তিনজনে অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে বেলাভূমিতে নামলাম। এখন দৃষ্টি স্বচ্ছ। হয়েছে। আকাশে নক্ষত্র ঝিকমিক করছে। চাঁদ উঠতে দেরি আছে। বেলাভূমি ধরে আমরা দুরের দিকে হেঁটে চললুম। সেইসময় কর্নেল বলে উঠলেন- ওই যাঃ! সেই টিভিটা বন্ধ করে আসা উচিত ছিল। ওটার স্বয়ংক্রিয় অ্যান্টেনা আমাদের গতিবিধি দেখিয়ে দেবে।
বললুম- আমরা যদি না নড়াচড়া করে কোথাও বসে থাকি, তাহলে বোধ করি টিভি পর্দায় আমাদের ছবি ফুটে উঠবে না। আমি লক্ষ্য করেছি, ওই নোকটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকছিল, তখনই পর্দায় কোনো ছবি উঠছিল না। মুভিং অবজেক্টের ছবিই ওতে ফোটে।
কর্নেল বললেন-শুধু মুভিং অবজেক্ট নয় জয়ন্ত। অবজেক্ট কোনো প্রাণীর হওয়া চাই। মাস্টার ব্লিক, সাবধান! এখনকার মতো নড়বে না। ব্লিক ক্লিক করবে না। কেমন?
মাস্টার ব্লিক বলল- ব্লিক!
– চুপ! কর্নেল থাপ্পড় তুলে বললেন। -স্পিকটি নট। তারপর তাকে কোলে তুলে নিলেন।
ডাইনে পাথরের স্তূপ আবছা নজরে আসছিল। আমরা সেদিকে এগিয়ে গেলুম। এতক্ষণে ইন্দ্রনীল বলল- এটা কী পাখি?
কর্নেল বললেন- পৌরাণিক গরুড়পক্ষী। আর কথা নয়। নড়াচড়া নয়। এখানে চুপচাপ বসা যাক।
.
রহস্যময় নীল কুয়াশাবৃত্ত
মাথার ওপরে রাতের আকাশের নক্ষত্র ঢেকে একটা নীলচে রঙের বিশাল বৃত্ত নেমে আসতে দেখে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম- কর্নেল! কর্নেল! ওটা কী?
কর্নেল দেখে বললেন- মুখ গুঁজে থাকো সবাই। চোখ বন্ধ রাখো। সাবধান!
শনশন শব্দে তীক্ষ্ণ হুইসিল। তারপর চারদিক হালকা নীল আলোয় ভরে গেল। সেই সঙ্গে শুরু হল প্রলয় কাণ্ড। প্রচণ্ড ঝড় আমাদের ধাক্কা মেরে নিচের বেলাভূমিতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকল। হামাগুড়ি দিয়ে পাথরের গায় ঝুঁকে আমরা বসে রইলুম।
কর্নেল মৃদুস্বরে বললেন- মহাজাগতিক চৌম্বক ঝড়। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার সিহৌরা গ্রামে দেখেছি মানুষের তৈরি যা কিছু জিনিসের ওপরই এই অদ্ভুত ঝড়ের হামলা। পালিত পশুও অবশ্য মারা পড়েছিল দেখেছি। সম্ভবত মানুষের সংসর্গে বাস করে বলে তাদের ওপরও হামলা হয়েছে। কিন্তু তত বেশি ক্ষতি করা যেন এ ঝড়ের উদ্দেশ্য নয়। জয়ন্ত, মহাজাগতিক কোনো বুদ্ধিমান সত্তা যেন কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এই হামলা করছে।
বললুম- আমারও তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু বেছে বেছে শুধু সিহৌরা এলাকা। আর রানের এই দ্বীপে কেন?
