মাত্র মিনিট তিনেক হয়েছে কিনা সন্দেহ। শেষ বেলার আলোর নিচে সমুদ্রের মতো বিস্তীর্ণ জল চোখে পড়ল। তারপর আবার শিসের শব্দ, শনশন আওয়াজ তারপর দেখি আমরা জলে নেমেছি। তরতর করে জল ছুঁয়ে ছুটে চলেছে একটা জলমাকড়সার মতো এই অদ্ভুত গাড়িটা। একটুও জল ছিটকে পড়ছে না। জলে দাগ কাটছে না। মনে হল, এটার যেন কোনো ওজনই নেই। তাই মাটিতে কোনো চিহ্ন খালিচোখে দেখা যায়নি। কর্নেলকে আতশকাচ ব্যবহার করতে হয়েছিল। ওজন নেই বলে মাকড়সার ঠ্যাঙের মতো আঁকশি বের করে মাটি আঁকড়ে ধরে থাকে।
সামনে সবুজ রেখা ফুটে উঠল। দ্বীপ সম্ভবত। বেলাভূমির বালির ওপর পিছলে উঠে পড়ল গাড়িটা। তারপর এগিয়ে চলল তেমনি তরতরিয়ে। এতক্ষণে লক্ষ্য করলুম, গাড়িটার ঠ্যাং আছে। মাকড়সার মতো। পথ বলতে কিছু নেই। চড়াইয়ে উঠে গেছে সমতল মাটি। দুধারে জংলা উঁচু সব গাছ। এখানে থেমে গেল গাড়ি। লোকটা বলল- আসুন গরিবের পর্ণকুটিরে।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখি বনের ভেতর একটা জীর্ণ পাথরের বাড়ি-দেখতে কেল্লার মতো। মাথার ওপর গাছপালা বলে আবছা আঁধার ছমছম করছে। লোকটার আঙুলের ডগায় আলো ফিট করা আছে। সেই আলোয় ওর পেছনে পেছনে হেঁটে চললুম। ওর কোলে মাস্টার ব্লিক চুপচাপ বসে আছে। ঠ্যাং ঝুলছে।
.
অপরাধীর শাস্তি মৃত্যু
জীর্ণ বাড়িটা পাথরের। ভেতরে ঢুকে এক জায়গায় নেমে লোকটা জুতোর ডগা দিয়ে কীসের ওপর চাপ দিল। টুং করে শব্দ হল কোথাও। তারপর দেখলুম, ঘরটা আলো হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সামনে একটা রেলিংঘেরা চৌকোনা ইঁদারার মতো গর্ত রয়েছে। একটু পরে সেই গর্ত থেকে উঠে এল লিফট। লিফটের দরজা খুলে লোকটা বলল- আসুন।
লিফটে চেপে আমরা এবার যেখানে নামলুম, সেটা একটা সাজানো গোছানো সুন্দর হলঘর। উজ্জ্বল আলোয় ভরা। একদিকে বসার চেয়ার টেবিল, শোবার খাট, বইয়ের র্যাক অনেকগুলো। অন্যদিকটায় বিচিত্র সব যন্ত্রপাতি, টিভি পর্দাসমন্বিত কম্পিউটার কয়েকটা, তার ওপাশে ল্যাবরেটরি। একটা লম্বা টেবিলের ওপর কাচের কফিন। কফিনের ভেতর একটা আস্ত মড়া। ভয়ে ভয়ে সেইদিকে তাকিয়ে আছি, লোকটা একটু হেসে বলল- ওটা মৃত মানুষ নয়। সম্পূর্ণ জীবিত। তবে অজ্ঞান অবস্থায় রাখা হয়েছে। আপনারা বসুন দয়া করে।
সে মাস্টার ব্লিককে দাঁড় করিয়ে আমাদের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল… যাও হে! কুটুম্বদের কাছে গিয়ে অপেক্ষা করো। আর শুনুন, আপনাদের সেবার কোনো ত্রুটি হবে না। কিন্তু সাবধান, আসন ছেড়ে নড়বেন না। তাহলে আপনাদের বিপদ হবে। আমি আমার স্পাইডারশিপের ব্যবস্থা করে এখনই ফিরে আসছি।
