শর্মাজি পরীক্ষা করে বললেন-তাই তো দেখছি, কর্নেল। এই ঠ্যাংটা দেখুন। ভাঙা যাচ্ছে না। ইস্পাতের তারের মতো। দেখুন কেমন বেঁকে রইল। অথচ ভাঙল না। আরে! এটা দেখছি ইলেকট্রিক শক দিচ্ছে।
কর্নেল বললেন- এখনই বারমেরে রেডিয়ো মেসেজ পাঠান ড. শর্মা। কোনো বিশেষজ্ঞকে আসতে বলুন। এমন কাউকে পাঠাতে বলুন, যিনি একাধারে পদার্থবিদ, ধাতুবিজ্ঞানী এবং বিশেষ করে অ্যাস্ট্রোফিজিক্সেও যার জ্ঞানগম্যি আছে।
রাজকুমার বলল- অ্যাস্ট্রোফিজিক্স কেন কর্নেল?
কর্নেল চিন্তিত মুখে বললেন-ডার্লিং! তুমি তো একজন বিজ্ঞানী। তুমি তো জানোই যে আমাদের এ ছোট্ট মরজগতের সবকিছুই মহাকাশ এবং সমগ্র গ্যালাক্সির সঙ্গে সম্পর্কিত। আলাদাভাবে বিচ্ছিন্ন করে কোনো জিনিস সম্পর্কে আমরা সিদ্ধান্ত নিলে ভুল করব। পৃথিবীতে যে প্রাণ নিয়ে আমদের অস্তিত্ব, তারও মৌলিক উপাদান মহাকাশ থেকে মহাজাগতিক ধূলিকণার সঙ্গে একদা ভেসে এসেছিল–এমন কথাও বলছেন আধুনিক অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্টরা। এ যুগে আমরা আর শুধু পৃথিবীর সন্তান নই। মহাজাগতিক এক বিশাল সংসারের অন্তর্ভুক্ত। …
.
মাস্টার ব্লিকের অন্তর্ধান
বিকেলের মধ্যেই হেলিকপ্টারে চেপে এলেন বিশেষজ্ঞমশাই। দেখলুম, কর্নেলের পূর্বপরিচিত তিনি। নাম পৃথীজিৎ সিং। পাঞ্জাবের শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ। বারমেরে প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাজে এসেছিলেন। খবর পেয়ে নিজেই উৎসাহী হয়ে চলে এসেছেন। হেলিকপ্টারটা তাকে রেখে চলে গেল। সঙ্গে অনেক যন্ত্রপাতি এনেছেন ড. সিং। ঘন্টাখানেক ফড়িংটাকে পরীক্ষা করে বললেন আপনারা এটাকে রোবট ভেবেছিলেন। তা নয়। ঝাঁকে ঝাকে এমন রোবট তৈরি করতে হলে ধনী দেশকেও ফতুর হতে হবে তিনদিনে। আসলে এটা ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় তৈরি।
শর্মাজি বললেন- কী কাণ্ড! আমার মাথায় কথাটা একবার এসেছিল বটে!
-হ্যাঁ। ক্লোনিং আণবিক জীববিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত জেনেটিক্স বা প্রজনন বিদ্যার একটি আধুনিক তত্ত্বমূলক প্রক্রিয়া। ড. সিং একটু হাসলেন। ড. শর্মা তো এসব জানেন। কর্নেলের কাছেও বিষয়টা আশাকরি অপরিচিত নয়। মনে আছে? দিল্লিতে গত বছর আপনি আমার সঙ্গে
কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন- আচ্ছা ড. সিং, ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় তো একটিমাত্র জৈব কোষকে কৃত্রিম উপায়ে বিকাশ ঘটিয়ে প্রয়োজন সংখ্যক ক্রোমোজোমের জোড়াকে সাজিয়ে একটা ফর্মে আনা যায়।
– হ্যাঁ। তবে ব্যাপারটা তত্ত্বের আকারেই ছিল। অথচ এক্ষেত্রে দেখছি কোনো কুশলী মস্তিষ্ক সেই তত্ত্বকে বাস্তবে সফল করেছেন। কে এই প্রতিভাধর বিজ্ঞানী?
