমথ মিত্তির তিনি স্কুলমাস্টার। অন্যজন হলেন প্রমথ বোস-তিনি পোস্টমাস্টার। দুজনকেই লোকে প্রমথমাস্টার বলে। দুজনেরই বয়স পঞ্চাশের ওধারে। দুজনেই রোগা, খেকুটে চেহারার মানুষ। একজন ভোগেন অম্বলে, অন্যজনের লিভার খারাপ।
শুক্রবার সন্ধ্যার একটু আগে সতু নামে ক্লাবের একটি ছেলে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে খবর দিল, প্রমথমাস্টার টেসে গেছে। বাজারে গিয়ে এইমাত্র শুনে এসেছে সে। কিন্তু কোন প্রমথমাস্টার, সেটার হদিস করতে পারেনি।
বটুকবাবু, বললেন, চল তবে। আগে কাছেরটাই দেখি।
কাছেরটা মানে স্কুলমাস্টার প্রমথবাবু-প্রমথ মিত্তির। তিনি যদি না কেঁসে থাকেন, তাহলে পোস্টমাস্টার প্রমথবাবু অর্থাৎ প্রমথ বোসের কেঁসে যাওয়া অবধারিত। মৃত্যুর খবর তো আর মিথ্যা রটতে পারে না। বিশেষ করে দুজনেই ওঁরা নিরীহ সজ্জন মানুষ বলে পরিচিত।
প্রমথ মিত্তিরের বাড়ির কাছে যেতেই কান্নাকাটি শোনা গেল। অমনি বটুকবাবু গামছাখানা একটানে কোমরে বেঁধে বাড়ি ঢুকে পড়লেন। তারপর যথারীতি হাঁক চাড়লেন, লাশ কোথায়?
এদিকে ওঁর চ্যালারাও পেছন-পেছন ঢুকে চেঁচিয়ে উঠল, বলো হরি, হরি বোল।
অমনি কান্নাকাটি গেল থেমে। তারপর ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল মাস্টার-গিন্নি। রণরঙ্গিণী চেহারা, বাঁ হাতে খ্যাংরা আঁটা। ডান হাত কোমরে আঁচল জড়াতে জড়াতে হুংকার দিলেন, তবে রে মড়াখেকো শকুনের পাল! তোদের জ্বালায় একটু কাঁদবারও জো নেই রে হতচ্ছাড়ারা!
মাস্টার-গিন্নি দজ্জাল মহিলা। ব্যায়ামবীরেরও তোয়াক্কা করেন না। বেগতিক দেখে বটুকবাবু তার দলবল নিয়ে কেটে পড়লেন। কিন্তু খামোখা কান্নাকাটির কী মানে হয়! বটুকবাবু বললেন, আয়রে পোস্টমাস্টার প্রমথ বোসের বাড়ি যাই।
শ্মশানবন্ধু ক্লাব দৌড়ে চলল পোস্টমাস্টারের বাড়ির দিকে।
প্রমথ বোসের বাড়িটা একেবারে গঙ্গার ধারে নিরিবিলি জায়গায়। চারদিকে গাছপালা, তার মধ্যে একটা পুরোনো একতলা বাড়ি। কাছাকাছি গিয়ে ভল্টু বলল, কই? কান্নাকাটি তো শোনা যাচ্ছে না।
বটুকবাবু বললে, ধূর বোকা! পোস্টমাস্টার বাবুর কে আছে যে কাঁদবে? উনি একা থাকেন না?
তপু বলল, কেন–ওঁর চাকর ভোলা তো আছে। তার কাঁদা উচিত!
কিন্তু বাড়ি একেবারে চুপচাপ। সদর দরজা হাট করে খোলা। বেলা পড়ে এসেছে। দিনের আলো কমে গেছে। ডেকে ভোলার সাড়া পাওয়া গেল না। একটা ঘরে আলো জ্বলছে। বটুকবাবু বললেন, তোরা চুপচাপ উঠোনে দাঁড়িয়ে থাক। আমি দেখে আসি ব্যাপারটা।
বটুকবাবু বারান্দায় উঠে দেখলেন ঘরের দরজা ফাঁক হয়ে আছে। চল্লিশ পাওয়ারের বাশ্বের আলো তাতে পুরো দেওয়ালে আলো খেলে না একেবারে। উঁকি মারতেই চোখে পড়ল, খাটে পোস্টমাস্টার চিত হয়ে শুয়ে আছেন। বটুকবাবু কাশলেন। ডাকলেন। তবু সাড়া নেই। তখন ভেতরে ঢুকে গেলেন।
প্রমথবাবুর চোখ খোলা। কিন্তু চোখের পাতা স্থির। শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ। কপালে হাত রেখে বটুকবাবুর মনে হল, ভীষণ ঠান্ডা হিম। অমনি চেঁচিয়ে উঠলেন, লাশ পাওয়া গেছে ডোমপাড়া থেকে খাটুলি নিয়ে আয় শিগগির!
চ্যালারা চেঁচিয়ে উঠল, বলো হরি, হরি বোল সতু আর ভল্টু দৌড়োল ডোমপাড়া খাটুলি কিনতে। খরচ ক্লাবের।
শ্মশান খাটুলি চলে এল মিনিট দশেকের মধ্যে। এদিকে বালিশের নিচে থেকে চাবি নিয়ে ঘরে তালা এঁটে প্রমথ বোসের মড়া খাটুলিতে চাপিয়ে হরিধ্বনি দিতে দিতে শ্মশানবন্ধু ক্লাব ছুটে চলেছে শ্মশানের দিকে। ততক্ষণে আবছা আঁধার ঘনিয়ে এসেছে।
শ্মশানের নীচেই গঙ্গা। একটা তেচালা ঘরে ঘাটোয়ারি বাবুর অফিস। লণ্ঠন জ্বেলে বসেছিলেন ঘাটোয়ারি বাবু। মেঝেয় বসে বিড়ি ফুঁকছিল মধু ডোম। সবে তেচালার সামনে মড়া নামিয়েছেন, এসে গেল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। খাটুলি তুলে তেচালায় ঢোকানো হল!
ঘাটোয়ারিবাবু বললেন, কার মড়া বটুকবাবু?
বটুকবাবু বললেন, পোস্টমাস্টার প্রমথবাবুর।
কিসে গেলেন?
তা বলতে পারব না মশাই। বটুকবাবু বললেন, নিশ্চয় অসুখ হয়েছিল। বিছানায় মরে পড়েছিলেন। শ্মশানে নিয়ে এলুম।
ঘাটোয়ারিবাবু বললেন, তাহলে যে একটা ডেথ সার্টিফিকেট চাই বটুকবাবু।
কেন কেন? বটুকবাবু খচে গেলেন। এত মড়া এনেছি, কারুর তো চাননি মশাই!
আহা ইনি যে সরকারি লোক। পাবলিকের মড়া নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। বুঝলেন না? আইনের ব্যাপার!
ধূর মশাই, এতকাল আইন দেখাননি। এখন আইন দেখাচ্ছেন।
ঘাটোয়ারিবাবু গোঁ ধরে বললেন, না মশাই। বিনা ডেথ সার্টিফিকেটে আমি মড়া পোড়াতে দেব এখানে।
বটুকবাবু ওঁকে তুলে গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলবেন কিনা ভাবছেন, সতু বলল, ঠিক আছে বটুকদা, কুঞ্জ ডাক্তারের কাছ থেকে এক্ষুনি সার্টিফিকেট এনে দিচ্ছি।
