বাধা পড়ল সান্যাল সায়েবের কথায়-কর্নেল, ও তো কাগজের খবর। আমার পার্টনার বন্ধু আগরওয়ালসায়েব কী বিবরণ দিয়েছেন আপনাকে জানি না। তবে…
পাল্টা বাধা দিয়ে কর্নেল গম্ভীর হয়েই বললেন—হ্যাঁ। সেটা প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ বলা যায়। তাই শুনেই আমি উৎসাহ দেখিয়েছি। সত্যি বলতে কী, ওঁর কথায় এতটুকু গরমিল অথবা সন্দেহ। করার মতো কিছু খুঁজে পাইনি মিঃ সান্যাল।
হংসধ্বজ হেসে উঠলেন। বললেন—এবার আমার দিক থেকে ব্যাপারটা শুনুন কর্নেল। গত ২৫শে মে অরুণাচলের উপজাতি অধ্যুষিত খামতি এলাকার জঙ্গলে আমি ও আগরওয়াল ক্যাম্প করে দিন-রাত্রিটা কাটাই। আমাদের সার্ভেয়ার টিম পাহাড়ের তলায় খোঁড়াখুঁড়ি করছিল। ওখানে সাতশো একর মতো জায়গা আমরা সরকারের কাছে লিজ নিয়েছি। সেখানে সীসের খনি আছে বলে আমাদের ধারণা। যাই হোক, হঠাৎ অনেক রাতে ঘুম ভেঙে যায়। নাকে কেমন একটা বিকট গন্ধ লাগে। ফুটফুটে জ্যোৎস্না ছিল। সার্ভেয়ার কুলিকামিনরা আশেপাশে তাঁবুতে ঘুমোচ্ছিল। আমাদের তাবুতে পাশাপাশি দুটো ক্যাম্পখাটে আমি ও আগরওয়াল। গন্ধটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হল তাবুটার ওপর কোনও জন্তু চাপ দিচ্ছে। টর্চ নেব এবং আগরওয়ালকে ডাকব ভাবছি, কিন্তু কোন ফুরসত পেলুম না। আচমকা কী একটা জন্তু আমার ঝাপিয়ে পড়ল। আমার বুকে বসে সেটা মানুষের মতো দুহাতে আমার গলা টিপে ধরল। দম আটকে গেল। কিন্তু ঝাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়েছিলুম একটুখানি, সেটা পাশের ক্যাম্পে কেউ কেউ শুনতে পায়। তার ফলে তক্ষুনি হল্লা শুরু হয়। বন্দুকের আওয়াজ করা হয়। ওরা তো জানে না, আমার তাঁবুতেই কী ঘটেছে। আগরওয়াল বোকার মতো দৌড়ে বেরিয়ে যায়। তার পাশেই আমি আক্রান্ত ও বুঝতে পারেনি। আমার ধারণা ওই, হল্লা ও আওয়াজে ভয় পেয়ে জন্তুটা আমাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু তাকে বেরিয়ে যেতে দেখে সবার বীরত্ব উবে যায়। আন্দাজ সাতফুট উঁচু-বরফের মতো সাদা উলঙ্গ প্রকাণ্ড ওই মূর্তি দেখলে তা অস্বাভাবিক মনে হয়। যাই হোক, সে যখন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে, তখন একজন সার্ভেয়ার গুলি ছোড়ে। আশ্চর্য! দানবটা ঘুরেও তাকায় না। জঙ্গলে উধাও হয়ে যায়। তখন দুঃসাহসী আগরওয়াল তার পিছনে দৌড়ে যায়।
কর্নেল বললেন—দানবটা বাইরে যাওয়ার পর আপনি কি দেখেছিলেন ওটাকে?
হংসধ্বজ বললেন—না। কারণ, আমি বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারিনি। অজ্ঞান হয়ে গেছলুম।
—তবে কেমন করে জানলেন যে ওটা প্রকাণ্ড এবং বরফের মতো সাদা?
