টর্চের আলোয় পাথরের কারুকার্যখচিত ফুট পাঁচেক উঁচু স্তরের পাশে বালির ভেতর একটা সাদা জিনিস চকচক করছিল। বালি সরাতেই বেরিয়ে পড়ল একটা প্রকাণ্ড ডিম্বাকৃতি সাদা জিনিস। কর্নেল বললেন- দুহাতে তুলে দ্যাখো ওঠাতে পারছ নাকি।
জিনিসটা তত কিছু ভারী নয়। সহজে দুহাতে তুলে ধরলুম। কর্নেল টোকা দিয়ে দেখে হাসতে হাসতে বললেন- এ কোন পাখির ডিম জয়ন্ত? আরব্য উপন্যাসের সিন্দবাদ নাবিকের দেখা সেই রক পাখির ডিম? যদি এটা সত্যি ডিম হয়, তাহলে পাখিটার গড়ন কল্পনা করো তো!
বললুম পাখিটা হবে অন্তত একটা ডাকোটা প্লেনের মতো। কিন্তু এটা থেকেই যে আলো ঠিকরোচ্ছে, তার প্রমাণ?
কর্নেল চেঁচিয়ে বললেন- রাজকুমার! জিনিসটা কি দেখতে পাচ্ছ?
রাজকুমার সাড়া দিয়ে বলল-পাচ্ছি। উঁচুতে উঠে গেছে।
আমি অতিকায় ডিমটাকে দুহাতে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। অতএব এটাই সেই রশ্মি বিকিরণকারী জিনিসটা। কর্নেল বললেন-চলো ডার্লিং! তাঁবুতে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করা যাবে। শর্মাজি প্রাণীবিজ্ঞানী। নিশ্চয় তিনি একটা কিছু হদিস দিতে পারবেন।
ডিম হোক, যাই হোক, জিনিসটার তাপ আছে। মরুভূমির শীতের কনকনে ঠান্ডায় আমাকে আরাম দিচ্ছিল যথেষ্ট। …
.
মাস্টার ব্লিকের জন্ম
প্রাথমিক পরীক্ষা করে শর্মাজি আমাদের চমকে দিয়ে বলেছেন, ডিম্বাকৃতি বস্তুটির বহিরাবরণ সিলিকন ধাতুতে তৈরি। প্রকৃতিতে এভাবে সিলিকন পাওয়া যায় না। অতএব এটি মানুষেরই তৈরি কোনো যন্ত্র।
কিন্তু কী যন্ত্র? আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা গেছে। সূর্যোদয়ের পর ওটা তাপনিরপেক্ষ অবস্থায় থাকে। কিন্তু ক্রমশ সন্ধ্যার দিকে তাপ বাড়তে থাকে। মধ্যরাতে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছোয়। তারপর আবার কমতে কমতে ভোরবেলা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সূর্য ওয়ার পর ক্রমশ তাপ ও শীতলতার মাঝামাঝি অবস্থা। রামধনুরশ্মি বিকিরণ করে সূর্যাস্তকাল থেকেই এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে তা চোখে পড়ে। কিন্তু রাত বারোটায় খুব কাছ থেকেই তা দেখা যায়। আমাদের তাঁবুর ভেতর ওই সময় রীতিমতো রামধনুর খেলা। বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা। কিন্তু তাঁবুর ভেতরে বেশ গরম। আমার সমস্যা হল, রাতের শয্যা আরামপ্রদ হলেও পাশে রামধনু নিয়ে শোয়া বড়ো অস্বস্তিকর।
শর্মাজির বিশেষ ইচ্ছা, এই যন্তরমন্তরটি দিল্লিতে প্রতিরক্ষা গবেষণাগারে পাঠানো হোক। কর্নেলের তাতে আপত্তি। শর্মাজির বক্তব্য হল, পাকিস্তান সীমান্ত এখান থেকে বেশি দূরে নয়। সম্ভবত এটা তাদেরই কোনো যন্তরমন্তর। অর্থাৎ শোনা কথায় স্পাইং ডিভাইস। যান্ত্রিক গুপ্তচর।
