সিহৌরা থেকে কান্নাকাটি ও কোলাহলের শব্দ শোনা যাচ্ছিল অনেকক্ষণ থেকে। আলো নিয়ে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছিল গ্রামবাসীরা। আমাদের ক্যাম্পগুলো আবার সাজিয়ে নিতে নিতে ভোর চারটে বেজে গেল। উত্তর থেকে এখন প্রচণ্ড হিম মরুবাতাস এসে হাড় কাঁপিয়ে তুলছে।
.
মাস্টার ব্লিকের খোঁজ মিলল
ক্যাম্পের সব যন্ত্রপাতি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। রেডিয়ো ট্রান্সমিশন অচল। ব্যাপারটা বিস্ময়কর। সকালে ক্ষয়ক্ষতি লক্ষ্য করতে গিয়ে সবারই চোখে পড়েছে, প্রাকৃতিক পরিবেশ বা বস্তুর কোনো ক্ষতি হয়নি। শুধু মানুষের তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট যা কিছু, তাকেই বিশৃঙ্খল করে গেছে ওই অদ্ভুত ঝড়। সিহৌরা গ্রামের ঘরগুলো পাথরের। বিশেষ ক্ষতি হয়নি। কিন্তু গৃহপালিত পশুরা অক্ষত নেই। অনেক মারা পড়েছে। অনেক পশু জখম হয়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার, যে বুড়ি ধন সিং নামে একটা লোকের ছাগলের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল, শুধু সে বেচারি মারা পড়েছে ঘর ধসে। ঢাকঢোল শিঙা কাঁসি বাজিয়ে গ্রামবাসীরা গরুড় মহারাজের পুজো দিচ্ছিল শ্মশান থেকে ফিরে।
শর্মাজি খুব ভয় পেয়ে গেছেন। ভোরবেলা স্নান করে চলে গিয়েছিলেন সিহৌরা গ্রামে মন্দিরে প্রণাম করতে। তারপর গ্রামবাসীর দলে ভিড়ে গেছেন। পৃথ্রীজিৎ সিং অচল রেডিয়ো ট্রান্সমিশন নিয়ে বসে গেছেন। তাকে সাহায্য করছে রাজকুমার।
কর্নেল আমাকে ডেকে নিয়ে নদী পেরিয়ে কেল্লার দিকে চললেন। পথে যেতে যেতে বললেন-তিনটে ব্যাপার লক্ষ্য করার মতো। এক : ঝড়টা ছিল শুকনো বৃষ্টিহীন। অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। দুই : ঝড়ের সময় প্রথমে চাপা গরগর শব্দ, তারপর তীক্ষ্ণ হুইসিলের শব্দ। তিন :ঝড়ের পর কিছুক্ষণ নীলচে আভা। আমি ওই সময় চাঁদের দিকেও লক্ষ্য করছিলুম। চাঁদটা পর্যন্ত নীলচে দেখাচ্ছিল।
ওঁকে স্মরণ করিয়ে দিলুম, কাল সন্ধ্যায় কী একটা হলদে জিনিস দেখে উটগুলো ভয় পেয়েছিল। তাছাড়া গ্রামের মেয়েরা নাকি কেল্লার ওপর দানোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল-দানোটা দাঁড়িয়ে ছিল হলদে রঙের মাকড়সার পিঠে।
কর্নেল চিন্তিতভাবে বললেন-মাকড়সা! প্রথমদিন বিকেলে ওখানে মাটির ওপর সূক্ষ্ম লম্বাটে আঁচড় দেখেছি আতশকাচের সাহায্যে। রাজকুমার বলছিল এ এলাকায় সরু মাকড়সাগুলো প্রকাণ্ড হয়। আঁচড়গুলো যদি মাকড়সার পায়ের হয়, তাহলে বলব, মাকড়সাটা একটা মোটরগাড়ির মতো বড়ো। কিন্তু গোলাকার।
আমার মাথার ভেতর ঝিলিক দিল একটা কথা। বললুম-কর্নেল। জিনিসটা স্পেসশিপ নয় তো?
কর্নেল হাসলেন। –ডার্লিং! স্পেসশিপ বলতে কি তুমি অন্য কোনো গ্যালাক্সির প্রাণীদের দিকে ইঙ্গিত করছ?
– কেন? অসম্ভব কীসে?
