আরও একটু রহস্য আছে। কর্নেলের কাছে আসার পথে ইন্দ্রোদ্ধার দৈব চিকিৎসালয়ে গিয়েছিলেন টাক পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় তো বটেই কিন্তু গিয়ে দেখেন, ঘরে তালা। সাইনবোর্ড নেই। খোঁজ করলে কেউ কিছু বলতে পারল না। কর্নেলের কীর্তিকাহিনি মুরারিবাবু খবরের কাগজে পড়েছেন। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা থেকেই তার ঠিকানা জোগাড় করেছেন। এই দুর্বিপাক থেকে তিনি ছাড়া আর কেউ তাকে উদ্ধার করতে পারবেন না বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। ….
.
ছড়ি-বদল পর্ব
ঘটনাটি শোনার পর গোয়েন্দাপ্রবর মন্তব্য করলেন, হু টাকের আমি টাকের তুমি টাক দিয়ে যায় চেনা।
বললাম, উঁহু, গোঁফ। সুকুমার রায়ের গোঁফচুরি পদ্যে আছে।
কর্নেল হাসলেন। যাই হোক, এক্ষেত্রে টাক-চুরি গিয়েই সমস্যা বেধেছে। বলে মুরারিবাবুর দিকে তাকালেন। মুরারিবাবুর, সেলফ-আইডেন্টিটি ব্যাপারটা সত্যিই গুরুতর। আমিই যে আমি, আপনি মুরারিবাবুই যে মুরারিবাবু, কোনো-কোনো সময়ে প্রমাণ করা কঠিন হয়। তবে এ জন্য আদালত আছে।
মুরারিবাবু করুণ স্বরে বললেন, আছে। আদালতে তো যেতেই হবে। রেলের কর্তারা এবং আমার কলিগরা আছেন। নানা জায়গায় আমার আত্মীয়স্বজন আছেন। টেলিগ্রাম-ট্রাংককল করে সবাইকে ডাকব। ব্যারিস্টারের কাছে যাব। সবই করব। কিন্তু সে তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু ইতিমধ্যে যে সর্বনাশ হবার, তা ঘটতে চলেছে। কারণ স্পষ্ট বুঝতে পারছি, বিজ্ঞাপন দিয়ে চক্রান্ত করে কেউ বা কারা আমার ফ্ল্যাটে ঢুকতে চেয়েছিল, এবং ঢুকে পড়েছে। কেন এ চক্রান্ত, কেন আমার ফ্ল্যাটে ঢুকেছে, সেটা নিয়েই আপাতত দুর্ভাবনা।
কেন? কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন। রহস্যের গন্ধটা এবার ঝাঝালো তো বটেই।
মুরারিবাবু চাপা স্বরে বললেন, হিরে। একটা-দুটো নয়, তিন-তিনটে হিরে। দাম এ বাজারে কমপক্ষে দেড়লাখ টাকা।
কর্নেল নড়ে বসলেন। কোথায় রেখেছেন হিরেগুলো?