ইন্দ্রনীল বলল- এবার আমার কথা শুনুন। পাঞ্জাবের ওপর দিয়ে হ্যাং গ্লাইডারে উড়ে আসতে হঠাৎ বাতাসের ধাক্কায় রাজস্থানের থর মরুভূমির আকাশে চলে গিয়েছিলুম। গ্লাইডারে কনট্রোল সিস্টেম ছিল। বাতাসের জোর কমলে আবার দক্ষিণে ঘুরিয়ে দিলুম গ্লাইডার। বেলা পড়ে এসেছিল। একসময় ম্যাপ এবং চার্ট মিলিয়ে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করে দেখি, আমি গুজরাটের দিকে চলেছি। তারপর অবিষ্কার করলুম কনট্রোল সিস্টেম অকেজো হয়ে গেছে। কিছুতেই গ্লাইডারর গতিপথ বদলাতে পারলুম না। ব্যাটারি পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। আলো নিভে গেছে। অসহায় হয়ে ভেসে চলেছি আকাশে। যে কোনো মুহূর্তে আশঙ্কা করছি, পাহাড়ে ধাক্কা লেগে গুঁড়ো হয়ে যাব। হঠাৎই দেখি গ্লাইডার নেমে চলেছে। ডানা দুটো নব্বই ডিগ্রি বরাবর কাত হয়েছে। পালকের মতো নেমে পড়ল আমার হ্যাং গ্লাইডার। বেল্ট খুলে নেমে এলুম। অন্ধকারে কিছু দেখতে পাচ্ছিলুম না। কম্পাসও অচল। তাই দিক নির্ণয়ের জন্য আকাশে ধ্রুবতারা খুঁজতে লাগলুম। তারপর অবাক হয়ে দেখি, আমার ওপর একটু আগে যে নীল কুয়াশাবৃত্ত নেমে এসেছিল, ঠিক তেমনি একটা জিনিস ভেসে আছে। তারপর আমি ভীষণ চমকে গেলুম। বলতে পারেন, আমি একটা গাঁজাখুরি গল্প শোনাচ্ছি। বিশ্বাস করুন, আমার প্রতিটি কথা সত্য।
কর্নেল বললেন- না, না। বলুন আপনি!
–আমি দেখলুম যেন চুম্বকের টানে সোজা ওপরে উঠে যাচ্ছি। একটুও ওজন নেই শরীরের। মাধ্যাকর্ষণ টের পাচ্ছি না। নীল কুয়াশাবৃত্তটার কাছাকাছি পৌঁছে টের পেলুম ওটা আমাকে যেন ঝুলন্ত অবস্থায় নিয়ে চলেছে। আঁতকে অজ্ঞান হয়ে গেলুম। যখন জ্ঞান হল, চোখ খুলে দেখি জঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছি। অন্ধকার হলেও এটা জঙ্গল, তা বুঝতে পারছিলুম। টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালুম। তারপর আশ্রয়ের খোঁজে হাঁটতে থাকলুম। কতবার আছাড় খেয়ে কাটায় পোশাক ছিঁড়ে ফালাফালা হল। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা লালবাতি উঁচুতে জ্বলে উঠে তক্ষুনি নিভে গেল। অনুমান করে সেই দিকে ওই ভাঙা বাড়িটায় হাজির হয়েছিলুম। তারপর আপনারা
কর্নেল বললেন- চুপ।
পশ্চিমের জলাভূমিতে লাল নীল হলুদ আলোর বিন্দু পর্যায়ক্রমে জ্বলেত জ্বলতে কী একটা এগিয়ে আসছিল। সেটা তীরে এসে পৌঁছুলে দেখলুম স্পাইডারশিপ এতক্ষণে ফিরল। কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। চাপা গলায় বললেন- বিজ্ঞানী ভদ্রলোক ফিরে এলেন। ল্যাবরেটরির দশা দেখে আশাকরি রাগের চোটে আরও পাগল হবেন। এসো জয়ন্ত, আসুন ইন্দ্রনীলবাবু! আড়াল থেকে ব্যাপারটা দেখা দরকার। সুড়ঙ্গপথ আমরা খুলে রেখেছিলুম। কাজেই মহাজাগতিক চৌম্বক ঝড় ওঁর ল্যাবরেটরির সব যন্ত্র নিষ্ক্রিয় করে রেখে গেছে।
বেলাভূমির ধারে পাথরের আড়ালে আমরা চুপিচুপি এগিয়ে চললুম। স্পাইডারশিপটা মাকড়সার মতো দুদিকে ঠ্যাং বের করে তরতরিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। এতক্ষণে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদটা ক্ষীণ জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছে। সেই হালকা হলুদ আলোয় হলুদ রঙের স্পাইডারশিপকে থামতে দেখলুম জঙ্গলের ভেতরে। কর্নেল ফিশফিশ করে বললেন- জয়ন্ত, মাস্টার ব্লিককে ধরো, আশা করি আর। তোমাকে ঠোকরাবে না।
