কেল্লায় গিয়ে টর্চের আলোয় তন্নতন্ন খুঁজে কোনো জনপ্রাণীটি দেখা গেল না। এত্তা বড়া মাকড়সা কিংবা কোনো হলদে রঙের জিনিসও না। তবে কর্নেল টর্চের আলো কেল্লার চত্বরে ফেলে একখানে হাঁটু দুমড়ে বসলেন। তারপর সেদিনকার মতো পরীক্ষা করে বললেন- কয়েকটা লম্বা আঁচড়ের দাগ। কীসের দাগ?
কেল্লা থেকে নেমে সেই স্তম্ভটা পর্যন্ত আমরা গেলুম। সেইসময় আমি যেন কোথাও ব্লিক শুনলুম একবার। হয়তো কানের ভুল। তাই কথাটা বললাম না কর্নেলকে।
অনেকক্ষণ আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করে আমরা ক্যাম্পে ফিরে চললুম। …
.
মধ্যরাতের প্রলয়কাণ্ড
ক্যাম্পে এ রাতে জরুরি কনফারেন্স। গরুড় মহারাজ ওরফে মাস্টার ব্লিকের সেই প্রজনন কথা অর্থাৎ ডিমের ভাঙা খোলস পরীক্ষা করে পৃথ্বীজিৎ সিং সিলিকনই সাব্যস্ত করেছেন। তার মতে, ওই কিম্ভুত বৃহৎ পক্ষীটিও ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট। সিলিকন ধাতু কম্পিউটার বা রোবোটের প্রধান উপাদান। জাপানে এ ধাতুর সাহায্যে অসম্ভব-অসম্ভব কাজ চালানোর উপযোগী যন্ত্র তৈরি সম্ভব হয়েছে। বর্তমান যুগকে সিলিকন ধাতুর যুগই বলা হয়।
ড. সিংয়ের বক্তব্য শুনে কর্নেল বললেন- ইতিমধ্যে যদি ডিমগুলো ফুটে গরুড় পক্ষীর ছানা বেরিয়ে থাকে তো কেলেঙ্কারি!
রাজকুমার মুচকি হেসে বলল, খুড়োমশাইকে তাহলে বারমের থেকে পালিয়ে মাথা বাঁচাতে হবে।
শর্মাজি চটে গেলেন–বেশি বোকো না। তোমারও একই অবস্থা হবে। বলে আমার দিকে কটাক্ষ করলেন। –এই সাংবাদিক ভদ্রলোককেও হতচ্ছাড়া পাখিটা পছন্দ করে না দেখেছি।
কর্নেল এসব কথা থামিয়ে দিয়ে বললেন-এবার বলুন ড. সিং, আপাতত ওই পঙ্গপালের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। শিগগির একটা কিছু না করলে তো মার্চ-এপ্রিলে উত্তর-পশ্চিম ভারতে কোথাও চাষিরা ফসল ঘরে তুলতে পারবে না। সব খেয়ে শেষ করে ফেলবে এই শক্তিশালী পঙ্গপাল।
পৃথীজিৎ একটু ভেবে বললেন প্রতিরক্ষা দফতরে কেমিক্যাল রিসার্চ সেন্টার থেকে সদ্য আবিষ্কৃত মারাত্মক রাসায়নিক পদার্থ RRO-27 পরীক্ষার এমন সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। প্রয়োগ করে দেখা যাক না কী হয়। তবে
উনি গম্ভীরভাবে চুপ করলে কর্নেল বললেন- তবে!
– ফাটলগুলোর সঙ্গে যদি নদীর যোগাযোগ থাকে, জল বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে। হা এখন তত জল নেই নদীতে। কিন্তু আগামী বর্ষায় জলস্রোত এসে ফাটলে ঢুকবে।
শর্মাজি উত্তেজিতভাবে বললেন পরের কথা পরে। আগে পঙ্গপাল নিধন। …
চিন্তাভাবনার মধ্যে কনফারেন্স শেষ হল রাত বারোটা নাগাদ। তারপর আমরা শুয়ে পড়লুম ক্যাম্পখাটে। সবে একটু তন্দ্ৰামতো এসেছে, বাইরে শনশন শব্দে ঘোর কেটে গেল। শব্দটা ঝড়ের বলে মনে হচ্ছিল। ডাকলুম কর্নেল! কর্নেল!
