– আমি ফ্লাইং সসারের অনুকরণে ওটা তৈরি করেছি। খেলায় ডিসকাস থ্রোয়িং নিশ্চয় দেখেছেন। এই গাড়িটা ডিসকাসের গড়নে তৈরি। তাই সামান্য স্পিড দিলে স্পিড বহুগুণ বেড়ে যায়। আকাশে, জলে বা স্থলে সমান বেগে ছুটতে পারে ছুঁড়ে মারা ডিসকাসের মতো।
–কিন্তু এবার আপনি কেন প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করছেন না? যদি বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আপনার পক্ষ থেকে গিয়ে সব কথা খুলে বলব।
হাত তুলে বলল- কোনো দরকার নেই। বাবা-মায়ের মৃত্যুর খবর যেদিন কাগজে পড়েছি, সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছি আমি দেশটাকে ধ্বংস করে দেব। দেশটা গলেপচে গেছে। এর মৃত্যু হওয়া দরকার।
শ্বাস ছেড়ে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর আসছি বলে লিফটের কাছে গিয়ে সুইচ টিপে লিফটের দরজা খুলল এবং ভেতরে ঢুকে ফের সুইচ টিপল। লিফটা বিদ্যুৎগতিতে ওপরে উঠে গেল। …
.
ইন্দ্রনীলের আবির্ভাব
মাস্টার ব্লিক একটু আগে থেকে উশখুশ করছিল। এতক্ষণে দুবার ব্লিক ক্লিক করে উঠল। কর্নেল তার কাঁধে হাত রেখে বললেন- কী হয়েছে মাস্টার ব্লিক?
পাখিটা হঠাৎ ট্যাঙস ট্যাঙস করে এগিয়ে গেল। তারপর প্রথম কম্পিউটারের কাছে গিয়ে টিভি পর্দার দিকে তাকিয়ে ফের ব্লিক ক্লিক করতে থাকল। এবার পর্দার দিকে চোখ গেল আমাদের। কর্নেল বললেন-বুঝেছি! মাস্টার ব্লিক তার স্রষ্টাকে পর্দায় দেখতে পেয়েছিল।
পর্দায় আবছা জঙ্গলের দৃশ্য ফুটে উঠেছে এবং বিজ্ঞানীপবরের আঙুলের ডগায় আলো জ্বলছে। সেই আলোতেই রাতের জঙ্গল একটু-একটু আভাসিত হচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে সে? বুঝতে পারছি, ওপরকার জঙ্গল তথা দ্বীপের দৃশ্য এখানে বসেই দেখা যায় এবং বিজ্ঞানী লোকটা এভাবেই নজর রাখে, কেউ এ দ্বীপে এসে পড়েছে কিনা। সে ঢালু পথ ধরে বেলাভূমিতে নামল। তারপর জলের ধারে দাঁড়িয়ে বাঁ হাতের তর্জনী তুলে কী ইশারা করতে থাকল। একটু পরে জল থেকে ভেসে উঠল সেই হলুদরঙের স্পাইডারশিপ। কর্নেল বললেন- বুঝতে পারছ জয়ন্ত? বাঁ-হাতের আঙুলে রিমোট কনট্রোল সিস্টেম রয়েছে। তার সাহায্যে গাড়িটা ডেকে আনলেন ভদ্রলোক।
রাগ করে বললুম ভদ্রলোক বলবেন না। সিহৌরার লোকে ওকে দানা বলে। লোকটা সত্যি একটা দানো।
স্পাইডারশিপে ঢুকে গেল সে। তারপর মুহূর্তেই গাড়িটা জলমাকড়সার মতো বিদ্যুৎবেগে অদৃশ্য হল অন্ধকারে।