মুরারিবাবু তাঁর কালোরঙের ছড়িটা দেখিয়ে বললেন, অবিকল এইরকম একটা ছড়ির ভেতরে। মাথাটায় পাঁচ আছে। সেজন্য ছড়িটা সব সময় হাতে রাখতুম। কাল বিজ্ঞাপনটা দেখেই তাড়াহুড়ো বেরুতে গিয়ে ছড়িটা নিতে ভুলে গিয়েছিলুম। বুঝলেন না? টাক পড়া অব্দি কলিগরা তো বটেই, যে দেখত ঠাট্টাতামাশা করত। বেজায় বিদঘুটে টাক কিনা! আপনার টাক অবশ্য মানানসই। তো
কর্নেল ওঁর কথার ওপর বললেন, এই ছড়িটা নতুন কিনেছেন–আসার পথে।
ঠিক ধরেছেন। নিউমার্কেটের ওখান থেকে কিনে আনলুম। মুরারিবাবু ছড়িটা এগিয়ে দিলেন। ফিশফিশ করে বললেন, ওরা হিরেগুলো খুঁজে হন্যে হচ্ছে। পাবে না। তবে বলা যায় না কিছু। যদি দৈবাৎ ছড়িটার বাঁট খুলে ফেলে–তার আগেই দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। আপনার হাতে ধরে বলছি কর্নেলস্যার! আপনি সব পারেন। কোনও ছুতো করে এই ছড়ি হাতে আমার ফ্ল্যাটে গিয়ে আপনি আগে ঢুকুন। আলাপ জুড়ে দিন। তারপর আপনার এই অ্যাসিস্ট্যান্ট ভদ্রলোক গিয়ে কলিং বেল টিপবেন।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, জয়ন্ত আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট নয়। খবরের কাগজের রিপোর্টার।
মুরারিবাবুর সঙ্গে সঙ্গে আমাকে নমস্কার করে বললেন, তাই বলুন! কাগজে কর্নেলের কীর্তিকলাপ তো আপনিই লেখেন। দারুণ আপনার লেখার হাত, মশাই! বলে ফের ফিশফিশিয়ে উঠলেন। তাহলে তো আরও চান্স! রিপোর্টার যেতেই পারে ওখানে। কারণ একটা বিচিত্র ঘটনা ঘটেছে। কে প্রকৃত মুরারিমোহন ধাড়া এই নিয়ে অন্তর্তদন্ত করা খুব স্বাভাবিক। কর্নেলস্যার যাওয়ার মিনিট কতক পরে জয়ন্তবাবু যাবেন। জাল মুরারি তক্ক করবে দরজায় দাঁড়িয়ে। সেই ফাঁকে কর্নেলস্যার দেয়ালের ব্র্যাকেটে ঝোলানো ছড়িটা হাতিয়ে এই ছড়িটা রাখবেন। ব্যাটা টেরই পাবে না। বাকিটা সহজ।
ছড়িটা কর্নেল নিলেন। তারপর কুণ্ঠিতভাবে বললেন, যদি কিছু মনে না করেন, আপনার চুল গজানোটা একটু দেখতে চাই।
মুরারিবাবু মাথা বাড়িয়ে বললেন, আলবাত দেখবেন। দেখুন! মিরাল বলা যায়।
কর্নেল একটুখানি হেসেই বললেন, সত্যিই মিরাল। ভেবেছিলুম, আঠা দিয়ে পরচুলা পরিয়েছে নাকি। তা নয়। প্রকৃতই চুল ঠিক আছে, আপনি সন্ধ্যা ছটা নাগাদ আসুন।
মুরারিবাবু আশ্বস্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে কর্নেল বললেন, তুমি সম্ভবত কী জিজ্ঞেস করার জন্য উশখুশ করেছিলে, ডার্লিং!
উত্তেজনা নিশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে গেল। বললুম, ছড়ি বদলানোটা রিকি হবে না? যদি দৈবাৎ
কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, রিস্ক না নিলে রহস্য ভেদ করা তো সম্ভব হয় না, ডার্লিং!
কখন বেরুবেন ভাবছেন?
কর্নেল চোখ বুজে দুলতে দুলতে এবং অভ্যাসে সাদা দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, যাবার সময় তোমার আপিস হয়ে তোমাকে ডেকে নেবখন। …
.
হুঁকো বিষয়ক প্রবাদ
দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার আপিসে অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছি, কর্নেলের পাত্তা নেই। দুটোয় ফোন করলাম। ষষ্ঠী বলল, বাবামশাই তো লাঞ্চো খেয়েই বেইরেছেন। তিনটে বাজল। চারটে বাজল। পাঁচটায় উদ্বিগ্ন হয়ে বেরিয়ে পড়ার আগে আবার ফোন করলুম। ষষ্ঠী ফোন ধরে বলল, বাবামশাই এই মাত্তর ফিরেছেন। ছাদে গেছেন। কেপ পরেই গেছেন। বুঝিলেন না কাগুঁজে দাদাবাবু? কাক-কাক! রাগে অভিমানে ফোন রেখে ভাবলুম, এর অর্থ কী? আমাকে নিয়ে। বেরুনোর কথা। অথচ একা বেরিয়েছিলেন। হলটা কী?
