কর্নেল আতশ কাচে খুঁটিয়ে দেখে বললেন, -রেখে দিন।
রামবাবু চাপা স্বরে বললেন, -কদিন আছেন তো? একটা কপি আপনার জন্য রাখব।
রাখতে পারেন। -বলে কর্নেল বেরিয়ে এলেন।
রাস্তায় গিয়ে বললাম, -হালদারমশায়ের জন্য ভয় হচ্ছে। ওঁকে খুঁজে বের করা উচিত কর্নেল!
কর্নেল বললেন, –চলো! এবার শ্মশানতলায় যাওয়া যাক। একটু দূর হবে। রিকশ ডাকি।
কিন্তু কোনো রিকশই শ্মশানতলায় যেতে রাজি হল না। শুধু একজন বলল, সে রাস্তার মোড় অব্দি যাবে। দশ টাকা লাগবে। কর্নেল রাজি হলেন।
রাজবাড়ি এলাকা ছাড়িয়ে গিয়ে রাস্তার মোড় এল। রিকশওয়ালা বলল, -ইধার সিধা চলা যাইয়ে।
এবড়োখেবড়ো খোয়াঢাকা রাস্তার দুধারে জঙ্গল আর টিলা। কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিক দেখতে দেখতে হাঁটছিলেন। আমার ভয় হচ্ছিল, বিরল প্রজাতির কোনও পাখির পিছনে উধাও হয়ে না যান। গেলে পরে আমাকে একা পেয়ে নিশ্চয়ই পিশাচটা এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমার নাড়িভুড়ি খেয়ে ফেলতে দেরি করবে না।
কর্নেল উধাও হলেন না। কিছুক্ষণ পরে আমরা শ্মশানে পৌঁছোলাম। চারদিকে ডালপালা ছড়ানো ঝুরি নামানো আদ্যিকালের বটগাছ। তারওধারে শরৎকালের ভরা নদী। এখানে-ওখানে। চিতার ছাই আর ভাঙা মাটির কলসি পড়ে আছে। একপাশে কয়েকটা পাথরের ঘর মুখ থুবড়ে। পড়েছে। তার কাছে একটা পাথরের মন্দির। কতকটা বৌদ্ধস্তূপের গড়ন। খানিকটা ফোকর দেখা যাচ্ছে স্কুপে। ওটাই সম্ভবত দরজা ছিল। মাটিতে বসে গেছে। ঝোপেও ঢাকা পড়েছে। বললাম, কর্নেল! পিশাচটা ওই স্কুপের ভেতর থাকে না তো?
কর্নেল আমার কথার জবাব না দিয়ে বটতলায় একটা ঝুরির কাছে গেলেন। তারপর বললেন এখানে কোনও সন্ন্যাসী ধুনি জ্বালিয়েছিল দেখছি। ছাইটা টাটকা। গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়নি, মাটি দেখে বোঝা যাচ্ছে। একটা ছোট্ট ত্রিশূল আর-মড়ার খুলি!
কর্নেল খুলিটা কুড়িয়ে নিয়েই ফেলে দিলেন। ঠকাস করে শব্দ হল। হাসতে হাসতে বললেন, প্লাস্টিকে তৈরি নকল খুলি। কাজেই হালদারমশাই ছদ্মবেশী সাধু সেজে এখানে ধুনি জ্বেলেছিলেন, এতে আমি নিঃসন্দেহ।
বললাম, -উনি গেলেন কোথায়?
কর্নেল মাটিতে দৃষ্টি রেখে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে থমকে দাঁড়ালেন। কী একটা কুড়িয়ে নিয়ে বললেন, -একটুকরো জটা! মেড ইন চিতপুর। পাটের তৈরি জটা! জয়ন্ত, হালদারমশাইয়ের নকল জটা ছিঁড়ে পড়ার একটাই অর্থ হয়। ওঁকে কেউ আক্রমণ করেছিল।
– সর্বনাশ! তাহলে পিশাচের পাল্লায় পড়েছিলেন গোয়েন্দা ভদ্রলোক। কিন্তু ওঁর কাছে তো রিভলভার থাকে।
কর্নেল স্তূপটার কাছে এগিয়ে গেলেন। পিঠের কিটব্যাগ থেকে টর্চ বের করে সেই ফোকরের কাছে গুঁড়ি মেরে বসলেন। টর্চ জ্বেলে ভেতরটা দেখেই বলে উঠলেন, –জয়ন্ত। দেখে যাও!