স্পাইডারশিপ! মাকড়সাযান। ঠিক তাই বটে। গাড়িটার চাকা নেই। ঠ্যাং বাড়িয়ে ঠিক মাকড়সার মতো দৌড়ে যায় এবং জলের ওপর জলমাকড়সার মতোই বিদ্যুৎগতিতে ছুটে যেতে পারে। আবার আকাশেও রকেটের মতো অবিশ্বাস্য গতিতে উড়ে চলে। খেলোয়াড়দের ডিসকাস থ্রোয়িংয়ের মতো ব্যাপারটা।
কর্নেল গম্ভীর মুখে চারদিক লক্ষ্য করছিলেন। মাস্টার ব্লিক তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। একবারও আর ব্লিক করছে না। কোথায় যেন খুবই চাপা শোঁ শোঁ শব্দ, মাঝে মাঝে ব্লিক ব্লিক, কখনও খুটখাট যান্ত্রিক শব্দ। বুঝতে পারছিলুম এক আধুনিক বিজ্ঞানীর গোপন আখড়ায় এসে পড়েছি।
ব্লিক…ঠুং … খুটখুট শব্দ। তারপর দেখি ওপাশের দরজা খুলে গেল এবং একটা আস্ত খুদে রোবট গদাইলস্করি চালে হেঁটে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। তার বুকে ছোট্ট টিভি পর্দায় নীল-লাল রেখা কঁপতে কাঁপতে ফুটে উঠল : পেটের নীল বোম ছুঁলে কফি, লাল বোম ছুঁলে চায়ের লিকার। চিনি এবং দুধের প্যাকেট আমার বাঁ পকেটে।
বলা বাহুল্য, সবই ইংরেজিতে লেখা। কর্নেল নীল বোতাম ছুঁতেই তার তলপেটের নীচে একটা ট্রে বেরিয়ে এল। তাতে একটা পেপার কাপ ভর্তি কফির লিকার। কর্নেল আবার বোম ছুঁলেন। আরেক কাপ কপি ট্রেতে পড়ল ঠাস করে। তারপর রোবটের পকেট থেকে দুটো ছোট্ট দুধ আর দুটো চিনির কিউব ভরা প্যাকেটে তুলে নিলেন। একটু হেসে বললেন মাস্টার ব্লিক, তোমার খাদ্য আমার পকেটে আছে। দিচ্ছি।
রোবটের বুকের পর্দায় ফুটে উঠল লাল হরফে : শাস্তিস্বরূপ পাখিটাকে কিছু খেতে দেওয়া হবে না।
রোবটটা চলে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল বললেন-মাস্টার ব্লিক, আমি নাচার ডার্লিং!
মাস্টার ব্লিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল বিরসবদনে। একটু পরে সেই লোকটাই ফিরে এসে। টেবিলের সামনের আসনে বসল। তারপর কালো চশমা খুলে একটু হেসে বলল- আশাকরি কোনো অসুবিধে হয়নি?
কর্নেল বললেন না। কিন্তু আমাদের জানতে ইচ্ছে করছে মাননীয় গৃহকর্তার পরিচয় কী?
– আমি একজন বিজ্ঞানী। নিশ্চয় তাই। কিন্তু তার বাইরেও আপনার একটা পরিচয় আছে।
– তার আগে কি আপনার জানতে ইচ্ছে করছে না কেন আপনাদের নিয়ে এলুম?
-করছে। কিন্তু প্রথমে জানতে ইচ্ছে করছে আমরা কোথায় আছি?
-কচ্ছের রান জলাভূমির এক দুর্গম দ্বীপে। লোকটা একটু হাসল আবার।
-আপনাদের নিয়ে আসার কারণ, আপনারা একটা ডিম চুরি করেছিলেন।
কর্নেল আপত্তি করলেন- চুরি কেন? ডিমটা আমরা কুড়িয়ে পেয়েছিলুম সিহৌরা কেল্লার কাছে।
–কিন্তু একথা নিশ্চয় জানেন, না বলে অন্যের জিনিস নিলে সেটাই চুরি?
–আসলে আমরা ওটা কোনো প্রাকৃতিক বস্তু ভেবেছিলাম!
