আরও অবাক হয়ে বললাম, -কী অদ্ভুত!
অদ্ভুত তো বটেই। -কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন : তবে এবার পিশাচটাকে খুঁজে বের করা দরকার। সেজন্যই ধূমগড়ে ছুটতে হবে। আমার ভয় হচ্ছে জয়ন্ত, হালদারমশাই পিশাচটার পাল্লায়
পড়লে আর জ্যান্ত ফিরে আসতে পারবেন না। কথাটা যদি দৈবাৎ কিছুক্ষণ আগে তোমার মুখ দিয়ে বেরুত!…
.
ও-কার রহস্য
রাত এগারোটা নাগাদ ট্রেন থেকে নেমে দেখি ছোট্ট স্টেশন। নিরিবিলি সুনসান চারদিক। আমি ভেবেছিলাম ধূমগড় নাম এবং রাজারাজড়ার রাজধানী ছিল যখন, তখন স্টেশনটা বেশ বড়োসডোই হবে। কর্নেল আমার মনের খবর কী করে টের পেয়ে বললেন, –আমরা ওল্ড ধূমগড়ে নেমেছি। নিউ ধূমগড় পরের স্টেশন। দূরত্ব তিন কিলোমিটার। ওটা বড়ো স্টেশন।
বললাম, তা হলে এখানে নামলেন কেন?
আমাদের টিকিট ওল্ড ধূমগড় অব্দি।
–কিন্তু এখানে তো লোকজন দোকানপাট দেখছি না। যানবাহনও চোখে পড়ছে না।
সেটাই তো সুবিধে। –বলে কর্নেল পা বাড়ালেন!
গেটে টিকিট নেওয়ারও লোক নেই। স্টেশনঘরের ভেতর স্টেশনমাস্টার একলা বসে টরে টক্কা করছেন। উর্দিপরা এক রেলকর্মী প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সম্ভবত আকাশের তারা গুনছিল। সে আমাদের কথা শুনতে পেয়ে হনহন করে এগিয়ে এল। ভেবেছিলাম টিকিট চাইবে। কিন্তু সে টিকিট চাইল না। চাপা স্বরে বলল, – এত্তা রাতমে আপলোগ টিশনকে বাহার মাত্ যাইয়ে সাব। খতরনাক হো যায়ে গা।
কর্নেল বললেন, -হাম শুনা ইধার এক পিশাচ নিকলা। সাচ?
-সাচ বাত সাব! দেখিয়ে না, ইয়ে টিসনমে কোই প্যাসিঞ্জার নেহি উতরা। সব আগলে টিসনমে উতরেগা।
-হামলোগ পিশাচ পাকাড়নে আয়া।
–তামাশা মাত কিজিয়ে সাব। মেরা বাত শুনিয়ে।
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, -গভমেন্ট হামকো পিশাচ পাকড়নেকে লিয়ে ভেজা। ইয়ে দেখো, ক্যায়সে হাম উনকো পাকড়ায়েগা!
কিটব্যাগ থেকে প্রজাপতিধরা নেট-স্টিক বের করে কর্নেল বেতাম টিপলেন। স্টিকের ডগায় সূক্ষ্ম সবুজ রঙের জাল ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়ল। রেলকর্মী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কর্নেল জাল গুটিয়ে স্টিক কিটব্যাগে গুঁজে গেট দিয়ে বেরুলেন।
স্টেশনের পেছনে একটা খাঁ-খাঁ চত্বর। তার ওধারে সংকীর্ণ একটা পিচের রাস্তা অব্দি আলো পৌঁছেছে। তারপর গাঢ় অন্ধকার। কর্নেল টর্চ ফেলে বললেন, -তোমার টর্চও রেডি রেখো।
ততক্ষণে আমি টর্চ বের করেছি। বললাম, –কিন্তু এভাবে আমরা যাচ্ছি কোথায়?
-বনবাংলোয়।
–সেটা কতদূরে?
কাছেই।
অস্বস্তি হচ্ছিল। টর্চের আলোয় দুধারে ঘন জঙ্গল আর বড়ো-বড়ো পাথরের চাই দেখা যাচ্ছিল। কিছুদূর উতরাইয়ের পর চড়াই শুরু হল। বারবার পিছনে এবং ডাইনে-বাঁয়ে টর্চের আলো ফেলে দেখে নিচ্ছিলাম। কলকাতার কর্নেলের ড্রয়িংরুমে বসে যে পিশাচের অস্তিত্ব অবাস্তব মনে হয়েছিল, এখানে এখন তা একেবারে বাস্তব বলে মনে হচ্ছিল। কর্নেল বললেন, -টর্চের ব্যাটারি খরচ কোরো না জয়ন্ত! আমার ধারণা, পিশাচ শ্মশানের কাছাকাছিই আছে। শ্মশান এখান থেকে দুরে।
একখানে পিচরাস্তাটা ছেড়ে খোয়াঢাকা একফালি পথ ধরলেন কর্নেল। পথটা চড়াইয়ে উঠেছে। ওপরে খানিকটা দূরে আলো জুগজুগ করছিল। এবার দেখলাম, আমরা একটা টিলার ঢাল বেয়ে উঠছি।
একটু পরে সেই আলোটার দিক থেকে কেউ বলে উঠল, -কৌন বা?
