কর্নেল বললেন, -জয়ন্ত! এই অবস্থায় হালদারমশাই হোটেলে ফিরতে গেলে পাগল ভেবে লোক জমে যাবে। এখান থেকে সোজা নাকবরাবর হেঁটে গেলে ফরেস্টবাংলো দেখতে পাবে। ওঁকে নিয়ে গিয়ে তোমার একপ্রস্ত পোশাক পরতে দাও। ওঁর কিছু খাওয়াদাওয়াও দরকার। দেরি কোরো না। আমি অন্যদিকে যাচ্ছি।
হালদারমশাই হঠাৎ লাফিয়ে উঠলেন, –আমার রিভলবার গেল কই? আসনের তলায় রাখছিলাম।
মেড ইন চিতপুর নকল বাঘছালের আসনটা খুঁজে পাওয়া গেল না। কর্নেল বললেন, –পিশাচ আপনার রিভলভারের লোভ ছাড়তে পারেনি।
হালদারমশাই চিন্তিতমুখে বললেন- ফায়ার আর্মস পিচাশের কোন্ কামে লাগব?
কর্নেল আর কোনও কথা না বলে চলে গেলেন। এর পর হালদারমশাইকে নিয়ে আমি কীভাবে যে বাংলোয় পৌঁছুলাম কহতব্য নয়। সারা পথ বুক ঢিপঢিপ করছিল। এই বুঝি পিশাচটা ঝোপের আড়াল থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
চৌকিদার দয়ারাম হাঁ করে তাকিয়ে গোয়েন্দা ভদ্রলোককে দেখছিল। বললাম, –শিগগির ওঁকে কিছু খাইয়ে দাও, দয়ারাম। হালদারমশাই আপনি বরং স্নান করে নিন। ওই দেখুন কুয়ো আছে!
দয়ারামের কাছে জানা গেল, কুয়োটা আসলে এই টিলার মাথায় একটা প্রস্রবণ। ওটা ছিল বলেই বনদফতর এখানে বাংলো তৈরি করেছিল।
স্নান করে আমার পাঞ্জাবি-পাজামা পরে হালদারমশাই শুধু দুখানা টোস্ট আর এক কাপ কফি খেলেন। তারপর আমার বিছানায় শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে থাকলেন।
কর্নেল এলেন বেলা দুটো নাগাদ। হালদারমশাইকে ঘুম থেকে উঠিয়ে বললেন, –আপনার রিভলভারটা উদ্ধার করেছি। এই নিন। উনি কিটব্যাগ থেকে রিভলভার বার করে দিলেন।
অবাক হয়ে বললাম, -কোথায় পেলেন ওটা?
-পিশাচের ডেরায়। সিন্থেটিক বাঘছালে মোড়া ছিল। বাঘছালটা একই অবস্থায় রেখেছি।
-জায়গাটা আপনি খুঁজে বের করেছেন?
-হ্যাঁ। পশুপাশি কীটপতঙ্গ সব প্রাণীরই ডেরা থাকে। কাজেই পিশাচেরও একটা ডেরা থাকা উচিত। যাইহোক, এখন আর কোনও কথা নয়। হিরে উদ্ধার বাকি আছে। লাঞ্চ খেয়ে একটু জিরিয়ে নিয়ে বেরুব।
বেলা তিনটে নাগাদ আমরা বেরোলাম বাংলো থেকে! কর্নেল বললেন- হালদারমশাই! একটা কথা। দৈবাৎ যদি আমরা পিশাচটাকে জঙ্গলে দেখতে পাই, সাবধান! যেন গুলি ছুঁড়বেন না। তবে রিভলভার বের করে ওকে ভয় দেখাতে পারেন। কিন্তু কক্ষনো গুলি ছুঁড়ে বসবেন না। পিচাশটাকে আমরা অক্ষত অবস্থায় ধরতে চাই।
অজানা আশঙ্কায় আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল।
কর্নেল বনবাদাড় ভেঙে হাঁটছিলেন। মাঝে মাঝে পাথরে উঠে বাইনোকুলারে চারদিক দেখে নিচ্ছিলেন। বললাম, -কর্নেল! আপনি কি পিচাশের ডেরায় যাচ্ছেন?
কর্নেল বললেন, -নাহ, শ্মশানতলায়।
-শ্মশানতলায় কেন?
