তারপর তারা গ্রামের দিকে দৌড়ে গেল। একটু পরেই দেখি, গ্রাম থেকে ঢাকঢোল শিঙা কাঁসি বাজাতে বাজাতে বুড়োবুড়ি জওয়ান-জওয়ানি আন্ডাবাচ্চাসুদ্ধ দৌড়ে আসছে আর গরুড় মহারাজের জয়ধ্বনি হাঁকছে। কাছে এসে তারা মাটিতে লুটিয়ে প্রণাম করল। তারপর যে তুমুল কাণ্ড জুড়ে দিল, কান একেবারে ঝালাপালা। গরুড় মহারাজ যেন এই প্রচণ্ড জগঝম্বে তিষ্ঠোতে না পেরে নড়বড়ে ঠ্যাং ফেলে বিরক্ত হয়ে তাঁবুতে গিয়ে ঢুকলেন।
রাজকুমার অনেক চেষ্টায় ভক্তদের থামিয়ে বলল- ব্যাপারটা কী তোমাদের বলো তো শুনি?
গ্রামের মুখিয়া সেলাম দিয়ে বলল-হুজুর রানাজি! ইনি হলেন বিনতা মাইজির সন্তান গরুড় মহারাজ। আপনারা তো লিখাপড়া আদমি হুজুর। শাস্ত্রপুরাণ পড়েছেন। গরুড়জির কথা অবশ্যই জানেন।
রাজকুমার অবাক হয়ে বলল-বুঝলুম। কিন্তু এই জীবটিকে গরুড় বলছ কেন?
বাঃ! কী বলেন রানাজি? মুখিয়া বলল। গত বছরেও একবার গরুড় মহারাজের কৃপা হয়েছিল। সেবারও উনি কেল্লার মাঠে দর্শন দিয়েছিলেন। দু ঘণ্টা ছিলেন। তারপর উড়ে গেলেন! অন্য একজন বলল- সেবার তিনি আরও বড় হয়ে দর্শন দিয়েছিলেন। এবার উনি যে এত ছোটো চেহারায় দর্শন দিয়েছেন, তার কারণ আমাদেরই কেউ পাপ করেছে।
মুখিয়া গর্জন করে বলল–কে কী পাপ করেছ, এখনই মহারাজের সামনে কবুল করো।
এক বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে বলল- হাঁ মহারাজ! ধনসিংয়ের ছাগলটা এমনি এমনি পাহাড় থেকে পড়ে মরেনি। আমি পাথর ছুঁড়ে তাড়া করেছিলুম। ছাগলটা ঢুঁ মেরে আমার গাগরি ভেঙে দিয়েছিল। গাগরিতে জল ছিল মহারাজ! তখন শুখার মাস!
মুখিয়া এখানেই পঞ্চায়েত ডাকার হুকুম দেয় আর কী! রাজকুমারের ইশারায় গার্ড দুজন বন্দুক উঠিয়ে তাদের হটিয়ে দিল। লোকগুলো বন্দুককে খুব পায় মনে হচ্ছিল। কোলাহল করতে করতে তারা গ্রামের দিকে চলে গেল। রাজকুমার বলল- বোঝা যাচ্ছে এ কোনো বিরল প্রজাতির পাখি। অরিন্থোলজি (পক্ষিতত্ত্ব) এর খোঁজ রাখে না। যাইহোক, আমরা একে আবিষ্কারের গৌরব অর্জন করেছি।
তাঁবুর ভেতর গরুড়জি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর কোনায় রাখা বিস্কুটের টিনের দিকে নজর যেতেই চঞ্চুতে কামড়ে তুলে নিলেন এবং পায়ের নখ দিয়ে ঢাকনা খুলে বিস্কুটগুলো সাবাড় করতে থাকলেন।
আমাদের উটওয়ালারা ভোরবেলা নদীর ওপারে কাঁটাবনে উঠ চরাতে গিয়েছিল। কীভাবে খবর পেয়ে উটগুলো চরতে দিয়ে ওরা দৌড়ে এল ক্যাম্পে। তারপর গরুড় মহারাজকে দর্শন করে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করল। তার কিছুক্ষণ পরে কর্নেল ও শর্মাজি হন্তদন্ত ফিরে এলেন।
শর্মাজি যে জিনিসটাকে গুপ্তচর সাব্যস্ত করেছিলেন, তা থেকে এই রামগরুড়ের ছানা বেরুতে দেখে থ বনে গেলেন। তারপর নিরাপদ দূরত্বে পরীক্ষা করার পর হতাশভাবে বললেন-প্রাণী বিজ্ঞানে এমন কোনো জীবের কথা নেই। তাছাড়া ডিমের খোলাটা সিলিকন পাত দিয়ে তৈরি, এও বিস্ময়কর। কারণ সিলিকন প্রকৃতিতে এমন বিশুদ্ধ আকারে পাওয়া অসম্ভব। আমি কিছু বুঝতে পারছি না, কর্নেল!
