হাসি চেপে বললাম, –কথাটা পিশাচ হালদারমশাই!
উত্তেজিত হলেই ঢ্যাঙা গড়নের এই গোয়েন্দা ভদ্রলোক আরও ঢ্যাঙা হয়ে ওঠেন যেন। গোঁফের ডগা তিরতির করে কাঁপে। বললেন, –মশায়! চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে সার্ভিস করছি। অন্ধকারে বনবাদাড়ে শ্মশানেমশানে ঘুরছি। কখনও পিচাশ দেখি নাই। কর্নেলস্যার, দেখছেন নাকি?
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার একটা গাবদা পুরোনো বই পড়ছিলেন। দাঁতের ফাঁকে আটকানো চুরুটের নীল ধোঁয়া তার চকচকে টাকের ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে খেলা করছিল। ঋষিসুলভ সাদা দাড়িতে একটুকরো চুরুটের ছাই আটকে ছিল। মুখ তুলতেই তা খসে পড়ল। বললেন, -কী হালদারমশাই?
-পিচাশ!
–নাহ। দেখিনি। তবে শুনেছি পিশাচ নাকি শ্মশানের আশেপাশে থাকে। মড়া খায়।
ধূমগড়ের পিচাশ ব্যাবাক একটা মড়া খাইয়া ফ্যালাইছে। –হালদারমশাই আবার একটিপ নস্যি নিলেন। উত্তেজনার সময় দেশোয়ালি ভাষায় কথা বলাও ওঁর অভ্যাস। বললেন : জয়ন্তবাবুগো পেপার না লিখলে কথা ছিল। ছয় লক্ষ সার্কুলেশন। তাই না জয়ন্তবাবু?
বললাম, -আজ রোববারে ছ লাখ। অন্যদিন চার লাখ। কিন্তু দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার ওই খবরটা মোটেও এক্সক্লুসিভ নয়। নিউজ এজেন্সির পাঠানো খবর। কাজেই এ খবরকে গুরুত্ব দেওয়া ঠিক নয়। আসলে পাতা ভরানোর জন্য অনেক সময় বাজে খবরও ঢোকাতে হয়। আবার সাংবাদিকরাও মাঝে মাঝে রাজনীতির কচকচি থেকে পাঠকদের রিলিফ দিতে মজার-মজার খবর তৈরি করেন। বিশেষ করে আজ রোববার ছুটির দিন পাঠকদের একটু আনন্দ দেওয়া মন্দ কী?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন- জয়ন্তের কথায় কান দেবেন না হালদারমশাই! ধূমগড়ের শ্মশানে সত্যিই পিশাচের ডেরা আছে। পিশাচটা একটা মড়ার পেট চিরে নাড়িভুড়িও খেয়েছে।
গোয়েন্দা ভদ্রলোক তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর যথারীতি যাই গিয়া বলে জোরে বেরিয়ে গেলেন।
বললাম, –সর্বনাশ! হালদারমশাই সত্যিই ধূমগড়ে গোয়েন্দাগিরি করতে যাচ্ছেন নাকি?
কর্নেল বললেন, -গেলে একটা রোমঞ্চকর অভিজ্ঞতা হতে পারে। তুমিও ওঁর সঙ্গ ধরলে পারতে।
–কী আশ্চর্য! আপনি এই গাঁজাখুরি খবরে বিশ্বাস করেন?
–করি বইকী। বিশ্বপ্রকৃতিতে রহস্যের কোনো শেষ নেই ডার্লিং!
