নিষ্ঠুর হেসে আবার কাগজে আঁক কেটে বলল- এবার দ্বিতীয় পয়েন্ট গরুড়পাখির অভিযান। এই পাখির নখের ভেতরে জৈব বিষের থলি রয়েছে। ঠিক একমাস বয়স হলে এ পাখির নখের ভেতরকার বিষের থলিদুটো ফেটে যাবে এবং যেদিকে উড়ে যাবে সে সেদিকেই বিষ ছড়িয়ে পড়বে বাতাসে। বিষের কণা মাটি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেবে এক প্রজাতির সাংঘাতিক ভাইরাস! সেই ভাইরাস ব্যাপক রোগ ছড়াবে- যার কোনো ওষুধ এখনও অনাবিষ্কৃত।
এরপর কাগজে একটা গোল্লা আঁকল বিজ্ঞানী। বলল –এটা ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট একজন মানুষ। একজন জীবিত মানুষ থেকে ওই যে দেখছেন কফিনে শুয়ে আছে- তার দেহকোষ থেকে তৈরি হবে পৃথক প্রজাতির এক মানুষ, যার সঙ্গে স্বাভাবিক মানুষের যত মিল, অমিলও তত। এই কফিনের লোকটা এদেশের একজন ঝানু রাজনীতিক। তাকে আমি ধরে নিয়ে এসেছি। জনসভায় গরম গরম বক্তৃতা করে এসে সে তার বাড়ির ছাদের ফুলবাগানে একলা বসে মদ্যপান করছিল। রাতটা ছিল জ্যোৎস্নার।
খিকখিক করে হাসতে লাগল বিজ্ঞানী। কর্নেল বললেন- এই রাজনীতিকের দেহকোষ থেকে কি পৃথক প্রজাতির রাজনীতিক সৃষ্টি করতে চাইছেন?
– ঠিকই ধরেছেন। আপনি বুদ্ধিমান বলেই তো আপনার মৃত্যুর আগে ব্যাপারটা দেখিয়ে দেওয়া উচিত মনে করেছি। আমার সৃষ্ট নতুন প্রজাতির রাজনীতিক মানুষ হবে সব স্বাভাবিক। রাজনীতিকের এক মূর্তিমান সমবায়। দুর্ভিক্ষ ও মহামারির পর যারা বেঁচে থাকবে, তাদের ধ্বংস ত্বরান্বিত করার জন্যই এমন একজন রাজনীতিওয়ালা দরকার কি না বলুন? আসলে যে প্রজাতির রাজনীতিওয়ালা পৃথিবীতে অগামী যুগে স্বাভাবিক নিয়মে আবিষ্কৃত হবে। আমি জেনেটিক্সের ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় তাদের একজন অগ্রগামীকে এখনই সৃষ্টি করতে চাই। কারণ নিউক্লিয়ার যুদ্ধের আগেই পৃথিবী থেকে মানুষের চিহ্ন মুছে যাক-এই আমি চাই।
-মানুষের ওপর এত ক্রোধ কেন আপনার?
একটু চুপ করে থাকার পর লোকটা বলল-প্রথমে মানুষের ওপর ক্রোধ ছিল না, ছিল দেশের সরকারের ওপর। পরে ভেবে দেখলুম, মানুষই তো সরকার গড়ে কোথাও প্রকাশ্যে ভোট দিয়ে কোথাও নীরব সমর্থনে কিংবা নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষ থেকে। দেশের মানুষের যেমন প্রকৃতি, তাদের সরকারও হয় তেমন প্রকৃতির।
– সরকারের ওপর আপনি ক্রুদ্ধ কেন?
