প্রথমে খুন করল এক নিরীহ বুড়িকে। ঠিক বাঘে ধরার মতো চিহ্ন রাখল। ছুরি দিয়ে এমনভাবে খুনটা করল যে বাঘের নখ ও দাঁতের দাগ বলে সবার মনে হবে। মড়ি টেনে নিয়ে যাওয়ার চিহ্নও রাখল। দ্বিতীয়বার খুন করল একই ভঙ্গিতে। তারপর তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য মোড়লকে খুন করতে আর অসুবিধে হল না। কারণ ততদিনে মানুষখেকো বাঘের খবর রটে গেছে। শিকারিরা এসেছে। মাচানে বসেছে। আবহাওয়া তৈরি হয়ে গেছে। অতবে মোড়লকে মারতে আর অসুবিধা নেই।
কিন্তু কর্নেলের চোখ তীক্ষ। প্রথমেই তিনি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে অবাক হলেন। কোনও মড়ির আশেপাশে বাঘের পায়ের দাগ নেই কেন? মোড়লের মড়িটা তিনি হাতেনাতে দেখলেন—অন্যদুটো দেখার সুযোগ পাননি। মড়ি পরীক্ষা করেই ওঁর সন্দেহ বেড়ে গেল। মাথার খুলি দুফাঁক হয়েছে। এটা বাঘের থাবায় হতে পারে। চুলে রক্ত নেই। তার মানে মড়ার ওপর ছুরি চালানো হয়েছে। আর জামা বা ধুতি যেভাবে ঝোপে আটকানো আছে, বাঘ টেনে নিয়ে গেলে অমনভাবে থাকতেই পারে না। সবচেয়ে অদ্ভুত কাণ্ড, মোড়লের লাশের নিচে মাটিতে একটা ফাটল আছে—ফাটলের মধ্যে একটা মোটা হাতুড়ির মাথা কর্নেলের চোখে পড়েছিল। হাতল থেকে খুলে গিয়েছিল মাথাটা। সম্ভবত খুনির হাতে হাতুড়িটা ছিল। ওই অবস্থায় টেনে এনেছিল মড়িটা—তারপর কীভাবে খুলে ওখানে ঢুকে যায়। বাঘের মড়ি বলে লাশ কেউ ঘাঁটাঘাঁটি করেনি। তাই চোখে পড়েনি। কিন্তু কর্নেল তা দেখেছিলেন। তারপর কৌশলে গাঁয়ে রটিয়ে দিয়েছিলেন যে গাঁয়ের কারও একটা হাতুড়ির মাথা হারিয়ে গেছে কি না। এর ফলে খুনি সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে এবং ফাঁদে পা দেয়। সে এসেছিল হাতুড়ির মাথাটা নিয়ে যেতে।…
১.০৫ অরুণাচলের ইয়েতি
কর্নেলের মাথায় কখন কোন মতলব গজিয়ে ওঠে, আগে থেকে তার আঁচ পাওয়া ভারি কঠিন। এক উৎকট গ্রীষ্মের সকালে তাই যখন তার তলব পেলুম, আজই দুপুরের ফ্লাইটে গৌহাটি রওনা হতে হবে এবং আমি যেন তৈরি হয়েই বেরোই—একটুও অবাক হইনি।
এই বুড়ো দাড়িওলা টেকো লোকটিকে প্রশ্ন করলে সব সময় জবাব মেলে না। তাই গৌহাটি পৌঁছনো অব্দি কোনও প্রশ্ন করিনি। দেখেছি, প্লেনে ওঁর হাতে একটা মোটা ইংরেজি কেতাব এবং তার পাতায় বুঁদ হয়ে আছেন। বইটার নাম : দি প্রি-হিসটোরিক অ্যানিম্যালস অফ ইন্ডিয়া।
গৌহাটিতে আমরা একটা প্রাইভেট লজে উঠলুম। বুড়ো আগে থেকেই দেখলুম ব্যবস্থা করে রেখেছেন। লজের মালিক হংসধ্বজ সান্যাল। পঞ্চাশের এদিকেই বয়স। শক্তসমর্থ গড়নের মানুষ। একটু গম্ভীর চালচলন। পোড়খাওয়া চামড়া গায়ে। তিনটে চা বাগিচার মালিক নাকি উনি। বিমানঘাঁটি থেকে আমাদের গাড়ি করে নিয়ে গেছেন।
কর্নেল চমৎকার সাজানো বসার ঘরে একটা ইজিচেয়ারে হাত-পা ছড়িয়ে বসে অস্ফুট একটা আরামের আওয়াজ তুললেন—আঃ! তারপর বললেন—মিঃ সান্যাল, আপনার পার্টনার ভদ্রলোক কি এখনও আসেননি?
