পরদিন রাতে রাজবাড়ির বড়োতরফ রণজয় সিংহের কী একটা শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। জানলার ধারে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল। টর্চের আলো জ্বালতেই নাকি পিশাচটাকে দেখতে পান। ভিতু মানুষ। হাত থেকে টর্চ পড়ে যায়। পরে চ্যাঁচামেচি করেন। ততক্ষণে পিশাচ উধাও। গুজব এত বেশি রটেছে যে, ধূমগড়ের অনেকেই নাকি পিশাচটা দেখেছে। তাই সন্ধ্যার পর বাজার দোকানপাট রাস্তাঘাট সুনসান ফাঁকা হয়ে যায়। কেউ নাকি সন্ধ্যার পর পারতপক্ষে একা বেরোয় না।
ঘটনাটা শুনিয়ে চতুর্মুখ হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। তবে সে বলে গেল, পিশাচ না আসুক, নদী পেরিয়ে জঙ্গল থেকে বাঘ-ভালুক আসতেও পারে। কাজেই আমরা যেন দরজা ভালো করে এঁটে শুই।
খবরের কাগজে মোটামুটি ওইরকম বিবরণই বেরিয়েছে। তবে রণজয়বাবুর জানলায় পিশাচের আবির্ভাবের কথা বেরোয়নি। সন্ধ্যার পর সব নিরিবিলি হওয়ার কথাও বেরোয়নি।
কর্নেল দরজা এঁটে জানলা ধারে বসে চুরুট ধরালেন। বললেন, -শুয়ে পড়ো জয়ন্ত!
-আপনি কি পিশাচের জন্য রাত জাগবেন নাকি?
–নাহ। ধূমগড়ের রাজকাহিনির শেষ কয়েকটা পাতা পড়ে নিয়ে ঘুমোব।
–আর পড়ে কী লাভ? আপনি তো বলছিলেন, একটা জটিল রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে। কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন, -তোমারই সাহায্যে হয়ে গেছে।
-গোলকধাঁধা শুনে?
–একটা ওকার জুড়েই সব জল হয়ে গেছে।
–প্লিজ কর্নেল! হেঁয়ালি করবেন না। ও-কারের চোটে মাথা ভোঁ ভোঁ করছে।
–গোলকধাঁধার গোলকের একটা ও-কার দরকার ছিল। অর্থাৎ গোলোক। রাজবাড়ির যে বয়স্ক চাকর হঠাৎ ধড়ফড় করে মারা গেছে, তার নাম ছিল গোলোক।
-বুঝলুম। গোলোক থেকে কী করে রহস্য ফাস হল?
রাতবিরেতে হঠাৎ ধড়ফড় করতে করতে মরে গিয়ে গোলোকই রহস্য ফাঁস করেছে।
–তার মানে?
–ওই শোনো! ফেউ ডাকছে। কাছাকাছি কোথাও বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়ো।
বিরক্ত হয়ে চুপ করলাম। সত্যিই ফেউ ডাকছে। …
.
