কিছুক্ষণ পরে কর্নেল তিনফুট উঁচু গরুড় মহারাজকে দুহাতে তুলে নিয়ে বললেন- শ্রীমানকে স্নান করানো দরকার। চলো জয়ন্ত, নদীতে যাই। ফিরে এসে ডিমের খোলাটা প্যাক করে রাখতে হবে।
রাজকুমার শর্মাজির তাঁবুতে গেছে। আমরা দুজনে চললুম নদীর দিকে। দেখলুম, স্নানে মহারাজের আপত্তি নেই। জল ছিটিয়ে কর্নেল তাকে স্নান করালেন। তারপর একটা পাথরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন- রোদ্দুরে শুকিয়ে নাও মাস্টার ব্লিক! ততক্ষণ আমি প্রকৃতিদর্শন করি। বলে বাইনোকুলারে চোখ রাখলেন।
.
পঙ্গপাল রহস্যের সূত্রপাত
পঙ্গপালের প্রজননক্ষেত্র অনুসন্ধান কর্মসূচির (ইংরেজিতে সংক্ষেপে L B F I P) মেয়াদ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। এদিকে মাস্টার ব্লিক মাত্র দুদিনের বয়সেই পেল্লায় হয়ে উঠেছেন। মাথাটি তাঁবুতে ঠেকছে। দুদিকের চোয়াল থেকে গজানো লাল শুড় দুটো ফুটদুয়েক লম্বা হয়ে ঝুলছে। দাড়ি নাকি?
তার খাদ্য নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। শর্মাজি বিরক্ত! তবে কর্নেল ভেড়ার মাংস সেদ্ধ খাইয়ে দেখেছেন, আপত্তি করে না মাস্টার ব্লিক। প্রজনন ক্ষেত্রের খোঁজে বেরুলে তাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন। এ অঞ্চলের পাহাড়ি খাদকে বলে বেহড়। বেহড়ের ভেতর আবিষ্কৃত প্রজননক্ষেত্রের মাটি পরীক্ষা করার পর যেখানে-সেখানে ওই রকম মাটি আছে, সেখানে যাচ্ছেন ওঁরা। কিন্তু পঙ্গপালের টিকিটিও দেখতে পাচ্ছেন না কোথাও।
একদিন রাজকুমার ও আমি সঙ্গী হলুম কর্নেলদের। মাস্টার ব্লিক ব্লিক ব্লিক আওয়াজ দিতে দিতে মানুষের ভঙ্গিতে হেঁটে চলেছে কর্নেলের পাশে। কর্নেল তার কাঁধে হাত রেখে চলেছেন। এদিন একটা বেহড় থেকে ধাপে ধাপে ওপরে উঠে বালিয়াড়িতে গিয়ে পড়লুম। প্রকাণ্ড উঁচু সব বালির পাহাড় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেদিকে আর না এগিয়ে ডাইনে ঘুরতেই লুনি নদী চোখে পড়ল। নদীর পাড়ে পাথুরে মাটিতে শর্মাজির হাতের অনুসন্ধান যন্ত্রটি রাখতেই ব্লিক করে শব্দ হল। শর্মাজি উত্তেজিতভাবে বললেন পাওয়া গেছে। রাজকুমার, স্প্রে মেশিনটা দেখি।
মাটিটা ওখানে ফেটে আছে। প্রকান্ড সব ফাটলের ভেতরটা অন্ধকার হয়ে রয়েছে দিনদুপুরেই। কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে দূরে কেল্লাটা দেখছিলেন। রাজকুমার স্প্রে মেশিনটা শর্মাজিকে দিল। শর্মাজি যেই বিষাক্ত তরল পদার্থ স্প্রে করতে গেছেন ফাটলের ভেতরে, মাস্টার ব্লিকঝাঁপিয়ে গেল তার দিকে। স্প্রে ফেলে শর্মাজি মাই গড বলে ছিটকে সরে গেলেন। তাকে তাড়া করল মাস্টার ব্লিক। শর্মাজি চেঁচিয়ে উঠলেন কর্নেল! আপনার বাঁদরটাকে সামলান! এ কী!