হংসধ্বজ বললেন-আগরওয়াল? এসে পড়বে নেক্সট ফ্লাইটে। তারপর আশেপাশের অবস্থা দেখে নিয়ে একটু হেসে আবার বললেন—সন্ধ্যা ছটায় ল্যান্ড করবে। ঝড়জলের সম্ভাবনা দেখছি না আজ। আগরওয়ালের পয় আছে।
ঘড়িতে তখন বিকেল তিনটে। আমরা লাঞ্চ সেরেই কলকাতা থেকে বেরিয়েছি। তবু সান্যাল সায়েব ব্যস্ত হয়ে উঠলেন অতিথি সৎকারে। সেই ফাঁকে কর্নেলকে এতক্ষণে প্রশ্ন করে ফেললুম-হ্যালো ওল্ড বস! ব্যাপারটা কী?
কর্নেল চোখ বুজে কী যেন ভাবছিলেন। চোখ খুলে বললেন—তুমি কি কিছু বলছ ডার্লিং?
খচে গিয়ে বললুম-না।
কর্নেল হেসে উঠলেন। তারপর আমার চোখের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন- জয়ন্ত তুমি তো খবরের কাগজের লোক। একজন ক্রাইম রিপোর্টার। দৈনিক সত্যসেবক তোমাকে…
বাধা দিয়ে বললুম—আমাকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা মাইনে দিয়ে পুষছে। তাতে আপনার কী? আপনিও তো মিলিটারি সার্ভিসে কম পেতেন না!
কর্নেল একইভাবে তাকিয়ে বললেন—জয়ন্ত, ইয়েতি কাকে বলে জানো নিশ্চয়? হিমালয় পর্বতমালার এই রহস্যময় প্রাগৈতিহাসিক দানবের খবর মাঝে মাঝে তোমাদের কাগজেও বেরিয়েছে। সম্প্রতিও বেরিয়েছে। আশা করি তা লক্ষ্য করেছ। জয়ন্ত, রিপোর্টার হিসেবে এবার একটা দারুণ রকমের সুযোগ তুমি পেয়ে যাচ্ছ। ইয়েতির ওপর একটা অনবদ্য কভারেজ দৈনিক সত্যসেবকে এক্সক্লসিভলি বেরোলে কী ব্যাপার ঘটবে, টের পাচ্ছ কি? তোমার মাইনে তো বাড়বেই—উপরন্তু ম্যাগসেস পুরস্কার প্রাপ্তিও ঘটতে পারে। সুতরাং বৎস, দয়া করে মাথাটা ঠাণ্ডা করো।
আমি থ ততক্ষণে। হাঁ করে তাকিয়ে থাকলুম বুড়োর দিকে।
কর্নেল বললেন-সম্প্রতি এই পূর্বাঞ্চলে অরুণাচল প্রদেশের চৌখাম আদিবাসীরা দুটো অদ্ভুত প্রাণীকে পাকড়াও করেছে। এই জঙ্গল লোহিত জেলার পাহাড়ি এলাকার খামতি উপত্যকায় রয়েছে।
এবার মুখ খুললুম।-হ্যাঁ। আমরা বক্স করে সে খবর ছেপেছি। দশ ফুট উঁচু দুটো জানোয়ার-দেখতে অবিকল নাকি মানুষের মতো। একটা পুরুষ অন্যটা স্ত্রী। বিশেষজ্ঞরা তাদের পরীক্ষা করে দেখছেন। কেউ বলছেন, এক জাতের গেরিলা—কেউ বলছেন, একরকম ভালুক। কারও মতে এরাই হচ্ছে সেই ইয়েতি বা তুষার দানব। কোনও কারণে তুষার এলাকা থেকে চলে এসেছিল।…
—দ্যাটস রাইট, জয়ন্ত। বলে কর্নেল তাঁর পকেট থেকে একটা কাগজের কাটিং বের করলেন। পড়তে থাকলেন সেটা।….. ১৯৫৭ সালে জুগন হিমল থেকে টম স্লিক এভারেস্টের পূর্বে তিনশো মাইল এলাকা ইয়েতির খোঁজে তোলপাড় করেন। ককেশাস অঞ্চলে ১৯৪৬ সালে এক রুশ অভিযাত্রীদল ইয়েতির খোঁজে বেরিয়ে একটা একশো বছরের পুরনো বিশাল কঙ্কাল আবিষ্কার করেন। রুশ বিশেষজ্ঞদের মতে ককেশাসে এখনও ইয়েতি আছে। ১৯৬৯ সালের জুনে থাই-বর্মা-লাওস সীমান্তে মেকং নদীর ধারে দুটো অতিকায় মনুষ্যাকৃতি প্রাণী দেখা গিয়েছিল। দর্শক ছিল অনেক। প্রাণীরা তাদের দিকে পাথর ছুড়েছিল। রেঙ্গুনের এক দৈনিক পত্রিকায় খবরটি বেরোয়।