কর্নেল গলা চড়িয়ে বললেন, -চতুর্মুখ নাকি?
জোরালো টর্চের আলো এসে পড়ল আমাদের ওপর। তারপর দৌড়ে এল একজন খাঁকি প্যান্টশার্ট পরা লোক। তার একহাতে বন্দুক। বুঝলাম ফরেস্ট গার্ড। সে স্যালুট ঠুকে বলল, –কর্নিলসাব! আপ?
– হ্যাঁ চতুর্মুখ। দয়ারাম আছে তো? নাকি পিশাচের ভয়ে বাড়ি পালিয়েছে?
চতুর্মুখ হাসল, –জি, হাঁ কর্নিলসাব। তবে আপনার কিছু অসুবিধা হবে না। আমি আছি। মানিকলালভি আছে।
কথা বলতে বলতে আমরা হাঁটছিলাম। চতুর্মুখ লোকটি সাহসী বোঝা গেল। তার মতে, পিশাচের সত্যিমিথ্যা সে জানে না। তবে এমনও হতে পারে, গুজব রটিয়ে চোরা শিকারি বা কাঠ পাচারকারীরা এই মওকায় জঙ্গল লুঠবে! তাই রেঞ্জারসায়েব তাদের দুজনকে রাত জেগে নজর রাখতে বলেছেন। উঁচু কাঠের টাওয়ারের দিকে ঘুরে চতুর্মুখ চেঁচিয়ে বলল, -মানিকলাল! কলকত্তাসে কর্নিলসাব আয়া!
সেখান থেকে সাড়া এল, -সেলাম কর্নিলসাব!
বাংলোটা কাঠের তৈরি। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। লণ্ঠনের আলোয় দেখলাম, বেশ ছিমছাম সাজানো-গোছানো। জানালাগুলো খুলে দিলে হাওয়া খেলতে লাগল। পেছনে নদীর জলের কলকল ছলছল শব্দ। খাওয়া আমরা ট্রেনেই সেরে নিয়েছিলাম। কর্নেল তার প্রিয় পানীয় কফি চিনি, টিনের দুধ এবং কিছু স্ন্যাক্স এনেছেন সঙ্গে। চতুর্মুখ ঝটপট কিচেনে কেরোসিন কুকার জ্বেলে কফি করে আনল।
পিশাচের গল্পটা চতুর্মুখ সবিস্তারে শোনাল এবং আগেই বলে দিল, সবই তার শোনা কথা। দিন চারেক আগে রাজবাড়ির একজন বয়স্ক চাকর হঠাৎ ধড়ফড় করতে করতে মারা পড়ে। তখন রাত প্রায় নটা-দশটা। ডাক্তার ডাকা হয়েছিল। ডাক্তার নাকি বলেছিলেন, হার্টফেল। রাজবাড়ি এখন নামেই। অবস্থা পড়ে এসেছে। দালানকোঠা দিনেদিনে মেরামতের অভাবে ভেঙে পড়েছে। তো লোকটাকে শ্মশানে দাহ করতে নিয়ে গেছে, এমন সময় প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। সব কাঠ ভিজে গিয়েছিল বৃষ্টিতে। তাই দুজনকে বসিয়ে রেখে বাকি লোকেরা শুকনো কাঠ আনতে গিয়েছিল। তখন বৃষ্টি থেমেছে। কিন্তু বিজলি চমকাচ্ছে। মেঘ ডাকছে। হঠাৎ লোকদুটো নাকি বিজলির ছটায় দেখে, কালো কী একটা জন্তু দুই পায়ে হেঁটে মড়ার খাটিয়ার কাছে এল। মুখের দু-পাশে দুটো বড়োবড়ো দাঁত। বীভৎস মুখ। লোকদুটো পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে লাঠিসোঁটা বন্দুক বল্লম টর্চ নিয়ে অনেক লোক শ্মশানে ছুটে আসে। দেখে, খাটিয়ার মড়া নেই। খুঁজতে খুঁজতে একটু তফাতে জঙ্গলের ভেতর মড়া পাওয়া যায়। কিন্তু পেটের নাড়িভুড়ি সবটাই খুবলে তুলে সেই দুপেয়ে জন্তুটা খেয়ে ফেলেছে। এবার সবাই ধরে নেয়, জন্তুটা পিশাচ। মড়াটা অবশ্য দাহ করা হয়।