– অন্য গ্যালাক্সির চেয়ে আমাদের গ্যালাক্সিতেই এমন অসংখ্য রহস্য আছে জয়ন্ত, যা আমাদের চক্ষু ছানাবড়া করার পক্ষে যথেষ্ট। তাছাড়া এখনও এই গ্যালাক্সি ছাড়া অন্যত্র প্রাণ আছে কিনা আমরা জানি না। বৃথা কল্পনায় লাভ নেই। তার চেয়ে
হঠাৎ থেমে উনি বাইনোকুলারে কী দেখতে থাকলেন কেল্লার দিকে। তারপর হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন। জিজ্ঞেস করেও কোনো জবাব পেলুম না। কেল্লার কাছাকাছি পৌঁছে কানে এল ব্লিক ব্লিক শব্দ। চমকে উঠলুম। কর্নেল এখন দৌড়ুতে শুরু করেছেন। বুড়োর নাগাল পেতে আমার মতো জোয়ানের হাঁফ ধরে যাচ্ছিল।
কেল্লায় উঠে চত্বরে ঢুকেই দেখি, মাস্টার ব্লিক কাত হয়ে পড়ে আছে। কর্নেলকে দেখে সে ডানাদুটো নেড়ে কাতরভাবে ব্লিক ব্লিক করতে থাকল। কর্নেল তাকে দুহাতে তুলে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন। মাস্টার ব্লিক অনেক কষ্টে দাঁড়াল। তারপর কর্নেলের বুকে মাথা গুঁজে দিয়ে প্রকাণ্ড চঞ্চু ফাঁক করল। কর্নেল পকেটে হাত ভরে একগাদা বিস্কুট বের করে ওকে খাওয়াতে থাকলেন। বললেন- ঠিক এমন কিছু অনুমান করেই বিস্কুটগুলো এনেছিলুম। জয়ন্ত আমার কোটের পকেটে জেলির টিন এনেছি। বের করে দাও।
তা করতে গেলে হতচ্ছাড়া ব্লিক চোখ ট্যারা করে তাকাল আমার দিকে। কিন্তু ওর চঞ্চুর ভেতর বিস্কুট। তাই ঠোক্কর মারবার চেষ্টা করল না। রাগ করে বললুম আমাকে কেন দেখতে পারে না বলুন তো? অথচ ও যখন ডিমের ভেতর ছিল, তখন আমিই ওকে এতটা পথ বয়ে নিয়ে গেছি। নেমকহারাম কোথাকার!
কর্নেল একটু হেসে বললেন- ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় জন্ম হলেও মাস্টার ব্লিকের মধ্যে স্বাভাবিক জৈব সহজাত বোধ রয়েছে। মানবেতর জীবরা সেই বোধের সাহায্যে ঠিকই টের পায়, কে তাদের পছন্দ বা অপছন্দ করছে। তুমি নিশ্চয় ওকে অপছন্দ করো, ডার্লিং!
– ঠিক অপছন্দ নয়। কেমন যেন গা ঘিনঘিন করে ওর গায়ের গন্ধে।
– মাস্টার ব্লিক কাল রাতের ঝড়ে আহত হয়েছে। ওকে একটু আদর করো। দেখবে আর তোমাকে ঠোক্কর মারতে চাইবে না! নাও, জেলিটা খাইয়ে দাও ওকে।
ভয়ে ভয়ে কৌটো থেকে খানিকটা জেলি নিয়ে ওর চঞ্চুর ভেতর গুঁজে দিলুম। ডানায় ও লাল টুকটুকে চ্যাপটা মাথায় হাত বুলিয়েও দিলুম, কর্নেল ওকে আমার হাতে ছেড়ে দিয়ে চত্বরে কী সব তদন্ত শুরু করলেন। কয়েক গ্রাস খেয়ে মাস্টার ব্লিক হঠাৎ এঁটো চঞ্চুটা আমার সোয়েটারে ঘষতে থাকল। জেলিতে মাখামাখি হয়ে গেল। ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বললুম- তবে রে রামগরুড়ের ছানা!
মাস্টার ব্লিক ব্লিক ক্লিক করে যেন হাসল। নড়বড়ে ঠ্যাংয়ে এবার টাল সামলে খাড়া হতে পারল সে। কর্নেল বললেন- জয়ন্ত, তোমার অনুমান আংশিক সত্যি হতেও পারে। যে হলদে রঙের মাকড়সার কথা আমরা শুনেছি এবং তুমি যাকে স্পেসশিপ বলেছ, সেটা সত্যিই স্পেসশিপ। এখানেই ওটা নেমেছিল। তবে অন্য গ্যালাক্সির নয়, এ আমি হলফ করে বলতে পারি যে সেই উড়ুক্কু গাড়িটি গত রাতে ইচ্ছে করেই আমাদের ক্যাম্পের ওপর ঝড়সৃষ্টি করে গেছে। সব রহস্য ওতেই কেন্দ্রীভূত।
