শ্রীমান রামগরুড়ের ছানা আমার বুকে সেঁটে রইল। কর্নেল পা টিপে টিপে এগিয়ে চলেছেন। একটু পরে দেখি, উনি থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর ঝোপের আড়ালে গিয়ে ওত পেতে বসলেন। আমরাও একটা প্রকাণ্ড পাথরের আড়ালে বসে আছি। চাঁদের আলোটা আবছা হলেও ওই জায়গাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীকে গাছপালার ভেতরে থেকে দৌড়ে বেরুতে দেখা গেল। স্পাইডারশিপের কাছে আসতেই কর্নেল তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ইন্দ্রনীল অবাক হয়ে বলল- কী ব্যাপার?
কর্নেলের ডাক শুনতে পেলুম- জয়ন্ত! তোমরা এখানে চলে এসো।
গিয়ে দেখি কর্নেল লোকটার পিঠে বসে আছেন। মাস্টার ব্লিক ব্লিক ক্লিক করতে করতে আমার কোল থেকে নেমে কর্নেলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কর্নেল বললেন-জয়ন্ত, ওখানে ওই কালো জিনিসটা পড়ে আছে। সাবধানে তুলে আমাকে দাও। ওটা লেসার পিস্তল।
মারাত্মক অস্ত্রটা কুড়িয়ে কর্নেলকে দিলাম। তখন কর্নেল ওর পিঠ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- মি. এক্স! এবার ভালোমানুষের মতো উঠে দাঁড়ান। দুঃখ করে লাভ নেই। যা বলছি, লক্ষ্মী ছেলের মতো শুনুন!
সে দুহাতে মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল। কর্নেল তাকে টেনে ওঠালেন! ফের বললেন-মি. এক্স। আমাদের সিহৌরা নিয়ে চলুন।
– আমি মি. এক্স নই। সজ্জন সিং রচপাল।
– মি. রচপাল! চলুন আমরা সিহৌরা যাই। আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ স্বালনের দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। সরকার যাতে আপনার বিস্ময়কর গবেষণায় সাহায্যে করেন, সে চেষ্টাও আমি করব। দেখলেন তো মি. রচপাল, আপনার ধ্বংস পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করার জন্য যেন প্রকৃতিই পালটা ব্যবস্থা রেখেছেন? আপনি প্রতিভাধর বিজ্ঞানী। আপনি আশাকরি বুঝতে পেরেছেন, ঈশ্বর কিনা জানি না-তাকে আমি ঈশ্বরও বলব না-কী এক দুয়ে শক্তি এখনও যেন সারা সৃষ্টিকে নজরে রেখেছে। মহাজাগতিক চৌম্বকপ্রবাহ তারই এক প্রহরী হয়তো।
সজ্জন সিং রচপাল রুমালে চোখ মুছে বললেন- ও কে। এক মিনিট, স্পাইডারশিপের ইউরেনিয়াম জ্বালানি কতটুকু আছে দেখে নিই।
বলে স্পাইডারশিপের ওপরকার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। তারপর আমাদের বোকা বানিয়ে চোখের পলকে প্রকাণ্ড চাকতির মতো হলুদ মাকড়সা গাড়িটা সাঁই করে আকাশে উড়ে গেল।
তারপর ঘটল ভয়ংকর ঘটনা। আকাশে একটা প্রচণ্ড লাল আগুনের ভাটার মতো ওটা পাক খেতে থাকল। তারপর তীব্র সাদা আলোর ঝলকানি দেখতে পেলুম। কর্নেল বললেন-সর্বনাশ! প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে কানে তালা ধরে গেল। কয়েক সেকেন্ড মাত্র। তারপর আর কিছু দেখতে পেলুম না। তেমনি সোনালি জ্যোৎস্না বুকে নিয়ে আকাশ নির্বিকার। নক্ষত্র ঝিলমিল করছে। টুকরো চাঁদটাও তেমনি নিস্পন্দভাবে ঝুলে আছে। কোথাও রাতপাখি ডাকল।
মাস্টার ব্লিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ তিনবার ব্লিক করে ডেকে সে দৌড়ুনো শুরু করল জলের দিকে। কর্নেল চেঁচিয়ে তাকে ডাকলেন- মাস্টার ব্লিক! মাস্টার ব্লিক!
