লোকটা চটে গেল। –প্রাকৃতিক বস্তুর জিনিস? বাজে কথা বলবেন না। কর্নেল বিনীতভাবে বললেন- অজ্ঞতার জন্য এ অপরাধ করে ফেলেছি। ক্ষমা চাইছি।
লোকটার মুখে গর্ব ফুটে উঠল। -যাই হোক, আমার দ্বিতীয় পরীক্ষাও সফল হয়েছে। পৌরাণিক গরুড়ের জন্ম সম্ভব হয়েছে। গতবছর যে গরুড় পাখির উদ্ভব ঘটেছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে কসমিক ঝড়ের তাণ্ডবে সে মারা পড়েছিল। এবার
কর্নেল চমকে উঠে দ্রুত বললেন- পৃথিবীতে কসমিক ঝড়? সে তো মহাকাশের ঘটনা।
লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল- হ্যাঁ। সূর্যের কেন্দ্রে ওই ঝড় কোথা থেকে এসে ধাক্কা মারে। সূর্যের আয়তন বেড়ে যায়। কিন্তু গত একটা বছর ধরে লক্ষ্য করছি, এক বর্গমাইল আয়তনের একটা কসমিক ঝড় এসে পৃথিবীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আগের রাতেও ঝড়টা এসেছিল। তাই আমি এই দ্বিতীয় গরুড় পাখিটির জন্য খুব উদ্বিগ্ন ছিলুম। তবে এ যে বেঁচে আছে, তার প্রমাণ অবশ্য পাচ্ছিলুম। এর জন্মের আগে থেকে জ্বণকোষে ধ্বনিসংকেত পাঠানোর ব্যবস্থা করা ছিল এবারে।
– হুঁ, ওই ব্লিক ব্লিক ডাকটা।
-ঠিক ধরেছেন। আপনাকে বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে।
-ওই শুনেই ওর নাম রেখেছি মাস্টার ব্লিক।
লোকটা হাসতে লাগল–আপনি মশাই বড়ো রসিক দেখছি। মাস্টার ব্লিক!
কর্নেল সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন। কিন্তু কেন কসমিক ঝড় এসে পৃথিবীতে আঘাত হানছে-এবং বেছে-বেছে ঠিক সিহৌরা এলাকায়? এ সম্পর্কে কি কিছু ভেবে দেখেছেন? আমাদের লোকাস্ট প্রজেক্টের ক্যাম্পে সব যন্ত্রপাতি অচল করে দিয়েছে ওই ঝড়। তাছাড়া তীক্ষ্ণ হুইসিল আর একটা নীল আভা!
লোকটা গুম হয়ে কী ভাবল। তারপর বলল আপনি লক্ষ্য করেছেন তাহলে। ঝড়টা মাঝে মাঝে এই দ্বীপেও হানা দেয়। ভাগ্যিস মাটির তলায় এবং বিশেষ নিরোধক ব্যবস্থা থাকায় আমার ল্যাবোরেটরি এখনও অক্ষত রয়েছে। এটা আসলে ষোলো শতকে তৈরি পোর্তুগিজ জলদস্যুদের ঘাঁটি। মাটির তলায় এই ঘরটায় ওরা আরবসাগর থেকে বাণিজ্য জাহাজ লুঠ করে এনে সব দামি জিনিস লুকিয়ে রাখত।
কর্নেল হঠাৎ বললেন- আপনি জেনেটিক্স বিজ্ঞানী। ক্লোনিংতত্ত্বকে বাস্তবে সফল করতে পেরেছেন। তার প্রমাণ লুনি নদীর ধারে বেহড় এলাকায় ফাটলের ভেতর ওই পঙ্গপাল! আরও প্রমাণ এই মাস্টার ব্লিক। কিন্ত কেন আপনি গোপনে গোপনে এসব করছেন?
– কেন? বিজ্ঞানীর চোখদুটো জ্বলে উঠল। আপনাদের আমি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছি। মৃত্যুর আগে সব কথা জেনে যেতে পারবেন।
শুনে আমার মাথার খুলির ভেতরটা শূন্য হয়ে গেল এবং একটা ঠান্ডা ঢিল গড়িয়ে গেল যেন। আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেলুম। কর্নেল নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলেন নোকটার দিকে।
সে নিষ্ঠুর মুখে আবার বলল- আর মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টা আপনাদের আয়ু। কারণ আমার আরও একটা ক্লোনিং প্রক্রিয়ার সাফল্য আপনাদের দেখিয়ে তাক লাগাতে চাই। সেই বিস্ময় নিয়েই আপনাদের মৃত্যু হোক। …
.
