– বলেন কী! কী করে বুঝলেন?
তথ্য থেকে ডিডাকশান করে। কর্নেল চুরুট ধরালেন। –কাল সন্ধ্যার মুখে উড়ুক্কু গাড়িটাকে এখানে গ্রামের মেয়েরা দেখেছিল। কিন্তু তার আগে কোনো ঝড় হয়নি।
মাস্টার ব্লিক নড়বড় করে হেঁটে প্রাকারের ধারে গেল। তারপর বারবার ব্লিক ক্লিক করে করে ডাকতে থাকল! কর্নেল এগিয়ে বললেন- কী হয়েছে মাস্টার ব্লিক?
বলে তিনি চোখে বাইনোকুলার রেখে পূর্ব-উত্তর দিকের মরুভূমির বালিয়াড়ি দেখতে থাকেন। একটু পরে অস্ফুটস্বরে বললেন কাকে যেন দেখলুম বালিয়াড়ির আড়ালে।
বালিয়াড়ির মাথায় এখনও ধূসর কুয়াশা আলোয়ানের মতো জড়ানো রয়েছে। আমি কিছু দেখতে পেলাম না। ওদিকটা দিগন্ত অব্দি ধূসর হয়ে আছে মাইলের পর মাইল বালির সমুদ্র। থর মরুভূমির দক্ষিণ অংশটা বেঁকে পুবে ঘুরে আবার দক্ষিণে পঞ্চশ মাইল চওড়া একটা ফালির মতো এগিয়ে কচ্ছ প্রদেশের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। মানচিত্রেই দেখেছি এটা। ক্রমশ নাকি আরও ছড়িয়ে যাচ্ছে মরুভূমি। প্রতিরোধের জন্য সরকার অজস্র প্রকল্প করেছেন। কচ্ছের অন্তর্গত রানের জলাভূমি এলাকা থেকে এই সিহৌরা পর্যন্ত কোনো জনপদ নেই। কাজেই ওদিকে কোনো মানুষ বাস করে না। গাছপালা দুরের কথা একটা ঘাস পর্যন্ত গজায় না।
শুধু লুনি নদীর দুধারে কিছু সবুজের চিহ্ন। ক্ষয়টে রুক্ষু গাছ আর কাঁটাগুল্ম গজায়। নদীটা গিয়ে রান জলাভূমিতে পড়েছে।
কর্নেল অনেকক্ষণ লক্ষ্য করে বাইনোকুলার নামিয়ে বলললেন- নাঃ! চোখের ভুল। চলল, ক্যাম্পে ফেরা যাক। মাস্টার ব্লিকের শুশ্রূষা করা দরকার। কাল রাতের ঝড়ে বেচারা ঘায়েল হয়ে পড়েছে। ..
.
বন্দী অথবা অতিথি
মাস্টার ব্লিকের পুনরাবির্ভাবে শর্মাজি এত খচে গেলেন যে কিচেন ক্যাম্পে গিয়ে বসে রইলেন সারা বেলা। পৃথীজিৎ তার কাছ ঘেঁষতে সাহস পেলেন না। একটু দুর থেকে দেখে রায় দিলেন এও ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট। তবে এটুকু বলা যায়, পাচা এবং ইগলের দেহকোষ মিশ্রণে এই বিদঘুটে পাখিটির উদ্ভব ঘটেছে। বিশেষ সংখ্যক ক্রোমোজোম জোড় সাজিয়ে একটা ফর্মে আনা হয়েছিল মিশ্রিত কোষটিকে। তারপর সিলিকনের পাত দিয়ে ডিম তৈরি করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
সিহৌরাবাসীদের পুজোর ঘটায় আমাদের কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিল। মাস্টার ব্লিককে বাইরে একটা খুঁটি পুঁতে ঠ্যাংয়ে নাইনলের দড়ি বেঁধে রাখতে হয়েছে। গ্রামবাসীদের দাবিতে আর তাকে ক্যাম্পের ভেতর ঢোকানো যায়নি। নির্বিকার ভঙ্গিতে গরুড় মহারাজ পুজোর প্রসাদ খেয়ে চলেছেন। তারপর দুটো ভেড়াও বলি দেওয়া হল। আতঙ্কে দেখলুম, মাস্টার ক্লিক চঞ্চু এবং পায়ের সাহায্যে কঁচা মাংস শকুনের মত ভক্ষণ করছে। কর্নেল ওকে সেদ্ধ মাংস খাওয়াতেন। রাজকুমার অবাক হয়ে বলল- এরকম পেটুক কখনও দেখিনি। দুটো ভেড়া হজম করতে পারবে তো?