কর্নেলের নাক ডাকছিল। বন্ধ হয়ে গেল। বললেন-কী হয়েছে?
– ঝড় আসছে।
হুঁ, শীতের সময় আরবসাগর থেকে কচ্ছপ্রদেশ পেরিয়ে একটু আধটু ঝড়বৃষ্টি এ তল্লাটে এসে থাকে শুনেছি। তোমার চিন্তার কারণ নেই। ক্যাম্পের খুঁটি যথেষ্ট মজবুত।
প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল এবং চাপা গুরুগুরু গর্জন শোনা গেল। গর্জনটা একটানা। সমুদ্রের ধারে দাঁড়ালে যে বহুদূরপ্রসারী চাপা গরগর আওয়াজ শোনা যায়, ঠিক তাই। তারপরই ঝড়টা এসে ক্যাম্পের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
তারপর কী একটা ঘটল যেন! তীব্র নীল বিদ্যুতের ঝলকানি, কান ফাটানো বজ্রগর্জন- পরক্ষণ দেখি খোলা আকাশের তলায় বসে আছি। ক্যাস্পখাটটা আমাকে তুলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। -কর্নেল! কর্নেল! বলে চেঁচিয়ে উঠলাম। তারপর ঝড়ের ধাক্কায় উবুড় হয়ে পড়ে গেলাম। টের পেলুম, ক্যাম্পখাট এবং তাঁবুর ভেতরকার সব জিনিসপত্র উড়ে বেরিয়ে গেল। মাটিতে মুখ খুঁজে পড়ে রইলুম। ওপরে প্রলয়কাণ্ড চলতে থাকল। সেই ব্যাপক গরগর চাপা গর্জন এখন আমার চারদিকে।
কিন্তু এই ভয়ংকর প্রলয়ের মধ্যে তীক্ষ্ণ একটা শিসের শব্দ যেমন শিসের শব্দ পঙ্গপালের ব্রিডিং গ্রাউন্ডে ফাটলের ভেতর শুনেছি, তার লক্ষগুণ বেশি জোরালো শব্দটা কানের ভেতর দিয়ে সুচের মতো মস্তিষ্কে ঢুকে যাচ্ছিল। অসহ্য লাগাতে দুকানের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে পড়ে রইলুম।
পরে শুনলুম, এই সর্বনাশা ঝড়ের স্থিতিকাল ছিল মাত্র তিন মিনিট।
ঝড় থামলে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে ডাকলুম- কর্নেল! আপনি কোথায়?
কর্নেলের সাড়া পেলুম আমার পাশ থেকে। -আছি, জয়ন্ত! এবার উঠে পড়ো! ঝড় থেমে গেছে।
এবার একটা অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়ল। চারদিকে কেমন একটা নীলচে রঙের আলো। অথচ আকাশ পরিষ্কার। কৃষ্ণপক্ষের এক টুকরো চাঁদ লুনি নদীর ওপর দক্ষিণপূর্ব আকাশে ঝুলে আছে। আবহাওয়া শীতের বলে মনে হচ্ছে না- যেন গ্রীষ্মরাতের। ফলে গরম সোয়েটারের ভেতর দরদর করে ঘামছি।
মিনিট খানেকের মধ্যে নীলচে আভাটা মিলিয়ে গেল। তাপটাও কমতে কমতে আবার মরুভূমির শীতে এসে হাজির হল। কর্নেল টর্চ জ্বেলে শর্মাজিদের খুঁজছিলেন। দেখলুম, একে একে ওঁরা হামাগুড়ি দিতে দিতে দুপায়ে সোজা হচ্ছেন এতক্ষণে। ওদিকে উটওয়ালাদেরও কথাবার্তা শোনা গেল। লণ্ঠন জ্বলতে দেখলুম।
জেনারেটরটা নষ্ট হয়ে গেছে কোনো অজ্ঞাত কারণে। কিছুতেই আর সেটা চালু করা গেল না। পেট্রম্যাক্স বাতি জ্বালা হল। তারপর পেছনের পাথরের স্তূপে আটকে থাকা তাঁবু, ক্যাম্পখাট এবং জিনিসপত্র সবাই মিলে বয়ে আনলুম।