‘বাঁদর’ রাজকুমার আমার দিকেও তেড়ে এল। আমরা দৌড়ে তফাতে গিয়ে দাঁড়ালুম। কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে ধমক দিলেন- কি হচ্ছে মাস্টার ব্লিক? এমন করছ কেন?
মাস্টার ব্লিক বলল-ব্লিক ব্লিক ক্লিক… ব্লিক… ব্লিক… ব্লিক..ব্লিক!
কর্নেল ভুরু কুঁচকে তাকালেন তার দিকে! তার শুঁড়দুটো টানটান হয়ে খাড়া। যেন এরিয়েল বা অ্যান্টেনা। ক্রমাগত ব্লিক ব্লিক আওয়াজ করছে সে।
কর্নেল এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বললেন- চলো ডার্লিং! তোমাকে তাঁবুতে রেখে আসি। রোদ্দুরে ঘোরাঘুরি করে কাজ নেই। জয়ন্ত, তোমরা অপেক্ষা করো। আমি এখুনি আসছি।
কর্নেল মাস্টার ব্লিককে নিয়ে বেহড়ের পথে নেমে যাওয়ার পর শর্মাজি গোমড়ামুখে ফাটলগুলোর কাছে এলেন। তারপর বললেন- কোনো কাজ হচ্ছে না! কর্নেলের সায়েবকে গভর্নমেন্ট যে কাজে সাহায্য করতে পাঠালেন, ওঁর সে দিকে মন নেই। কাজটা যখন আমাদের দ্বারাই হবে, তখন আর কেন ওঁকে পাঠানো? নাও রাজকুমার। তুমি পাম্প করো, আমি স্প্রে করি।
রাজকুমার স্প্রে মেসিনে বার কতক পাম্প করেছেন এবং শর্মাজি নলটা ফাটলে ঢুকিয়েছেন, অমনি ফাটলের ভেতর থেকে চাপা শিসের শব্দ শোনা গেল। শর্মাজি চমকে উঠলেন। রাজকুমারও থেমে গেল। তারপরে শিসের শব্দটা বাড়তে বাড়তে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যা ঘটল, তা আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণেরই মতো। ফাটলগুলো দিয়ে শনশন আওয়াজ করে বেরুতে থাকল। পঙ্গপালের ঝাঁক। মুহূর্তে আমরা ঢাকা পড়ে গেলুম। কোটি কোটি–অসংখ্য পঙ্গপাল শনশন শব্দে-এবং সেই তীক্ষ্ণ শিসের শব্দ তো আছেই, চারপাশ ওপর-নিচ কালো করে আমাদের কবরে দেবার উপক্রম করল। শর্মাজি চেঁচিয়ে উঠেছিলেন–পালাও! পালাও! এবার তিনি পাগলের মতো মাথা-মুখ ঝাড়তে ঝাড়তে দিশেহারা হয়ে দৌড়োলেন। আমরাও দিশেহারা হয়ে দৌড় দিলুম। কিছুদূর যাওয়ার পর রেহাই পাওয়া গেল। শর্মাজি তখনও দৌড়োচ্ছেন। সেই ফাটলগুলোর ওপর যেন কালো মেঘ শনশন করছে আর সেই শিসের শব্দ।
ক্যাম্পের একটু আগে কর্নেল দাঁড়িয়ে গেছেন। মাস্টার ব্লিক ওদিকে তাকিয়ে ব্লিক ক্লিক করছে। তাকে খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছে। শর্মাজি এলে কর্নেল বললেন–ভারি অদ্ভুত তো!
শর্মাজি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন- অর্থপেডেইরা গোত্রের পঙ্গপাল এগুলো। এই দেখুন একটা ধরে এনেছি। প্রজাতি হল সিস্টেসার্কা গ্রেগরিয়া। ডেজার্ট লোকাস্ট বলা হয়। কিন্তু এদের এমন অদ্ভুত আচরণের কথা জানা নেই।
কর্নেল ফড়িংটা ওঁর হাত থেকে নিয়ে বললেন- মাই গুডনেস! ড. শর্মা! দেখুন ভালো করে, এটার দেহে যেন কোনো জৈবিক পদার্থ নেই। ধাতব উপাদানে তৈরি বলে মনে হচ্ছে।