ধ্বংসের পরিকল্পনা
লোকটা প্রতিভার বিজ্ঞানী। কিন্তু উন্মাদ বলে মনে হচ্ছিল তাকে। তার হাবভাবে ক্রমশ অপ্রকৃতিস্থ মানুষের আচরণ ফুটে বেরুচ্ছিল। সে চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে চোখ কটমট করে আমাদের দিকে একবার তাকাল। তারপর চলে গেল কফিনটার কাছে। কাচের কফিনটার ঢাকনা খুলে সে ঝুঁকে রইল কিছুক্ষণ। তারপর পাশের একটা প্রকাণ্ড কম্পিউটারের বোর্ডে আটকানো একটা স্প্রিংয়ের মতো কুণ্ডলী পাকানো তার টেনে কফিনের ভেতর ঢোকাল। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না কী সে করছে। একটু পরে সে ঢাকনা খোলা রেখেই অন্য একটি কম্পিউটারের সামনে গেল। পর্দায় লাল-নীল আলোর রেখা জ্বলে উঠছে, নিভে যাচ্ছে। বিচিত্র আঁকিবুকি ফুটে উঠছে। সে খুব মন দিয়ে সেগুলো লক্ষ্য করতে থাকল।
কর্নেলের দিকে তাকালাম। এই বৃদ্ধও কম প্রতিভাধর নন। বহু সাংঘাতিক বিপদের মুখে ওঁর বুদ্ধি, সাহস ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখে অবাক হয়েছি। কিন্তু তাকেও এখন অসহায় মনে হচ্ছিল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখতে পাচ্ছিলুম। মাস্টার ব্লিক কখন থেকে ছবির মতো নিস্পন্দ দাঁড়িয়ে আছে। তার দুই চোয়াল থেকে বেরুনো শুঁড় দুটো খাড়া হয়ে রয়েছে।
কিছুক্ষণ পরে লোকটা ফিরে এসে চেয়ারে বসল। ঘড়ি দেখে গম্ভীরভাবে বলল… আপনাদের মৃত্যুর ঘড়ি চালু করে দিয়ে এলুম। আর একাত্তর ঘন্টা চল্লিশ মিনিট তেরো সেকেন্ড বাকি।
কর্নেল শান্তভাবে বললেন আপনার এ ক্লোনিংয়ের উদ্দেশ্য কী?
– প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল সৃজনমূলক। এখন ধ্বংসমূলক।
–আপনি কি কারুর ওপর প্রতিশোধ নিতে চাইছেন?
–অবশ্যই। আমাদের প্রতিশোধের পরিকল্পনা ত্রিমুখী। বলে সে টেবিলের ড্রয়ার থেকে এক শিট কাগজ বের করল। কলম টেনে নিল সুদৃশ্য কলমদানি থেকে। কাগজে আঁক কেটে বলল এই দেখুন আমার ধ্বংসের অভিযান কী ভাবে শুরু হবে। প্রথম পয়েন্ট হল ডেজার্ট লোকাস্ট-মরু পঙ্গপাল। এদের কোনো পেস্টিসাইডস প্রয়োগ করেও মারা যাবে না। কারণ এদের শরীরে প্রতিরোধ শক্তি প্রচণ্ড। মার্চ-এপ্রিলের প্রথমে এরা উত্তর-পশ্চিম ভারতের শস্যক্ষেত্রে গিয়ে হানা দেবে। খারিফ শস্য আর ঘরে উঠবে না। দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। সরকারের উদ্বৃত্ত খাদ্যভাণ্ডার খালি হয়ে যাবে রিলিফের কাজে। তারপর আবার পঙ্গপালের ব্রিডিং এবং আরও শক্তিশালী পঙ্গপাল আগামী শরতকালে পূর্বভারতে গিয়ে হানা দেবে। একই অবস্থার সৃষ্টি হবে। বিদেশের কাছে খাদ্যের জন্য হাত পাততে হবে।
