কর্নেল ইশারায় চুপ করতে বললেন। বেলা পড়ে এসেছে। পাখিরা তুমুল হল্লা জুড়েছে। সামনে একটা পাথরের আড়ালে একটা শেয়াল এসে দাঁড়াল। তারপর আমাদের দেখতে পেয়েই থমকে দাঁড়াল। তারপর প্রায় জান্তব গলায় কার গর্জন শোনা গেল, –যাঁ! যাঁঃ! যাঁঃ!
হালদারমশাই উত্তেজনায় ফিশফিশ করে বললেন, পিচাশ! পিচাশ!
এবার পিশাচের শরীরের খানিকটা দেখতে পেলাম। কালো লোমশ শরীর। মুখ এদিকে ঘোরাতেই শিউরে উঠলাম। একটা কষদাঁত সুচোলো হয়ে বেরিয়ে আছে। অন্যটা হালদারমশাই ভেঙে দিয়েছেন বলছিলেন। ভাটার মতো চোখ। ভয়ঙ্কর মুখ। পাথরটার পাশে সে বসে পড়ল। তারপর বুঝলাম, সে খন্তাজাতীয় কিছু দিয়ে মাটি কোপাচ্ছে। দুর্গন্ধটা বাড়ছে।
কর্নেল চাপা স্বরে বললেন, –তিনজন তিনদিক থেকে ঘিরে ফ্যালো।
আগে হালদারমশাই, তারপরে কর্নেল, শেষে আমি গিয়ে পিশাচটাকে ঘিরে ধরলাম। কর্নেল এবং হালদারমশাইয়ের হাতে রিভলভার। পিশাচটা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। অবাক হয়ে দেখলাম, সে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ছিল।
পিশাচটা গর্জন করতেই কর্নেল বললেন, –এক পা নড়লেই খুলি ফুটো হয়ে যাবে।
পিশাচটা নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার আগেই হালদারমশাই এক লাফে তার সামনে গেলেন, -হালার পিচাশ! ঘুঘু দ্যাখছ, ফান্ দ্যাখো নাই!
কর্নেল গিয়ে পিশাচের মুখে চাটি মারার মতো বাঁ-হাত চালালেন এবং হতভম্ব হয়ে গেলাম। এ যে দেখছি পিশাচের মুখোশপরা একটা লোক।
কর্নেল বললেন, -চণ্ডীবাবু! গোলোকের পাকস্থলীতে খাঁজকাটা হিরে পৌঁছোনোর কথা নয়। কাজেই ওর নাড়িভুড়ি কেটে তুলে এনে এখানে পুঁতে রোজ একবার করে তা কাটাকুটি করে হিরে হাতড়ানোর মানে হয় না। খামোখা রোজ ওই পচা দুর্গন্ধ জিনিসগুলো ঘাঁটা পণ্ডশ্রম।
হালদারমশাই একটানে কালো লোমশ আবরণ খুলে রণজয়বাবুর শ্যালক চণ্ডীবাবুকে বের করলেন। চকাস করে একটা ছুরিও পড়ল। হালদারমশাই বললেন, –চিতপুরে কিনছিল। তবে ছুরিখানা রিয়্যাল ছুরি। শৃগালটা গেল কই? পচা নাড়িভুঁড়িগুলো শৃগালের প্রাপ্য।
কর্নেল চণ্ডীবাবুর জামার কলার খামচে ধরে বললেন, -চলুন চণ্ডীবাবু! এবার অন্য শ্বশুররালয়ে আপনার থাকার ব্যবস্থা হবে।
চণ্ডীবাবু হাউমাউ করে কেঁদে বললেন, -মাইরি, মা কালীর দিব্যি স্যার! আমি হিরে চুরি করিনি।
