যখন কর্নেলের তিনতলার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছোলুম, তখন প্রায় পাঁচটা বাজে। রাস্তায় যা জ্যাম। সটান ছাদে ওঁর প্ল্যান্ট ওয়ার্ল্ডে চলে গেলুম। দেখলুম, একটা বিদঘুটে ক্যাকটাসের দিকে ঝুঁকে আছেন প্রকৃতিবিদ। মাথায় সত্যিই কেপ। কাছে গিয়ে বললুম, আশ্চর্য মানুষ আপনি!
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। মুচকি হেসে বললেন, আমার চেয়েও আশ্চর্য মানুষ বিস্তর আছে, ডার্লিং! চলো, নিচে যাই। মুরারিবাবুর আসার সময় হয়েছে।
আপনি গিয়েছিলেন ওঁর ফ্ল্যাটে? কী দেখলেন? ছড়িটা বদলাতে পারলেন?
হুঁউ। আসলে জয়ন্ত, টাক ও দাড়ির সঙ্গে টাক ও দাড়ির বন্ধুত্ব খুব ঝটপট গড়ে ওঠে। এটা বরাবর দেখে আসছি।
নিচের ড্রইংরুমে ঢুকে কর্নেল বাথরুমে গেলেন গার্ডেনিং-এর জোব্বা বদলে হাত ধুতে! শুনলুম, গলা চড়িয়ে ষষ্ঠীকে কড়া কফির হুকুম জারি করছেন। এই সময় কলিংবেল বাজল। দরজা খুলে দিলুম। হন্তদন্ত ঢুকে পড়লেন মুরারিমোহন ধাড়া। দম-আটকানো গলায় বললেন, গিয়েছিলেন? কাজ হয়েছে তো?
কর্নেল পর্দা তুলে বললেন, বসুন, আসছি। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
মুরারিবাবুর সোফায় বসে উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, আমার ঠাকুরদার কেনা হিরে, জয়ন্তবাবু! এক সায়েব দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল মাইনিং বিজনেসে। ঠাকুরদাকে মাত্র দেড় হাজারে বেচেছিল। তা সেসব কথা পরে বলবখন। বলুন, খবর কী, আমার হার্ট ধুকুপুতু করছে খালি। বুকে হাত দিলেন মুরারিবাবু।
কর্নেল সেইরকম একটি ছড়ি হাতে ফিরে এলেন। মুরারিবাবু খপ করে সেটি প্রায় কেড়ে নিয়ে বাঁটের পাঁচ ঘোরাতে শুরু করলেন। খি খি করে হেসে বললেন, জ্যাম হয়ে গেছে প্যাঁচ। বহুকাল খোলা হয়নি কিনা।
কর্নেল চোখ বুজে দুলতে দুলতে বললেন, আগে একটু কফি খান পাঁচুবাবু? তারপর কথা হবে।
মুরারিবাবু চমকে উঠলেন। পাঁচুবাবু! ও কী বলছেন কর্নেলস্যার? আমার নাম
কর্নেল চোখ বুজেই বললেন, প্যাঁচ খুলবে না পাঁচুবাবু! কারণ ওটা আপনার কেনা সেই ছড়িটাই।
মুরারিবাবু কিংবা পাঁচুবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কী অদ্ভুত রসিকতা!
রসিকতা আপনার কম নয়, পাঁচুবাবু! কর্নেল চোখ খুলে ফিক করে হাসলেন। আপনি আমার হাত দিয়ে আপনার মনিব মুরারিবাবুর হিরে চুরি করতে চেয়েছিলেন। একেই গ্রাম্য প্রবাদে বলে, অন্যের হাতে হুঁকো খাওয়া।
মুরারিবাবু কিংবা পাঁচুবাবু দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই পাশের ঘরের অন্য দরজার পর্দা তুলে এক ধুতিপাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক বেরুলেন। ঢ্যাঙা, মাথায় টাক, মুখে দাড়ি, তিনি তবে রে ব্যাটা কেঁচো বলে গর্জন করে ঝাঁপ দিলেন এবং পাঁচুবাবুর পাঞ্জাবির কলার খামচে ধরলেন। তারপর একই দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন এক পুলিশ অফিসার এবং দুজন সেপাই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেল। আমি হাঁ। তক্ষুনি দলটা বেরিয়ে গেলে ঘুরে কর্নেলের দিকে তাকালুম। স্বপ্ন, না সত্যি?