ধাঁধার জট ছাড়ল
কর্নেল অভ্যাসমতো প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। ফিরে এসে আমার ঘুম ভাঙালেন। বললেন, -দয়ারামকে সাহস দিয়ে নিয়ে এলাম। চতুর্মুখ আর মানিকাল রাত জেগে ডিউটি করে। ওদের ঘুমোনো দরকার।
দয়ারাম বাংলোয় চৌকিদার। সেও খুব ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে পিশাচকাহিনি শোনাল। সে জনৈক ফোটোগ্রাফার রামবাবুর কথা বলল। রামবাবু নাকি পিশাচটার ফোটো তুলেছেন। রাতে ওঁর জানালায় পিশাচটা গিয়ে উঁকি দিচ্ছিল। উপস্থিত বুদ্ধি খাঁটিয়ে রামবাবু ক্যামেরায় ফ্ল্যাশবালবের সাহায্যে ছবি তোলেন।
ব্রেকফাস্টের পর কর্নেলের সঙ্গে বেরোলাম। প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর বসতি এলাকা চোখে পড়ল। বাঁ-দিকে নদী। নদীর ধারে প্রাচীন রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে। টিলার গায়ে একটা কেল্লাও দেখতে পেলাম। কেল্লা আর আস্ত নেই। কেল্লার নীচে দিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর বিশাল প্রাচীন একটা শিবমন্দির দেখলাম। মন্দিরের ওপাশে ভাঙাচোরা দোতলা বাড়িটাই রাজবাড়ি।
গেট ধসে পড়েছে। দুধারে পামগাছের সারি পুরোনো আভিজাত্যের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখতে পেয়ে রোগা এবং পাতাচাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাশে গায়ের রং এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে নমস্কার করলেন। কর্নেল আলাপ করিয়ে দিলেন। রাজবংশের বড়োতরফ রণজয় সিংহ।
রণজয়বাবু বললেন, -আপনি দুদিন পরে আসবেন বললেন। তাই চলে এলাম কলকাতা থেকে।
কর্নেল বললেন, -হঠাই চলে এলাম। আমার এই তরুণ সাংবাদিক বন্ধু রাজাবাহাদুর জন্মেজয় সিংহের ধাঁধার জট ছাড়াতে সাহায্য করেছে।
রণজয়বাবুর মুখে বিস্ময় এবং আনন্দ ফুটে উঠল, –কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব, খুঁজে পাচ্ছি না কর্নেলসায়েব! চলুন, ঘরে গিয়ে বসা যাক।
-পরে বসা যাবে। প্রথমে আমাকে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিন।
–বলুন!
বৃহস্পতিবার রাতে গোলোক কি মন্দির চত্বরে মারা গিয়েছিল?
–হ্যাঁ। মন্দির চত্বরে।
–আপনার চোখের সামনেই তো ধড়ফড় করতে করতে মারা গিয়েছিল?
-হ্যাঁ। আমি ওকে ভোরে কলকাতায় আমার ভাইপো সঞ্জয়ের কাছে পাঠাব ভেবেছিলাম। তাই ওকে খুঁজছিলাম। ইদানীং প্রায় দেখতাম সন্ধ্যার পর গোলোক মন্দির চত্বরে গিয়ে বসে থাকত। জিজ্ঞেস করলে বলত, মনে সুখ নেই বড়োবাবু দেবতার কাছে শান্তি খুঁজছি।
গোলোক বলত?
-বলত বলেই মন্দিরে খুঁজতে গিয়েছিলাম। যেই গোলোক বলে ডেকেছি, অমনি কেন যেন চমকে উঠল। মন্দির চত্বরের ওপর বাড়ির দোতলার ঘরের আলো পড়ে। সব স্পষ্ট দেখা যায়। ওকে চমকে উঠতে দেখে বললাম, কী হয়েছে রে? সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ বুক চেপে ধরে পড়ে গেল। তারপর কাটা পাঁঠার মতো ধড়ফড় করতে করতে স্থির হয়ে গেল।
ডাক্তার এসে কী বললেন?
–হার্টফেল।
-রণজয়বাবু! সত্যিই কি ডাক্তার এসে বললেন হার্টফেল? আমার ধারণা, ডাক্তার বলেছিলেন, আত্মহত্যা করেছে গোলোক। পুলিশের ঝামেলার ভয়ে আপনি ডাক্তারকে অনুরোধ করেছিলেন হার্টফেলের উল্লেখ করে ডেথ সার্টিফিকেট দিতে।
রণজয়বাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন- হ্যাঁ। গোলোক সায়ানায়েড জাতীয় কিছু খেয়েছিল। কোনও কারণে ইদানীং ওর চালচলনে কেমন যেন অস্থিরতা লক্ষ্য করতাম। গত বছর ওর বউ মারা যায়। ছেলেপুলে ছিল না। কাজেই মানসিক অশান্তিই ওর আত্মহত্যার কারণ।
-রণজয়বাবু! আপনারা তো দু’ভাই?