—আমার লোকেরা বর্ণনা করেছে।
—হুম! আগরওয়াল সায়েব আমাকে যা বলেছেন—তা আপনার বর্ণনার সঙ্গে এক। উনি কিছুদূর তাড়া করে ফিরে আসেন। পাহাড়ের আড়ালে ওটা অদৃশ্য হয়।
বলে কর্নেল চুরুট বের করে জ্বেলে নিলেন। তারপর ফের বললেন—আগরওয়াল সাহেব ফিরে এসে আপনাকে অজ্ঞান দেখেন। তখন লোকজনকে খুব বকাবকি করেন। তাদের অবশ্য দোষ ছিল না। ওই বিস্ময়কর প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীটা প্রত্যক্ষ দেখে সবাই আতঙ্কে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। সেটাই স্বাভাবিক। আচ্ছা মিঃ সান্যাল, যে সার্ভেয়ার ভদ্রলোক গুলি ছুড়েছিলেন, তিনি কি এখনও আছেন ওখানে?
হংসধ্বজ মাথা নাড়ালেন।—সে একটা দুঃখের ব্যাপার কর্নেল। ভদ্রলোক ওই ভয়ানক প্রাণীটা দেখার পর থেকে কেমন অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর চাকরি ছেড়ে চলে যান। খুব অভিজ্ঞ খনিতত্ত্ববিদ ছিলেন। ধাতুবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ বটে। কী করি? থাকলেনই না যখন, আটকালুম না। আর শুধু উনি একা নন—সার্ভেয়ার গ্রুপের বাকি সবাই চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছে। এলাকার কুলিকামিনারও পালিয়েছে। অবশেষে নতুন সার্ভেয়ার গ্রুপ এবং কুলিকামিন সংগ্রহ করেছি আমরা।
আমি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলুম ভেতরে ভেতরে। তাহলে সেই রহস্যময় ভয়ঙ্কর দানবের খোঁজেই কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এখানে চলে এসেছেন? উত্তেজনা দমন করলুম। অরুণাচলে ইয়েতি নামে একটা সম্ভাব্য রিপোর্টাজ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। দৈনিক সত্যসেবকের বিক্রিসংখ্যা আবার একদফা বেড়ে যাবে।…
সন্ধ্যায় এসে পৌঁছলেন হরিহর আগরওয়াল। বয়সে হংসধ্বজেরই কাছাকাছি। আয়তনে একটু মোটা এই যা। রংটা ধবধবে ফর্সা। খুব হাসিখুশি মানুষ। দুজনে ছাত্রজীবন থেকেই বন্ধু। চা বাগিচা ও একটা খনিতে দুজনের অংশীদারীত্ব সমান সমান। চমৎকার বাংলা বলতে পারেন আগরওয়াল। অবাঙালি বলে চেনা কঠিন। এসে জানালেন—নতুন সার্ভেয়ার গ্রুপ এবং লোকজন অলরেডি চলে গেছে। কাজ শুরু হয়েছে। শীগগির পৌঁছনো দরকার। নয়তো তারাও পালাবে।
পরদিন সকালে আমাদের যাত্রা শুরু হল। ট্রেনে লামডিং, ডিমাপুর হয়ে তিনসুকিয়া এবং তারপর ডিব্ৰুগড়। সেখান থেকে আবার ট্রেনে ডাঙ্গোরি। ডাঙ্গোরি থেকে জিপের ব্যবস্থা করা ছিল। লোহিত নদী পেরিয়ে মদিয়া নামে একটা জায়গায় পৌঁছলুম—সেখানেই সভ্যজগতের সীমানা শেষ হয়েছে। দুটো দিন দুটো রাত কেটে গেল রাস্তায়। মদিয়া থেকে দুর্গম পাহাড় ও জঙ্গল শুরু। রাস্তা বলতে তেমন কিছু নেই। আমাদের জিপ কিন্তু হেলেদুলে নির্ভয়ে চলতে থাকল।
খামতি পৌঁছলুম সন্ধ্যা নাগাদ। তখন শরীর একেবারে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। নার্ভও বিপর্যস্ত। কর্নেল বুড়ো কিন্তু আশ্চর্য নির্বিকার। সারাপথ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অভিজ্ঞতা শুনিয়েছেন। এই সব অঞ্চলেই নাকি উনি ছিলেন এবং সব নখদর্পণে। এমনকি অনেক পাহাড়ি সর্দারের সঙ্গে ভাব হয়েছিল-কনেলের বিশ্বাস, দেখলে তারা এখনও চিনতে পারবে।