কর্নেল হাসলেন, –আপত্তি আছে তোমার? আমাদের সবাইকে তো একদিন শ্মশানে যেতেই হবে। কী বলেন হালদারমশাই?
হালদারমশাই গম্ভীরমুখে বললেন, -হঃ!
বললাম, জায়গাটা অস্বস্তিকর। মড়াপোড়ানো ছাইয়ের গাদা। বিশেষ করে চিতার ছাই দেখলেই আমার গা ছমছম করে।
কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন, –কী বললে? চিতার ছাই?
– হ্যাঁ। কিন্তু এতে চমকে ওঠার কী আছে?
কর্নেল হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলেন। হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। হালদারমশাই লম্বা পা ফেলে ওঁকে অনুসরণ করলেন। পিছিয়ে পড়ার ভয়ে আমিও প্রায় জগিং শুরু করলাম।
শ্মশানতলায় পৌঁছে কর্নেল বললেন, -হালদারমশাই, দেখুন তো! এলোমেলো অনেক চিতার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে টাটকা চিতা কোটা হতে পারে? যতদূর জানি, বৃহস্পতিবার রাতে গোলোকের মড়া পোড়ানোর পর পিশাচের ভয়ে এ শ্মশানে আর কোনও মড়া পোড়ানো হয়নি। নিউ ধূমগড়ের নতুন শ্মশানে সবাই মড়া পোড়াচ্ছে।
গোয়েন্দা ভদ্রলোক ঘোরাঘুরি করে দেখতে দেখতে বললেন, -বৃষ্টিবাদলায় সবগুলি হেভি ধুইয়া গেছে। তবে আপনি কার চিতা কইলেন য্যান?
–রাজবাড়ির স্যারভ্যান্ট গোলোকের। মানে যার মড়ার নাড়িভুড়ি খেয়ে ফেলেছিল পিশাচ।
–তবে তো ওনার চিতার ছাই হেভি হইব। বলে হালদারমশাই লাফ দিয়ে এগোলেন।
-লাস্ট বার্নিং কর্নেল স্যার! হেভি অ্যাশ! এই যে।
কর্নেল গিয়ে বৃষ্টির জল থিকথিকে পাঁকের মতো ছাইগুলো ঘাটতে শুরু কলেন। বললাম, -ও কী করছেন?
কর্নেল আওড়ালেন, –যেখানে দেখিবে ছাই/উড়াইয়া দেখ তাই পাইলে পাইতে পার অমূল্য রতন।
হালদারমশাইও হাত লাগাতে যাচ্ছিলেন। কর্নেল তাকে নিষেধ করলেন! একটু পরে ছাইগাদার তলা থেকে কী একটা জিনিস কুড়িয়ে কর্নেল নদীর ধারে দৌড়ে গেলেন। জলে সেটা ধুয়ে পকেটে ঢুকিয়ে হাসলেন, –জয়ন্ত! শ্মশানতলায় আসছিলাম পিশাচটার জন্য ওত পাততে। কারণটা পরে বলছি। তবে এবারও তুমি রহস্যের দ্বিতীয় পর্ব ফাঁস করেছ! ধন্যবাদ ডার্লিং! অসংখ্য ধন্যবাদ! হিরে উদ্ধার হয়ে গেল।
–বলেন কী! ওই জিনিসটা হিরে? গোলোকের চিতার ছাইয়ে কে লুকিয়ে রেখেছিল?
–কেউ না। হিরেটা গিলে গোলোক মারা পড়েছিল ঠিকই। কিন্তু পাকস্থলীতে হিরে পৌঁছোনোর কথা নয়। গলার নলিতেই আটকে যাওয়া উচিত। কারণ হিরে খাঁজকাটা ধাতু।
হালদারমশাই বললেন, কই দেখি!
– পরে দেখাব। এবার পিশাচের জন্য ওত পাততে হবে। বটগাছের আড়ালে চলুন।
বটগাছের ঝুরির ভেতর দিয়ে এগিয়ে গুঁড়ির আড়ালে তিনজনে বসে পড়লাম। সামনে ঝোপজঙ্গলে ঢাকা ঢালু মাটি নদীতে নেমেছে। এখানে-ওখানে বড়ো বড়ো পাথর পড়ে আছে। হঠাৎ দমকা বাতাসে উৎকট গন্ধ ভেসে এল। নাক ঢাকলাম। চাপা স্বরে বললাম, -এ কিসের দুর্গন্ধ?
