হালদারমশাই আনমনে বললেন, -হঃ! বুঝছি।
কী বুঝলেন তা অবশ্য বললেন না…
২.০৫ টাক এবং ছড়ি রহস্য
টাক এবং ছড়ি রহস্য
কাকতালীয় যোগ
সেদিন সকালে আমার প্রাজ্ঞ বন্ধু স্বনামধন্য কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ডেরায় ঢুকে আমি অবাক। একটি ছোট্ট ডিমালো আয়না মুখের ওপর তুলে উনি নিজের বিশাল টাকটি খুঁটিয়ে দেখছেন। বললেন, এসো ডার্লিং। তোমার কথাই ভাবছিলুম।
বললুম, টাকের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?
আছে। কর্নেল আয়নাটি টেবিলে রেখে একটু হাসলেন। কারণ একটি বিজ্ঞাপন। যেটি তোমাদেরই দৈনিক পত্রিকায় সম্প্রতি বেরিয়েছে। পড়ে দেখতে পারো।
উনি একটা বিজ্ঞাপনের কাটিং এগিয়ে দিলেন। পড়ে দেখি বেশ মজার একটা পদ্য।
টাক! টাক!! টাক!!!
ট্রাই ইওর লাক
যদি থাকে দাড়ি
সুফল তাড়াতাড়ি
ইন্দ্রোদ্ধার দৈব চিকিৎসালয়,
১১১/১ পি. খাঁদু মিস্তিরি লেন,
কলিকাতা ১৩।
বি. দ্র.আগে টাক পরীক্ষা করিয়া তবে ভর্তি। ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। দরাদরি নিষিদ্ধ।
বললুম, ইন্দ্রোদ্ধারটা বোঝা যাচ্ছে না তো?
কর্নেল বললেন, ইন্দ্র মানে কালো চুল। তাই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে টাক পড়াকে ইন্দ্রলুপ্ত বলা হয়।
কিন্তু হঠাৎ টাক নিয়ে আপনি চিন্তিত কেন? এতদিন তো টাককে জ্ঞানী ও দার্শনিকদের লক্ষণ বলে খুব গালভরা বুলি আউড়িয়েছেন! আজ আবার
কাক। কর্নেল বিমর্ষমুখে বললেন। কাকের অত্যাচারে, জয়ন্ত! টাকের সঙ্গে কাকেরও গুঢ় সম্পর্ক আছে।
ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে কফি আনছিল। কথাটা শুনে গম্ভীর মুখে বলল, এতবার করে মনে পড়িয়ে দিই, ছাদে যাবার সময় কেপ পরে যান। বাবামশাই তবু কথা কানে করবেন না। কাকের দোষটা কী?
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে তাকালে ষষ্ঠী ট্রে রেখে কেটে পড়ল। ব্যাপারটা বুঝতে পারলুম। ছাদের বাগানে গিয়ে আবার কাকের ঠোকর খেয়েছেন। তবে বাগান না বলে জঙ্গল বলাই ভালো। যতরাজ্যের বিদঘুটে গড়নের ক্যাকটাস, উদ্ভুট্টে সব অর্কিড আর দুর্লভ প্রজাতির ঝোপঝাড়। পাশের বাড়ির গা-ঘেঁষে ওঠা বুড়ো নিমগাছটা সম্ভবত কলকাতার কাকদের রাজধানী। তাড়ানোর জন্য একবার পটকা ছুঁড়ে নাকি মামলা বাধার উপক্রম হয়েছিল। কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম, ষষ্ঠী ঠিক বলেছে। আপনার টাককে কাকেরা পাকা বেল-টেল ভাবে। অবশ্য বেল পাকলে কাকের কী বলে একটা কথাও চালু আছে।
কর্নেল কফির সঙ্গে চুরুটও টানেন। জ্বেলে নিয়ে ধোঁয়ার ভেতরে বললেন, বেল কেন? তালের সঙ্গেও কাকের সম্পর্ক জুড়ে দিয়ে একটা কথা চালু আছে।
ঝটপট বললুম, জানি। কাকতালীয় যোগ। কাক এসে তালগাছে বসল, সেই মুহূর্তে একটা পাকা তাল খসে পড়ল। নিছক আকস্মিক যোগাযোগ। লোকে যদি ভাবে কাকের সঙ্গে তাল পড়ার সম্পর্ক আছে, তাহলে সেটা বোকামি।
ডার্লিং, প্রাচীন ন্যায়শাস্ত্রে কাকতালীয় ন্যায় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আছে। কর্নেল সায় দেবার ভঙ্গিতে বললেন। যাই হোক, বিজ্ঞাপনটা দেখা অব্দি মন ঠিক করতে পারছি না। কী করি তুমিই বলো!