-তাহলে গোড়ার কথাটা বলতে হয়।
-বলুন। আমার শুনতে ইচ্ছে করছে।
– আমি ছিলুম প্রতিরক্ষা গবেষণা দফতরের একজন সহকারী বিজ্ঞানী। রাসায়নিক যুদ্ধের প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা করছিলুম। সে আজ পনেরো বছর আগের কথা। আমি যার অধীনে কাজ করছিলুম, সেই লোকটার বিজ্ঞানে একটা ডক্টরেট ছিল বটে, আদতে সে ছিল হাড়ে হাড়ে একজন ব্যুরোক্রাট স্বভাবের লোক। অকর্মার ধাড়ি। এক মন্ত্রী আত্মীয়ের জোরে আমার মাথার ওপর বসেছিল। আমি রাসায়নিক যুদ্ধের প্রতিরোধ হিসেবে জেনেটিক্স নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলুম। ক্লোনিংতত্ত্বকে বাস্তবে সফল করার কথা ভাবছিলুম। বিভিন্ন প্রতিরোধস্বভাবী ভাইরাসের কোষ থেকে ক্লোনিং করে এক নতুন প্রজাতির ভাইরাস সৃষ্টি করতে পারলে রাসায়নিক যুদ্ধে শত্রুপক্ষের ব্যবহৃত বিষাক্ত পদার্থ তাকে দিয়ে হজম করানো যায়। আপনি নিশ্চয় খবরে পড়েছেন, সমুদ্রের জলে পেট্রল ট্যাংকার থেকে পেট্রল পড়ে জলদূষণ ঘটে এবং সেই পেট্রল নিঃশেষে খেয়ে ফেলে সমুদ্রকে দূষণমুক্ত করবে, এমন একরকম ভাইরাস আমেরিকার এক বাঙালি বিজ্ঞানী সৃষ্টি করেছেন?
– হ্যাঁ। পড়েছি।
– ঠিক তেমনি। কিন্তু আমার বস ভদ্রলোক আমার সমগ্র গবেষণা ও ফলাফল নিজের নামে প্রচার করলেন। আমি প্রতিবাদ করায় আমাকে সাসপেন্ড করলেন, তাই নয়-গুন্ডা দিয়ে শাসালেন যে যদি এ নিয়ে আমি হইচই করি, আমার প্রাণ যাবে। আমি জেদি মানুষ। প্রধানমন্ত্রীকে সব লিখে জানাব ঠিক করলুম। কিন্তু কীভাবে খবর পেয়ে শয়তানটা অন্য চক্রান্ত করল। আমি পাকিস্তান সরকারকে নাকি কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার রেজিস্ট্যান্স প্রজেক্টের মূল্যবান নথি পাচার করে দিয়েছি। আনি নাকি গুপ্তচর! বেগতিক দেখে অমি গা-ঢাকা দিলুম! কারণ আমি জানি, এই সাংঘাতিক অপরাধে আমার চরমদণ্ডও হতে পারে!
– কিন্তু আপনি সে অপরাধ করেননি।
-না। তারপর আমাকে না পেয়ে আমার বৃদ্ধ বাবা-মাকে ধরে নিয়ে গেল। আমাদের ঘরদোর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করল। তবু আমি ধরা দিলুম না। কারণ আমার গবেষণার চূড়ান্ত সাফল্য বাকি তখনও। তারপর গত পনেরোটা বছর ধরে আমি লড়াই করে গেছি বাকি কাজ শেষ করার জন্য। অর্থসংগ্রহ করেছি চম্বলের ডাকাতদের দলে ভিড়ে। ছদ্মবেশে ছদ্মনামে বিদেশে গেছি। কচ্ছ। উপকুলের স্মাগলারদের সাহায্যে বিদেশি যন্ত্রপাতি আনিয়েছি। পোর্তুগিজ জলদস্যুদের এই গোপন ডেরার কথা আমি নানা সূত্রে জেনেছিলুম। আমার একটা গোপন গবেষণাগারের দরকার ছিল। পেয়ে গেলুম এখানে, তারপর
বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন-আপনার বাবা-মা কি এখনও বন্দি?
গলার ভেতর বলল- না। দু বছর আগে তাঁরা জেলেই মারা গেছেন।
– আপনার জীবন আশ্চর্য রোমাঞ্চকর। আপনার কৃত্বিত্বও বিস্ময়কর। কর্নেল প্রশংসা করে বলতে থাকলেন। -বিজ্ঞানের সমস্ত শাখায় আপনার প্রতিভার স্বাক্ষর দেখতে পাচ্ছি। ওই স্পাইডারশিপও এক বিস্ময়কর সৃষ্টি!