কর্নেল একটু করে এগিয়ে খাটের কোনায় চলে গেলেন। গরুড়জির বিস্কুট খাবার শেষ হয়ে গেছে। এখন জেলির টিন খুলে চঞ্চু ডুবিয়েছেন। চটচটে আঠালো লালরঙের খাদ্যটা ওঁকে একটু বিপাকে ফেলেছে। কর্নেলকে কাছে দেখে তার সাদা একরাশ দাড়িতে হঠাৎ প্রকাণ্ড চঞ্চু ঘষে নিলে। সাদা দাড়ি লাল হয়ে গেল জেলির রঙে। আমরা হাসতে থাকলুম। কর্নেল একটুও বিব্রত না হয়ে গরুড়জির কাঁধে হাত রাখলেন। মহারাজ আপত্তি করলেন না। তখন কর্নেল ওঁকে কাছে টেনে ওঁর মুখে জেলি পুরে দিতে থাকলেন।
একটু পরে কর্নেল বললেন-ড. শর্মা! ডিমের খোলা সিলিকনের। তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, আমার মনে হচ্ছে এই পাখির শরীরটাও সম্ভবত কোনো জৈব পদার্থে গড়ে ওঠেনি।
শর্মাজি চমকে উঠে বললেন- বলেন কী!
–হ্যাঁ মনে হচ্ছে, এর শরীরও কোনো ধাতু দিয়ে গড়া!
-অসম্ভব! বলে শর্মাজি হাত বাড়িয়ে পরীক্ষা করতে গেলেন। তখননি ব্লিক ব্লিক শব্দ করে গরুড়জি চঞ্চুর ঠোক্কর মারতে এলেন তাঁকে। শর্মাজি আঁতকে উঠে পিছিয়ে গেলেন।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন- কোনো কারণে আপনাকে পছন্দ করছে না!
শর্মাজি বললেন-ভূতের বাচ্চা কোথাকার! যাই হোক, ওটা নরম না কঠিন?
– কোথাও কোথাও নরম, আবার কোথাও কঠিন।
-ডাকটা শুনছেন ব্যাটাচ্ছেলের? ব্লিক ব্লিক! যেন রেডিয়ো ওয়েভ!
–সেটাও আশ্চর্য! শুনুন। যেন কোড ল্যাংগুয়েজ। ব্লিক ব্লিক… ব্লিক ব্লিক ব্লিক..ব্লিক!
শর্মাজি গোমড়ামুখে বললেন–আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। নচ্ছার পাখিটা এবেলার প্রোগ্রাম ভেস্তে দিল। পাঁচটা দিন তো প্রাথমিক প্রস্তুতিতেই কেটে গেল। হাতে আর মাত্র দুটো দিন! দেখি, কী করা যায়।
বলে উনি নিজেদের তাঁবুতে চলে গেলেন। আমি সাহস করে গরুড়জির কাছে গেলাম। কিন্তু যেই ছুঁতে হাত বাড়িয়েছি, গরুড়জি আমাকেও শর্মাজির মতো চঞ্চু তুলে তেড়ে এলেন। ঝটপট সরে গিয়ে বললুম- কর্নেল! আপনাকে তো কিছু বলছে না। দিব্যি আদর খাচ্ছে চুপচাপ।
কর্নেল হাসলেন শুধু। রাজকুমার বলল–আমাকে পছন্দ করে কিনা দেখা যাক। বলে সে যেই এগিয়েছে, গরুড়জি জোরালো ব্লিক ব্লিক আওয়াজ দিয়ে তেড়ে এলেন। রাজকুমার হাসতে হাসতে সরে গেল।