হঠাৎ কর্নেল বললেন-আরে। এ আবার কে? স্ক্রিনে আবছা কালো একটা মূর্তি ফুটে উঠেছে। মূর্তিটা পা টিপে টিপে এগিয়ে আসছে কেল্লাবাড়ির দিকে। একটু পরে ওপরকার ঘরের মেঝেয় তার সিলট মূর্তি দেখা গেল। বুঝলুম, এই কম্পিউটারাইজড় টিভির স্বয়ংচালিত অ্যান্টেনা সবরকম মুভিং অবজেক্টকে কেন্দ্র করে ছবি পাঠায়। মূর্তিটা বসে পড়েছে এবার। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পর্দা থেকে মূর্তিটা মুছে গেল। কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর লিফটের সুড়ঙ্গের কাছে গেলেন। তখনি ব্লিক খুট খুট শব্দে একটা রোবট কোত্থেকে এসে কর্নেলের কোট খামচে ধরল যান্ত্রিক হাতে। আমি আঁতকে উঠলুম। মাস্টার ব্লিক এসে রোবটটার পিঠে জোরে ঠোকর মারল। ঠনাত করে শব্দ হল। কর্নেল রোবটটাকে দেখছিলেন। হাত বাড়িয়ে তার মাথার দিকে আনতেই রোবটটা অন্য হাতে কর্নেলের হাতটা চেপে ধরল। কর্নেল বললেন-জয়ন্ত! জয়ন্ত! ওর মাথার লাল বোতামটা জোরে টিপে দাও।
দৌড়ে গিয়ে লাল বোতামে চাপ দিলুম। তখনি রোবটের দুটো হাত ঝুলে পড়ল। কর্নেল একটু হেসে বললেন- জাপানি ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল রোবট গার্ড। টোকিয়োর একটা কারখানায় এই প্রহরীরোবট গতবছর দেখে এসেছিলুম। ভাগ্যিস, কনট্রোলসিস্টেমটা জেনে নিয়েছিলুম। কাজে লাগল। যাইহোক, দেখি লিফটটা নামানো যায় নাকি।
বললুম-ওপরে গিয়ে চাবি এঁটে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে গেছে হয়তো।
– দেখা যাক। বলে কর্নেল খুঁটিয়ে সুড়ঙ্গের ফ্রেমটা লক্ষ্য করতে থাকলেন। এটা-ওটা টেপাটেপি করেও কোনো কাজ হল না।
তখন কর্নেল বললেন-নিশ্চয় কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আছে কোথাও। একটা মাদার কনট্রোল সিস্টেম না থেকে পারে না। চলো তো, খুঁজে দেখি শিগগির!
খুঁজতে খুঁজতে হন্যে হলুম দুজনে। মাস্টার ব্লিক নিষ্ক্রিয় রোবটটার গায়ে ঠোক্কর মারছে, কামড়ে ধরছে। হঠাৎ কর্নেল বললেন- নিশ্চয় সেটা ওর চেয়ারে বা টেবিলের কোথাও থাকা উচিত।
বলে টেবিলের কাছে গেলেন। খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে টেবিলের তলায় পয়ের কাছে একটা ছোট্ট বাকসো পেয়ে গেলেন। বাকসোটার সঙ্গে তার পরানো আছে একগুচ্ছের। টেবিলে রেখে সংকেত চিহ্ন দেখতে দেখতে একটা খুদে সুইচে চাপ দিলেন। ঘস করে একটা শব্দ হল। তারপর আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, লিফটটা নেমে এল। কর্নেল বললেন-আপাতত এখনই এখান থেকে বেরুনো দরকার।
লিফটে মাস্টার ব্লিককেও চাপানো হল। রোবটটা দাঁড়িয়েই রইল তেমনি। আমরা ওপরে উঠে গেলুম। লিফটের আলোয় দেখলুম সেই মূর্তিটা ওকজন মানুষের। পরনে শতচ্ছিন্ন পোশাক। ক্লান্ত চেহারা। চমকে উঠে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
আমাদের দেখে সে ভীষণ অবাক হয়ে গেছে সন্দেহ নেই। কর্নেল তার সামনে গিয়ে বলে উঠলেন- আপনি কি ইন্দ্রনীল রায়? মাথা নেড়ে একটু হাসবার চেষ্টা করল সে।
–শিগগির আমাদের সঙ্গে আসুন। জয়ন্ত, ওঁকে একটু সাহায্য করো। আমাদের এখনই কোথাও লুকিয়ে পড়া দরকার।
