–আমি আর সঞ্জয়ের বাবা ধনঞ্জয়। ধনঞ্জয় ক্যানসারে মারা যায়।
–আপনার কাছে আপনার শ্যালক থাকেন বলছিলেন। কী যেন নাম?
–চণ্ডী।
–চণ্ডীবাবু আছেন?
রণজয়বাবু বাঁকা মুখে বললেন, –চণ্ডী কখন আছে, কখন নেই বলা কঠিন। বাউন্ডুলে স্বভাব। সামান্য যা জমিজমা আছে দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়েছিলাম। কিন্তু খায়দায় আর টো-টো করে ঘোরে। বয়সের তো লেখাজোখা নেই। অথচ নাবালক থেকে গেল এখনও। ধর্মের ষাঁড় আর কী!
কর্নেল পা বাড়িয়ে একটু হেসে বললেন, -চলুন তাহলে। ধর্মের ষাঁড়টিকে দেখে আসি।
-ওকে পাচ্ছেন কোথায়?
–মন্দিরেই পাব। শিবের বাহন শিবমন্দিরেই থাকা উচিত।
–মন্দিরে তো ওকে …
–চলুন তো!
যে বিশাল মন্দিরটার পাশ দিয়ে এসেছি, এবার রাজবাড়ির প্রাঙ্গণ পেরিয়ে সেখানে ঢুকলাম। চত্বরে গিয়ে কর্নেল বললেন- গোলোক কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল?
উঁচু মন্দিরের সিঁড়ির নীচেটা দেখিয়ে দিলেন রণজয়বাবু, –এই সিঁড়ির ধাপেই বসে থাকত গোলোক।
কর্নেল সিঁড়ির শেষ ধাপে খোলা একটুকরো বারান্দার দিকে আঙুল তুলে বললেন, –ওই তো ধর্মের ষাঁড়। শিবের বাহন।
কথাটা বলেই সিঁড়িতে কয়েক ধাপ উঠে গেলেন। তারপর সেই ধাঁধাটা আওড়ালেন :
পাষণ্ডের পা
কভু ধরিস না
মস্তকে ঘা।
কী জ্বলে রে বাবা।
রণজয়বাবু অবাক হয়ে বললেন, -কী ব্যাপার কর্নেলসায়েব?
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, -ষাঁড়ের মাথা কে ভাঙল রণজয়বাবু?
রণজয়বাবু উঠে গেলেন, –সে কী। মাথাটা ভাঙা লক্ষ্য করিনি তো!
কর্নেল বললেন, -ধাঁধার জট ছাড়াতে বলেছিলেন। ছাড়িয়েছি। কিন্তু কোনো লাভ হল না।
রণজয়বাবু চমকে উঠে বললেন, -লাভ হল না?
না। -কর্নেল মাথা নাড়লেন : পাষণ্ডের পা কভু ধরিস না। এর মানে হচ্ছে, পাষণ্ড শব্দের পা ধরা হবে না। পা না ধরলে বাকি রইল ষণ্ড। অর্থাৎ কি না ষাঁড়। এবার মস্তকে ঘা। তার মানে, ষাঁড়ের মাথায় ঘা মারতে হবে। ঘা মারলে মাথা ভেঙে যাবে। তারপর বলা হয়েছে, কী জ্বলে রে বাবা! এই জ্বলে শব্দে বোঝায় জ্বলজ্বল করছে। উজ্জ্বলতা। কীসের এই উজ্জ্বলতা? হিরের! মোগল সেনাপতি রাজা মানসিংহকে বিদ্রোহ দমনে সাহায্য করার জন্য আপনাদের পূর্বপুরুষকে বাদশাহ আকবর যে হিরে উপহার দিয়েছিলেন, সেই হিরে। জন্মেজয় সিংহ বংশধরদের জন্য এই হিরেটা এই ষাঁড়ের মাথার ভেতরে লুকিয়ে রেখে ধাঁধা তৈরি করেছিলেন। ধুম্রগড়ের রাজকাহিনি বইয়ে। বাদশাহের দেওয়া হিরের কথা আছে। কিন্তু কোথায় আছে, তা ধাঁধায় বলা হয়েছে।
রণজয়বাবু প্রায় আর্তনাদ করলেন-কে ষাঁড়ের মাথা ভাঙল?
–গোলোক ভেঙেছিল।
–কিন্তু হিরে কোথায় গেল?