যদি থাকে দাড়ি/সুফল তাড়াতাড়ি। আপনার দাড়ি আছে। অতএব ট্রাই ইয়োর লাক।
তাহলে চলল! কফিটা শেষ করে এখনই বেরিয়ে পড়া যাক।
বেরিয়ে পড়া গেল না। কারণ কলিংবেল বাজল এবং আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই এক ভদ্রলোক আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঢুকে ধপাস করে সোফায় বসে পড়লেন। তারপর দুহাতে মাথায় চুলকালো কেঁকড়া একরাশ চুল আঁকড়ে ধরে আর্তনাদের সুরে বলে উঠলেন, ওঃ টাক। হায় রে টাক।
কর্নেল হাঁ! আমিও হাঁ। তবে এটুকু বুঝলুম, এই হল কাকতালীয় যোগ। একেবারে হাতেনাতে আর কী। …
.
টাক নিয়ে দুর্বিপাক
গরম কফি খাইয়ে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ভদ্রলোককে শান্ত-সুস্থ করা হল। তার নাম মুরারিমোহন ধাড়া। ষাটের ওধারে বয়স। ঢ্যাঙা, রোগা গড়ন। বেজায় লম্বা নাক। মুখে গোঁফ দাড়ি নেই। তবে মাথার চুল দেখার মতো–উজ্জ্বল কালো, মাঝখানে সিথি। পরনে ধুতি ও তাঁতের ছাইরঙা পাঞ্জাবি। পায়ে যেমন তেমন একটা চটি। আর হাতে একটা ছড়ি। ছড়িটি কিন্তু সুন্দর।
মুরারিবাবু যা বললেন, তা সংক্ষেপে এই :
দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় এই বিজ্ঞাপন দেখে গতকাল ইন্দ্রোদ্ধার দৈব চিকিৎসালয়ে যান। একটা ঘিঞ্জি গলির ভেতর জরাজীর্ণ বাড়ি। কোনো ব্যবসায়ীর গুদাম ঘর বলেই মনে হয়েছে। দোতলায় অ্যাজবেস্টসের ছাউনি দেওয়া ঘরের মাথায় নতুন সাইন-বোর্ড ছিল। বেঁটে, হোঁতকা-মোটা, গোলগাল চেহারার ডাক্তারবাবুটি অবশ্য খুবই অমায়িক। উঁচু বেডে শুইয়ে মুরারিবাবুর টাক পরীক্ষা করে বলেন, ঠিক আছে। চলবে। তবে দাড়ি কামাতে হবে। মুরারিবাবুর তাতে আপত্তি ছিল না। ডাক্তারবাবু নিজেই যত্ন করে দাড়িগোঁফ কামিয়ে দেন। তারপর বলেন, চোখ বুজুন। মুরারিবাবুর চোখ বোজেন। এরপর কী হয়েছে তার জানা নেই। একসময় চোখ খুলে দেখেন, ঘরে আলো জ্বলছে। কেউ কোথাও নেই। উঠে বসেই সব মনে পড়ে। মাথায় হাত দিয়ে টের পান, টাক নেই, সারা মাথা চুলে ভর্তি। খুশি হয়ে ডাক্তারবাবুকে ডাকাডাকি করেন। সাড়াসাড়ি না পেয়ে অবাক হন। ঘোরালো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসেন অগত্যা। এই হল রহস্যের প্রথম পর্ব।
দ্বিতীয় পর্ব কিন্তু মারাত্মক। মুরারিবাবু কলকাতায় সবে এসেছেন। রেলে চাকরি করতেন। পাটনায় থাকার সময় রিটায়ার করেছেন। কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে কলকাতা লেক প্লেসে বহু টাকা সেলামি দিয়ে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করেছিলেন। দিন-পাঁচেক আগে সেখানে জিনিসপত্র নিয়ে উঠেছেন। একা মানুষ স্বাবলম্বী। স্বপাক খান। গতকাল সন্ধ্যায় মাথায় চুল গজানোর পর নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে দেখেন, অন্য কে একজন ঢুকে বসে আছে। কতকটা তার মতোই চেহারা এবং গড়ন। মাথায় টাক, মুখে দাড়িও আছে। মুরারিবাবুকে দেখে সে বলে, কাকে চাই? মুরারিবাবু ভড়কে যান। তারপর হইচই বাধান। অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকেরা এসে পড়ে। একবাক্যে রায় দেয় এই কালো চুলের মুরারিবাবুকে তারা চেনে না। এমনকী ওপরতলা থেকে বাড়ির মালিক এসে পর্যন্ত শাসিয়ে বলেন, পুলিশ ডাকা হবে। বেগতিক দেখে মুরারিবাবু চলে আসেন। রাত্তিরটা হোটেলে কাটিয়ে এখন কর্নেলের শরণাপন্ন হয়েছেন। থানায় যাননি, তার কারণ তিনি এখন কীভাবে প্রমাণ করবেন যে তিনিই আসল মুরারিমোহন ধাড়া? কলকাতায় তার আত্মীয়স্বজন দুরের কথা, চেনা লোকও নেই, থাকলেও কালো কোকড়া চুল গজিয়ে তারা চেহারাকে একেবারে বদলে দিয়েছে যে!