রেডিয়ো ট্রান্সমিশান যন্ত্রে বারমের থানায় খবর পাঠানোর তিনদিন পরে সেনাবাহিনীর একটা হেলিকপ্টার হ্যাং গ্লাইডারটা ভাঁজ করে গুটিয়ে নিয়ে গেল। ওঁরা সারা তল্লাট তন্নতন্ন খুঁজতে খুঁজতে এসেছিলেন। ইন্দ্রনীলকে জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থায় দেখতে পাননি।
আজগুবি ডিমটার কথা কর্নেলের অনুরোধে শর্মাজি ওঁদের ফাঁস করলেন না। কিন্তু সারাক্ষণ মুখ ব্যাজার করে আছেন। পঞ্চম দিনে রোজকার কর্মসূচি অনুসারে কর্নেলকে নিয়ে শর্মাজি গেলেন ইতিপূর্বে আবিষ্কৃত পঙ্গপাল প্রজননক্ষেত্র দেখতে। রাজকুমার তাঁবুর সামনে টেবিল পেতে এলাকার মানচিত্রের একটা চার্ট নিয়ে বসে কী সব মাপজোখ করছেন আর মানচিত্রে ফুটকি দিয়ে চলেছেন। আমি ব্যাপারটার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে নিজের উঁবুতে ঢুকে একটা গোয়েন্দা উপন্যাস নিয়ে বসেছি। হঠাৎ কোনায় রাখা প্রকাণ্ড ডিমটা থেকে ব্লিক ব্লিক শব্দ শুনে চমকে উঠলাম। শব্দটা খুবই চাপা। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড অন্তর অন্তর হতে থাকল। রাজকুমারকে ডাকব কিনা না ভাবছি, এই সময় ডিমটা একটু নড়ে উঠল।
তারপর সরু দিকটা নিঃশব্দে ফেটে গিয়ে টুকটুকে লালরঙের একটা মাথা দুটো জ্বলজ্বলে নীল চোখ আর দুটো শুড়ের মতো কী বেরিয়ে এল। আমি ছিটকে বেরিয়ে চাঁচাতে থাকলুম রাজকুমার! রাজকুমার! শিগগির এসো।
রাজকুমার দৌড়ে এলে তাঁবুর ভেতরে ওই কাণ্ডটা দেখিয়ে দিলুম। সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ডিমটা পুরোটাই মাঝামাঝি ফেটে বেরিয়ে এসেছে এক অদ্ভুত প্রাণী। কিংবা পাখি। অথবা পাখি ও স্থলচর প্রাণীর মাঝামাঝি জীব। না-হলফ করে বলতে পারি, এ কদাচ উটপাখির বাচ্চা নয়। নড়বড় করতে করতে দু ঠ্যাংয়ে ওটা দাঁড়িয়ে গেল। পা দুটো পাখির মতো, দুপাশে দুটো ডানার মতো জিনিসও আছে। কিন্তু মুখের গড়ন কতকটা মানুষ ও পাচার মাঝামাঝি। চোখদুটো কপালের ওপর। টানাটানা চোখ। মাথাটা গোল ও চ্যাপ্টা। মাথায় লাল চুল অথবা রোঁয়া। ধড়ের রং কালো, পা গাঢ় হলুদ।
চঞ্চু দুটো লাল এবং চঞ্চুর গড়ন দেখেই পাচার কথা মাথায় এসেছিল। দুপায়ে দাঁড়িয়ে কিস্তৃত জীবটি প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে আমাদের দেখছে।
গার্ড ও কর্মীরা দৌড়ে এসে তাজ্জব হয়ে দেখছে। রাজকুমার একজন কর্মীকে তক্ষুনি কর্নেলদের ডাকতে পাঠালেন।
এবার জীবটি এক-পা এক-পা করে তাঁবু থেকে বেরিয়ে রোদ্দুরে এসে দাঁড়াল। অমনি তার শরীর ঝলমল করে উঠল।
সিহৌরা থেকে দুজন নদীতে যাচ্ছিল। তারা দৌড়ে এসে জীবটাকে দেখা মাত্র ধপাস করে পড়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করল। তারপর চেঁচিয়ে উঠল বিকটভাবে জয়! গরুড় মহারাজ কী জয়!