হতচ্ছাড়া পাখিটা জ্যোৎস্নাভরা আকাশে ডানা মেলে উড়ে গেল। আমরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। …
.
উপসংহার
রান এলাকা পাকিস্তানের সীমান্তে। তাই দুর্গম জলাভূমি হলেও কোথাও কোথাও ভারতীয় প্রতিরক্ষা ঘাঁটি রয়েছে। দুদিন দুরাত্রি পরে প্রতিরক্ষা উপকূল বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার দৈবাৎ ওই এলাকায় গিয়ে আমাদের দেখতে পায়। আমরা তিনটি মানুষ তখন ক্ষুৎপীড়িত এবং দুর্বল। হেলিকপ্টারটি আমাদের সিহৌরা পৌঁছে দেয়। গিয়ে দেখি, বুদ্ধিমান পৃথীজিৎ সিং সেই পঙ্গপালের আস্তানার ফাটলগুলোকে কংক্রিট দিয়ে সিল করে দিয়েছেন। শুধু ভাবনা ছিল রামগরুড়ের ছানাটার জন্য। তার দুপায়ের তলায় মারাত্মক বিষাক্ত ভাইরাসের থলি আছে। রান এলাকায় তার অনুসন্ধানের ব্যবস্থা করে কর্নেল ইন্দ্রনীল ও আমাকে নিয়ে কলকাতা ফিরেছিলেন। কিছুদিন পরে কাগজে খবর বেরুল, রানের একটি দ্বীপে মাস্টার ব্লিককে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাকে থর মরুভূমির এক দুর্গম এলাকায় গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলা হয়েছে।
আর মহাজাগতিক চৌম্বক ঝড়ের রহস্যমোচন হয়েছিল আরও দুমাস পরে। ভানুপ্রতাপের কেল্লার ওখানে সেই প্রাচীন স্তম্ভের কাছে খুঁড়ে মাটির তলায় শক্তিশালী চুম্বক পাওয়া যায়। ঠিক তেমনি আরেকটি চুম্বক পাওয়া যায় সজ্জন সিং রচপালের ভুগর্ভস্থ ল্যাবরেটরিতে। সজ্জন সিং রচপাল সম্ভবত চুম্বকটি সিহৌরার ওই প্রাচীন অবজারভেটরি এলাকায় কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। দুটি চুম্বককে অজস্র টুকরো করে দেশের বিভিন্ন জায়গার জাদুঘরে রাখা হয়েছে। রাজনীতিক ভদ্রলোককে বাঁচানো যায়নি। তবে তার বয়সও ছিল ৮২ বছর। শুধু ইন্দ্রনীলের ব্যাপারটা বোঝ যায় না। কর্নেলের মতে, মহাজাগতিক কোনো দুয়ে শক্তি বেচারিকে নিয়ে একটু কৌতুক করেছিল। এ সেই ডোবার ব্যাং আর দুষ্টু ছেলেদের ঢিল ছোঁড়ার গল্পের মতো। ওদের কাছে যা খেলা, ব্যাংদের কাছে তা প্রাণান্তকর। পৃথিবীর মানুষ তো মহাজাগতিক পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাঙের চেয়ে অকিঞ্চিৎকর প্রাণী।
সে যাই হোক, মাস্টার ব্লিক অর্থাৎ সেই রামগরুড়ের ছানাটির জন্য এখনও আমার খুব দুঃখ হয়। ওর লাল মাথাটিতে যদি একটু বুদ্ধিসুদ্ধি থাকত। …
২.০৪ ধূমগড়ের পিশাচ রহস্য
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হাতে নস্যির কৌটো। হঠাৎ বলে উঠলেন, –অ্যাঃ! পিচাশ!