দৌড়ে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি, খটখটে পাথুরে মেঝেয় চামচিকের নাদির ওপর চিত হয়ে শুয়ে আছেন আমাদের প্রাইভেট ডিটেকটিভ। হাত এবং পা বাঁধা। মুখে টেপ সাঁটা ছিল। খুলে গেছে। তার চেয়ে বিচিত্র ব্যাপার, টর্চের আলোয় চামচিকের ঝক ছত্রভঙ্গ হয়ে ওড়াউড়ি করছে। হালদারমশাইয়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। কিন্তু ওঁর সাড়া নেই। অজ্ঞান হয়ে আছেন নাকি?
কর্নেল ডাকলেন- হালদারমশাই! হালদারমশাই!
গোয়েন্দা ভদ্রলোক পিটপিট করে তাকালেন। বললেন, -জ্বালাতন! তোরা আমারে মারস। ক্যান! যা! যা! আবার মারে! চামচিক্যা কি আর সাধে কয়?
– হালদারমশাই! হালদারমশাই!
অ্যাঁ? হালদারমশাই মাথা ঘোরালেন : হালার পিচাশ? আবার আইছ? একখান দাঁত উড়া ফ্যালাইছি। আরেক খান রাখুম না! কাম অন!
কর্নেল বললেন, জয়ন্ত! এই ছুরি নিয়ে ভেতরে ঢোকো। বাঁধন খুলে ওঁকে বের করে আনন। আমার এই প্রকাণ্ড শরীর ভেতরে ঢোকানো যাবে না।
আঁতকে উঠে বললাম, -বড় চামচিকে যে!
-দেরি কোরো না। চামচিকের চাঁটিতে মাথা খুলে যাবে। ঢোকো।
চোখ বুজে ঢুকে পড়লাম। চামচিকের ঝাঁকের চাটির পর চাটি খেতে খেতে বাঁধন কেটে গোয়েন্দাকে টেনে বের করলাম। তখনও উনি গর্জাচ্ছেন! শাসাচ্ছেন পিচাশের বাকি দাঁতটাকে উপড়ে দেবেন বলে। আধখানা নকলদাড়ি মুখের পাশে ঝুলছে। জটার খানিকটা আটকে আছে। পরনে লাল খাটো লুঙি। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ছিঁড়ে ঝুলছে। গোঁফের কোনায় সেলোটেপও ঝুলছে। বাইরে বেরিয়ে ওঁর হুঁশ হল। চোখ মুছে বললেন, -হালার পিচাশটা গেল কই?
কর্নেল বললেন, -নদীর জলে মুখ-কাঁধ রগড়ে ধুয়ে নিন হালদারমশাই!
হালদারমশাই তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর খিকখিক করে হেসে বললেন, কর্নেলস্যার! জয়ন্তবাবু! আপনারা আইয়া পড়ছেন? পিচাশটারে আমি জব্দ করছি! একখান দাঁত
– নদীতে চলুন হালদারমশাই! গোঁফের পাশে টেপ ঝুলছে। জল না দিলে আটকে থাকবে।
কর্নেল ওঁকে টানতে টানতে নদীর ধারে নিয়ে গেলেন!…
.
হিরের খোঁজে
হালদারমশাইয়ের মুখে জানা গেল, কলকাতা থেকে এসে তিনি নিউ ধূমগড়ে একটা হোটেলে উঠেছিলেন। তারপর কাল রাত নটায় শ্মশানতলায় এসে ধুনি জ্বেলে সাধু সেজে বসেন। শেষ রাতে, ঘুমের দুলুনি চেপেছিল। হঠাৎ পেছনে থেকে পিচাশের গায়ে জোর বলেও নয়, বেকায়দায় পড়ে হালদারমশাই বন্দি হন। তাকে টানতে টানতে স্যুপের ভেতর ঢোকায় হালার পিচাশ। মুখে টেপ সেঁটে দিয়েছে। চাঁচানোরও জো ছিল না।