কর্নেল চোখ বুজে দুলতে শুরু করেছেন ফের। বললেন, হুঁ, একেই বলে পরের হাতে হুঁকো খাওয়া। মাঝখান থেকে পাঁচুবাবুর বিজ্ঞাপন-খরচটা গচ্চা গেল। লম্বাচওড়া একটা গুলগল্পও কাজে আসল না। ডার্লিং তোমার অবশ্য একটা বড়ো লাভ হল। বড়োবাজারের শিশি-বোতলের কারবারি মুরারিমোহন ধাড়ার কর্মচারী পাঁচু বা পঞ্চানন্দকে নিয়ে কাগজে দারুণ খবর হবে। ..
২.০৬ শ্মশান রহস্য
০১.
ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে নমস্কার করে বললেন, আমি আসছি মেদিগঞ্জ থেকে। আমার নাম স্যার বটুক রায়। খুব গন্ডগোলে পড়ে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার প্রকাণ্ড একটা ইংরেজি বই খুলে বসেছিলেন। দাঁতের ফাঁকে চুরুট। মুখ তুলে দেখে বললেন, আপনি বসুন আগে।
ভদ্রলোকের দিকে হাঁ করে তাকিয়েছিলুম। সত্যি বলতে কী, ইনি যেন নরদানব। গর্দানে মাংস ঠেলে উঠেছে। বাহুতে দাগড়া দাগড়া পেশি ঠেলে বেরিয়ে আছে। গায়ের রং কুচকুচে কালো। মাথার চুল কদমফুলি! অর্থাৎ ন্যাড়া হবার পর যেমন চুল গজায়। দেখার মতো গোঁফখানাও বটে। গায়ে স্পোর্টিং গেঞ্জি, পরনে আঁটো প্যান্ট। পায়ের বিশাল চম্পল যে অর্ডার দিয়ে বানাতে হয়েছে, তাতে আমি নিঃসন্দেহ। কবজিতে চাদির বালা এবং গলায় মিহি সোনার চেন ঝিকমিক করছিল। ভদ্রলোক সাবধানেই বসলেন সোফায়। তবু মনে হল, সোফাটা যে কোনো মুহূর্তে মড়াত করে ভেঙে পড়বে।
ষষ্ঠীচরণ পর্দার ফাঁকে মুণ্ডু বাড়িয়েছিল। তার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠেছে। কর্নেল বললেন, ষষ্ঠী, কফি নিয়ে আয়। তখন সে নরদানব দেখছে। কর্নেল চোখ কটমটিয়ে তাকাতেই সে অদৃশ্য হল।
কর্নেল বললেন, আপনি শরীরচর্চা করেন বুঝি?
ব্যায়ামবীর সলজ্জ হাসলেন। এক সময় করতুম স্যার! বার তিনেক দেহশ্রী খেতাব পেয়েছিলুম। তবে এখন বয়স হয়েছে। নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। আর ওসব হয়ে ওঠে না।
আপনার গণ্ডগোলটা কী, বলুন এবার।
ব্যায়ামবীর বটুক রায়ের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। তারপর উনি যে কাহিনি শোনালেন, তা যেমন অদ্ভুত, তেমনি রোমাঞ্চকর।
মেদিগঞ্জ বহরমপুর থেকে সামান্য দুরে গঙ্গার ধারে একটা পুরোনো গঞ্জ ছোটোখাটো একটা শহরই বলা যায়। বটুকবাবু সম্প্রতি কিছুকাল আগে একটা ক্লাব করেছেন। ক্লাবটার নাম শ্মশানবন্ধু ক্লাব। মেদিগঞ্জের সব মড়া এই ক্লাবের ছেলেরাই বটুকবাবুর নেতৃত্বে শ্মশানে নিয়ে যায়। সকারের সব দায়িত্ব তারা নেয়। গরিব মানুষের মড়া কিংবা রাস্তাঘাটের বেওয়ারিশ মড়া, এখন আর আগের মতো গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয় না। শাস্ত্রমতে চিতায় পোড়ে এবং সকারাদি হয়। সব খরচ ক্লাবের।