– না, না। হিরে নিজের হাতে চুরি করেননি। ষাঁড়ের মাথা ভাঙার ঝুঁকি নিতে চাননি। গোলোকের হাত দিয়ে কাজটা সারতে চেয়েছিলেন। আপনি ধুরন্ধর চণ্ডীবাবু! আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করা উচিত। জন্মেজয় সিংহের ধাঁধার জট ছাড়িয়েছিলেন আপনি। তারপর অনবদ্য আপনার পরিকল্পনা। গোলোক হাতেনাতে ধরা পড়লে পাছে আপনার কারচুপি ফাঁস করে দেয়, তাই আপনি ওকে হিরেটা গিলে ফেলতে বলেছিলেন। তারপর পিশাচ সেজে শ্মশানে ভয় দেখিয়ে লোকগুলোকে তাড়িয়ে গোলোকের নাড়িভুড়ি কেটে এনে এখানে পুঁতেছিলেন। পিশাচ যে সত্যিই গোলোকের নাড়িভুড়ি খেয়েছে এবং বিশেষ করে সত্যিই এখানে পিশাচের আবির্ভাব ঘটেছে, তা এস্টাব্লিশ করার জন্য শুধু রণজয়বাবুর জানালায় নয়, ফোটোগ্রাফার রামবাবুর জানলাতেও হাজির হয়েছিলেন। আপনি জানতেন, রামবাবু ফোটো না তুলে ছাড়বেন না। তাই অতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এতে আপনার পাবলিসিটি হবে। তবে রামবাবুর কাছে আপনার পিশাচমূর্তির ফোটো আতশকাচে খুঁটিয়ে দেখেই বুঝেছিলাম, এটা মুখোশ মাত্র। তারপর এখানে এসে দুর্গন্ধ টের পেয়েছিলাম।
কথা বলতে বলতে কর্নেল আসামিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এবার একটা পুলিশের জিপ আসতে দেখা গেল এবড়োখেবড়ো রাস্তায়। জিপ এসে থামল। একদল পুলিশ বেরিয়ে পড়ল। একজন অফিসার সহাস্যে বললেন তাহলে আমরা আসার আগেই পিশাচ ধরে ফেললেন কর্নেলসায়েব! শেষ দৃশ্য দেখার সুযোগ দিলেন না।
কর্নেল আসামিকে কনস্টেবলদের হাতে সঁপে দিয়ে বললেন, -বেলা থাকতে থাকতে পিশাচ এসে মাটি খুঁড়বে জানতাম না। ভেবেছিলাম, সন্ধ্যা না হলে আসবে না। কিন্তু ওর তর সইছিল না। আপনারা থানায় চলুন। আমরা রাজবাড়ি হয়ে থানায় যাব।
পুলিশের গাড়ি চলে গেল।
হালদারমশাই জিজ্ঞেস করলেন, কর্নেলস্যার! হালপিচাশের ডেরা- হোয়্যার ইজ দ্যাট প্লেস?
কর্নেল হাসলেন, -রাজবাড়িতেই রাজবাড়ির শ্যালকের ডেরা থাকা কি স্বাভাবিক নয়? রণজয়বাবুর কাছে ওঁর শ্যালকের ঘরের চাবি ছিল না। আমার কাছে সবসময় মাস্টার-কি থাকে। তাই দিয়ে খুলোম। আপনার বাঘছালে মোড়া রিভলভার পেলাম। কয়েকটা চিঠি পেলাম। কলকাতার এক জুয়েলার কোম্পানি হিরে কিনতে চেয়েছিল। তাদের গতকাল এখানে পৌঁছুনোর কথা। নিউ ধূমগড়ে হোটেল প্যারাডাইসে তারা অপেক্ষা করবে। দুপুরে সেখানে গিয়ে খোঁজ নিলাম। তাদের সঙ্গে চণ্ডীবাবু লাঞ্চ খাচ্ছিল ডাইনিং হলে। সেখান থেকে ভাগ্যিস বাড়ি ফেরেনি। তাহলে ঘরে ঢুকে সব টের পেয়ে সাবধান হয়ে যেত। যাক গে। রণজয়বাবু অপেক্ষা করছেন। হিরেটা তার হাতে পৌঁছে দিয়ে আমার ছুটি।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ বললেন, -হিরেখানা একবার দ্যাখাইবেন না কর্নেলস্যার?
কর্নেল কপট গাম্ভীর্যে বললেন, -চোখ জ্বলে যাবে। ধুম্রগড়ের রাজকাহিনির ধাঁধায় বলা আছে :
পাষণ্ডের পা
কভু ধরিস না।
মস্তকে ঘা
কী জ্বলে রে বাবা