বিকেল নাগাদ পুজোর ধুমধাড়াক্কা শেষ হল। স্বস্তি পেয়ে ক্যাম্পে ঢুকে সবে একটু গড়াতে গেছি, বাইরে কর্নেলের চিৎকার শুনলুম- মাস্টার ব্লিক! মাস্টার ব্লিক!
বেরিয়ে গিয়ে দেখি, নাইলনের মজবুত রশি ছিঁড়ে মাস্টার ব্লিক দৌড়ে চলেছে। কর্নেলও দৌড়ুচ্ছেন পেছনে পেছনে। তারপর ডানা মেলল পাখিটা। নদীর ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল কেল্লার দিকে। দুটো ভেড়া খেয়ে ওর গায়ে জোর ফিরে এসেছে। বেড়ে গেছে সন্দেহ নেই।
কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে গেছেন। তারপর ঘুরে ইশারা করলেন আমাকে যেতে। কাছে গেলে বললেন- কেল্লায় থাকার মতলব ওর। এসো তো দেখি, আবার ধরে আনতে পারি নাকি।
কেল্লার কাছাকাছি গিয়ে সকালের মতো ওর রিক শুনতে পেলুম। চত্বরে পৌঁছে দেখলুম, ডানা খুঁটছে-একটা ঠ্যাং অন্য ঠ্যাংয়ের হাঁটুতে আঁকড়ানো। অবিকল বকের ভঙ্গিতে।
কর্নেল ডাকলেন- মাস্টার ব্লিক!
পাখিটা হঠাৎ হাঁটু ভাঁজ করে মুরগির মতো মাটিতে বসে পড়ল। তারপর চাপা হুইসিলের শব্দ শোনা গেল। কর্নেল চমকে উঠলেন-সর্বনাশ! আবার সেই ঝড় আসছে নাকি?
শনশন শব্দ হল। বিদ্যুৎগতিতে পূর্বদিক থেকে পাঁচিলের ওপর দিয়ে হলুদ রঙের বিশাল মাকড়সার মতো একটা জিনিস এসে চত্বরে আমাদের সামনেই নামল। মুহূর্তে বুঝলুম, এটা স্পেসশিপ- কর্নেলের বর্ণিত উড়ুক্কু গাড়ি। শিস ও শনশন শব্দ থেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে। তারপর ওপরের ঢাকনাটা নিঃশব্দে খুলে ভেতর থেকে উঠে দাঁড়াল আপাদমস্তক আঁটা কালো পোশাকপরা একটা মুর্তি। তার চোখে কালো চশমা।
সে একলাফে নেমে আমাদের সামনে এসে ইশারা করল উড়ুক্কু গাড়িটাতে চাপতে। তার হাতে একটা পিস্তলের মতো জিনিস। নলের মুখ দিয়ে রংবেরংয়ের ঝিলিক বেরুচ্ছে।
কর্নেল আস্তে বললেন-চলো জয়ন্ত! বাধা দিলে লেসার পিস্তল ছুঁড়তে পারে।
রহস্যময় আগন্তুক হলুদ গোলাকার গাড়ির ওপর একটা বোতাম টিপতেই একটা সিঁড়ি নেমে এল নিঃশব্দে। আমরা উঠে গিয়ে ওপরকার সুড়ঙ্গের মতো দরজা দিয়ে ভেতর ঢুকে গেলুম। ভেতরে চারজন বসার মতো বৃত্তাকারে সাজানো আসন রয়েছে। আমরা বসলে লোকটা মাস্টার ব্লিককে তুলে নিয়ে এল। তাকে মেঝেয় চেপে বসিয়ে দিল। তারপর চশমা খুলে আমাদের দিকে ঘুরে একটু হেসে বলল- আদেশ পালনের জন্য ধন্যবাদ। এবার কোমরে সিটবেলট বেঁধে নিন। কর্নেল কথা বলতে ঠোঁট ফাঁক করলেন। কিন্তু তখন লোকটা আবার চশমা পরে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। তারপর হিশ করে একটা শব্দ হল। তারপর শিস এবং শনশন আওয়াজ। পাশের ছোট্ট বৃত্তাকার জানালা দিয়ে দেখলুম আমরা আকাশে চলে এসেছি। অজ্ঞাত ভয়ে বুক কেঁপে উঠল এতক্ষণে।