–কর্নেল! আপনি কী বলছেন? পিশাচ-টিশাচ মানুষের আদিম বিশ্বাস। কুসংস্কার মাত্র।
আমার বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ বন্ধু একটু হেসে বললেন, তুমি ডারউইনের বিবর্তনবাদের কথা ভুলে যাচ্ছ জয়ন্ত! ক্রোম্যাগনন মানুষ এবং হোমো স্যাপিয়েন-স্যাপিয়েন অর্থাৎ আধুনিক মানুষের মধ্যেকার পর্যায়ে অবস্থা কী ছিল, এখনও বিশেষ জানা যায়নি। তাই মিসিং লিংক কথাটা বলা হয়। কে বলতে পারে পিশাচ সেই মিসিং লিংক নয়? বিশেষ করে ধূমগড় জায়গাটা আমি দেখেছি। পাহাড় জঙ্গল নদী আর প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মধ্যে রহস্যময় অনেক কিছুই থাকতে পারে। ওখানকার শ্মশানটাও ঐতিহাসিক।
কর্নেল বইটা টেবিলে রাখলেন। এতক্ষণে চোখে পড়ল, মলাটে সোনালি হরফে লেখা আছে : ধূমগড়ের রাজকাহিনি। বললাম, –তা হলে বোঝা যাচ্ছে, পিশাচের গল্প এই বইটাতেও আছে।
কর্নেল হাসলেন, -নাহ। এটা ধুমগড়ের প্রাচীন রাজবংশের কাহিনি। ১৮৯০ সালে রাজাবাহাদুর জন্মেজয় সিংহের লেখা পারিবারিক ইতিহাস।
ব্যাপারটা সন্দেহজনক কিন্তু।
–কেন?
কাগজে ধূমগড়ে পিশাচের খবর বেরুল, আর বইটাও আপনার হাতে চলে এল।
ষষ্ঠীচরণ আরেক দফা কফি আনল। কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল বললেন, -বইটা আমার হাতে উড়ে আসেনি। গত মাসে ধূমগড় গিয়েছিলাম অর্কিডের খোঁজে। ওই সময় ওখানকার রাজাদের বংশধর রণজয় সিংহের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। কথায়-কথায় বংশের লম্বাচওড়া গল্প শোনালেন। গল্পগুলো যে সত্যি, তা প্রমাণের জন্য এই বইটা আমাকে পড়তে দিলেন। আমি উঠেছিলাম নদীর ধারে ফরেস্ট-বাংলোয়। সেখানে বিদ্যুৎ নেই। হ্যারিকেনের আলোয় বইটা পড়তে শুরু করলাম। সকালে ফেরত দেবার কথা ছিল। হঠাৎ রণজয় সিংহ রাতদুপুরে গিয়ে হাজির। ভেবেছিলাম পারিবারিক ইতিহাসের বইটা নিয়ে কেটে পড়েছি কিনা দেখতে এসেছেন। কিন্তু তা নয়। ভদ্রলোক চুপিচুপি একটা অদ্ভুত কথা বললেন। বইয়ের ভেতর একটা ধাঁধা আছে।
ওটার জট ছাড়াতে পারলে আমাকে সাধ্যমতো পুরস্কৃত করবেন। ধাঁধাটা হল :
পাষণ্ডের পা
কভু ধরিস না
মস্তকে ঘা
কী জ্বলে রে বাবা।
কর্নেল কফিতে আবার চুমুক দিলেন। বললাম, -সেকেলে লোকেরা শুনেছি কথায়-কথায় ধাঁধা আওড়াতেন। কিন্তু এ ধাঁধাটা একেবারে গোলকধাঁধা।
আমি হেসে উঠলাম। কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন, -কী বললে? কী বললে? গোলকধাঁধা?
–হ্যাঁ। গোলকধাঁধাই বলা চলে।
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন হঠাৎ। তারপর টেলিফোনের কাছে গেলেন। ডায়াল করে সাড়া পেয়ে বললেন, -সঞ্জয়বাবু! কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। আপনার জ্যাঠামশাই, … চলে গেছেন? … ঠিক আছে। রাখছি।
টেলিফোন রেখে উজ্জ্বল হেসে কর্নেল আমার দিকে তাকালেন। বললেন, –ব্রিলিয়ান্ট, ডার্লিং ব্রিলিয়ান্ট! এ বেলা আমার ঘরে তোমার লাঞ্চের নেমন্তন্ন।
অবাক হয়ে বললাম ব্যাপার কী? হঠাৎ আমার এত প্রশংসার কী হল?
একটি জটিল রহস্যের সমাধান তোমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। –বৃদ্ধ রহস্যভেদী বাকি কফিটুকু শেষ করে চুরুট ধরালেন। বললেন : আসলে অনেকসময় আমরা জানি না যে আমরা কী জানি। অবশ্য তফাত শুধু একটা ও-কারের। ও-কার জুড়লেই তো সব জল হয়ে গেল।