–গোলোকের পেটে।
–কী সর্বনাশ!
–হ্যাঁ, সর্বনাশ!
-হ্যাঁ, সর্বনাশ তো বটেই। হিরে সাংঘাতিক বিষ। আপনাকে আসতে দেখে হিরের টুকরোটা গোলোক গিলে ফেলেছিল। সঙ্গে সঙ্গে বিষক্রিয়ায় ওর মৃত্যু হয়।
–কিন্তু গিলল কেন হতভাগা? লুকিয়ে ফেলতে পারত জামা কাপড়ের তলায়।
–বোকা গোলোক কারও হুকুম পালন করেছিল টাকার লোভে। ওকে বলা হয়েছিল, ধরা পড়ার উপক্রম হলে যেন সে ওটা গিলে ফেলে। গোলোক জানত না হিরে মারাত্মক বিষ।
রণজয়বাবু হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কর্নেল বললেন- আপাতত এই পর্যন্ত। তবে আশাকরি, আপনাদের বংশের ঐতিহাসিক হিরে উদ্ধার করে দিতে পারব। …
.
পিশাচ দর্শন
রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বললাম-তা হলে কলকাতায় বসে ঠিকই রহস্যের জট ছাড়াতে পেরেছিলেন। কিন্তু পিশাচ ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না।
বোঝা যাবে। আগে সেই রামবাবু ফোটোগ্রাফারের দোকানে যেতে হবে।
– বলে কর্নেল রাস্তায় একটা সাইকেল-রিকশা ডাকলেন।
বাজার এলাকায় গিয়ে রামবাবুর দোকানের খোঁজ পাওয়া গেল। দোকানের নাম জয় মা কালী স্টুডিয়ো। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড। কর্নেলকে দেখেই বেঁটে নাদুসনুদুস চেহারার এক ভদ্রলোক সহাস্যে অভ্যর্থনা জানালেন, –কী সৌভাগ্য! কী সৌভাগ্য! কর্নেলসায়েব যে! আসুন। পায়ের ধুলে দিন। এবার কতগুলো প্রজাপতি আর অর্কিডের ছবি তুললেন? গত মাসে তো অনেক তুলেছিলেন।
বুঝলাম রামবাবুর স্টুডিয়োতে কর্নেল ছবি প্রিন্ট করিয়েছিলেন। কর্নেল ভেতরে ঢুকে বললেন, ছবি এখনও তুলিনি। তুলব। তবে আগে পিশাচ দর্শন করতে চাই। আপনি নাকি পিশাচের ছবি তুলেছেন।
রামবাবুর মুখে ভয়ের ছবি ফুটে উঠল। চাপা স্বরে বললেন, -ভয়ের ঘটনা কর্নেলসায়েব! তবে আমার পেশার লোকদের এই একটা অভ্যাস আছে। আসলে ক্যামেরায় ফিল্ম লোড করা ছিল। ফ্ল্যাশ ফিট করা ছিল না।
– তাহলে পিশাচ যেন আপনার কাছে ছবি ওঠাতেই এসেছিল।
রামবাবু হেসে ফেললেন, – তা যা বলেছেন স্যার। ফ্ল্যাশ ফিট করে ছবি তুললাম। তখন জানালার ধার থেকে থপথপ করে চলে গেল। বাগানে ঢুকে পড়ল।
পিশাচটা পাবলিসিটি চাইছে আর কী!–কর্নেল হাসলেন : যাই হোক, কই দেখি পিশাচের ছবি।
রামবাবু ড্রয়ার টেনে বললেন, পুলিশ এসে নেগেটিভটা সিজ করেছে। মোট তিরিশখানা প্রিন্ট বেচেছি। দু-খানা প্রিন্ট পুলিশ নিয়েছে। একখানা লুকিয়ে রেখেছিলাম। এই থেকে নেগেটিভ করব। মনে হচ্ছে প্রচুর বিক্রি হবে।
রঙিন ছবিটা দেখে শিউরে উঠলাম। জানলার গরাদের বাইরে একখানা ভয়ংকর মুখ উঁকি মেরে আছে। দুখান সুচালো কষধাঁত বেরিয়ে আছে। লাল ঠোঁটে চাপচাপ রক্ত। গোরিলা নয়। কর্নেল ঠিকই বলেছিলেন, ক্রোম্যাগননের পরবর্তী কোনও পর্যায়ের নরবানর। বীভৎস ছবি।