শর্মাজি বললেন নিশ্চয় কোনো শত্রুদেশের বিজ্ঞানী তিনি। ভারতের শস্যক্ষেত্রে পঙ্গপাল নামিয়ে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির চক্রান্ত এটা। তিনি বিজ্ঞানী হলেও তাকে বলব ঘৃণ্য অমানুষ। তার ফাঁসি হওয়া উচিত।
ড. সিং বললেন- তা তো উচিতই। কিন্তু তার প্রতিভা অস্বীকার করা যায় না। সিস্টেসার্কা গ্রেগরিয়া প্রজাতির ফড়িংয়ের একটিমাত্র দেহকোষ থেকে তিনি ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় একটি ফড়িং সৃষ্টি করতে পেরেছেন। এই ফড়িংটি অতিপ্রজননশীল। তার বংশধররাও তাই অতিপ্রজননশীল হয়েছে। আমার ভাবতে আতঙ্ক হয়, এভাবে হিটলারের একটিমাত্র দেহকোষ থেকে কত অসংখ্য হিটলার তৈরি করতে পারতেন যদি এই বিজ্ঞানী সে সময় জার্মানিতে আবির্ভূত হতেন।
কর্নেল বললেন এবার তাহলে আমাদের মাস্টার ব্লিককে নিয়ে আসি। তাকেও ক্লোনিং প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে কি না দেখা যাক।
শীতের বিকেল দ্রুত পড়ে এসেছে। সন্ধ্যার ধূসরতা ঘনিয়েছে চারদিকে। আমরা শর্মাজির তাঁবুর সামনে বসে কথা শুনছিলুম। মাস্টার ব্লিক কর্নেলের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। একটু পরে তাকে আমাদের তাঁবুর দিকে যেতে দেখেছি।
কর্নেল তাঁবুর সামনে গিয়ে ডাকলেন- মাস্টার ব্লিক! এসো ডার্লিং।
কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে ভেতরে গেলেন। তারপর ব্যস্তভাবে বেরিয়ে এদিকে-ওদিকে ঘুরে ডাকতে থাকলেন। কোনো সাড়া নেই ছোকরার। কর্নেল উদ্বিগ্ন মুখে বললেন-এই তত ছিল। গেল কোথায় সে? তারপর বাইনোকুলারে চোখে রেখে চারদিকে তন্নতন্ন খুঁজলেন।
এইসময় সিহৌরার একদল মেয়ে নদীর থেকে আসছিল। তারা খুব উত্তেজিতভাবে আসছিল। কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন- তোমরা কি গরুড় মহারাজকে দেখেছ?
তারা একসঙ্গে হইচই করে উঠল। একজন সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল- গরুড় মহারাজকে এইমাত্র আমরা নদীর ওপর দিয়ে উড়ে কেল্লার দিকে যেতে দেখলুম হুজুর! তবে তার চেয়ে সাংঘাতিক ব্যাপার দেখে আমরা পালিয়ে আসছি। জল ভরতে পারিনি। খালি গাগরি নিয়ে পালিয়ে অসছি হুজুর!
–কী ব্যাপার দেখেছ তোমরা!
-কেল্লার মধ্যে দানো থাকে, তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলুম আমরা। হলদে রঙের একটা এত্তা বড়া মাকড়ার পিঠে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছিল, হুজুর!
কর্নেল বললেন, ব্যাপারটা দেখতে হয়। জয়ন্ত, যাবে নাকি?
আমি এগিয়ে গেলুম। রাজকুমার ও পৃথীজিৎ সিংও ব্যস্তভাবে সঙ্গ ধরলেন। কী ভেবে রাজকুমার একজন বন্দুকধারী গার্ডকেও ডেকে নিল। আমরা দলবেঁধে লুনি নদীর দিকে ছুটে চললুম।
নদীর কাছে আমাদের উটওয়ালাদের সঙ্গে দেখা হল। তারা উটের পাল ডাকিয়ে ব্যস্তভাবে আসছিল। ভয়ার্ত কণ্ঠস্বরে বলল- ওদিকে যাবেন না স্যার! কেল্লাবাড়িতে হলদে রঙের কী একটা দেখে উটগুলো ভয় পেয়েছে। আমরা তাই এদের ডাকিয়ে নিয়ে আসছি।
