বললুম- পড়লে তো ভেঙেচুরে যেত!
–হুঁ, তা ঠিক। রাজকুমার উদ্বিগ্নমুখে কর্নেলের দিকে তাকাল।
কর্নেল তখনও মাটিতে চোখ রেখে ঘুরছেন। হঠাৎ একখানে হাঁটু দুমড়ে বসে কোটের পকেট থেকে আতশ কাচ বের করলেন। ওটা কি পকেটে নিয়েই ঘোরেন সবসময়।
আলো কমে এসেছে। এত কম আলোয় কী সব দেখছেন গভীর মনোযোগ দিয়ে কে জানে! একটু পরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- কিছু বোঝা যাচ্ছে না। মাটির ওপর সূক্ষ্ম টানা-টানা অনেকগুলো আঁচড় দেখলুম।
বললুম- মাকড়সার চলাফেরার দাগ তাহলে।
রাজকুমার বললেন- ঠিক বলেছেন। মরু মাকড়সাগুলো প্রকাণ্ড-প্রকাণ্ড হয়। ঠ্যাংগুলো অন্তত ফুটখানেক করে লম্বা।
কর্নেল আবার বাইনোকুলারে চারদিক দেখছেন। আমি আর রাজকুমার দুঃসাহসী অভিযাত্রী ইন্দ্রনীলের অন্তর্ধানরহস্য নিয়ে জল্পনাকল্পনা শুরু করলুম। গ্লাইডার থেকে নেমে কোথায় যেতে পারে সে? কাছাকাছি বসতি বলতে সিহৌরা। অন্যদিকে পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে আর জনবসতি নেই। তাহলে?
দিনের শেষ আলো থেকে লালচে রংটা মুছে গেছে। ধূসর হয়ে গেছে আলো। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। কর্নেল বললেন- গ্লাইডারটা এখানে যেমন আছে থাক। রাতেই বরং আমরা রেডিয়ো-মেসেজ পাঠিয়ে খবরটা জানিয়ে দেব পুলিশ স্টেশনে। চলো এবার কেল্লাটা একটু দেখে যাই ফেরার পথে ….
.
এ কীসের ডিম?
রানা ভানুপ্রতাপের তৈরি লাল পাথরের কেল্লাটার দক্ষিণ অংশ সম্পূর্ণ বালিতে ডুবে গেছে। উত্তর অংশটা ভাঙাচোরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ফটক মুখ থুবড়ে পড়েছে। পাথর ডিঙিয়ে ঘোরালো ফুট পনেরো চওড়া পথ ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠেছে। পথটা পাথরের ইটে বাঁধানো। ভেঙেচুরে গেছে। বালি ঢুকছে ফাটলে। কর্নেল টর্চ বের করে বললেন- ভেবো না ডার্লিং! ফেরার সময় যাতে ঠ্যাং না ভাঙে, তার জন্য আলোর ব্যবস্থা আছে!
আমার বৃদ্ধ বন্ধু যেন চলমান গেরস্থালি। ওপরে কেল্লার চত্বরে পৌঁছে সারবন্দি ঘর দেখা গেল। কোনোটারই কপাট জানালা বলতে কিছু নেই। কবে কারা খুলে নিয়ে গেছে-হয়তো সিহৌরার বর্তমান অধিবাসীদের পূর্বপুরুষেরাই। প্রাকারের ধারে গিয়ে কর্নেল বাইনোকুলার দিয়ে আবার দেখতে শুরু করলেন। আমি কল্পনা করছিলুম, একদা এই প্রাকারে সশস্ত্র প্রহরীরা টহল দিয়ে বেড়াত-কেল্লার ভেতর কত সৈন্যসামন্ত নিয়ে বাস করতেন রানা ভানুপ্রতাপ। রাজকুমার আমার মনোভাব আঁচ করে সেইসব গল্প শোনাতে থাকল। মোগলদের অত্যাচারেই রানা এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
আলোর ধূসরতা এখন ক্রমশ কালো রঙে পরিণত হচ্ছে। কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন- আচ্ছা রাজকুমার, ওদিকে কিছুদূরে একটা স্তম্ভ দেখলুম বালিতে মাথা উঁচু করে আছে। ওটা কীসের?
রাজকুমার বললেন- শুনেছি ওটা ছিল একটা অবজারভেটরি। রানা ভানুপ্রতাপের জ্যোতিষী শিবশংকর রাওজি গ্রহনক্ষত্র দেখতেন। ওটা পঞ্চাশ ফুট উঁচু টাওয়ারের টুকরো বালির তলায় চাপা পড়ে গেছে অবজারভেটরি।
সেদিকে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ কী একটা ঝিকমিক করে উঠল। বললুম-কর্নেল! ও কীসের আলো?
কর্নেলের চোখ পড়েছিল আমার বলার আগেই। বললেন- প্রথমে ভাবলুম বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছে বুঝি! কিন্তু আকাশে মেঘ নেই। তাছাড়া স্তম্ভটার কাছে বালির ওপর বিদ্যুতের ঝিলিক! আরে! লক্ষ্য করছ? রং বদলাচ্ছে যেন মুহুর্মুহু!
হ্যাঁ- সূক্ষ্ম আলোর ঝিলিকটা নীল সবুজ লাল হলুদ সাদা হচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে। রাজকুমার হতবাক হয়ে দেখছিলেন। বললেন- আশ্চর্য তো! এমন কোনো ব্যাপার সিহৌরার লোকে দেখে থাকলে নিশ্চয় জানতে পারতুম! ওটা কী হতে পারে, বলুন তো কর্নেল?
কর্নেল বললেন, কিছু বুঝতে পারছি না। চলো তো দেখে আসি।
টর্চের আলো ফেলে উনি আগে, আমরা দুজনে পেছনে এবড়োখেবড়ো রাস্তাটা দিয়ে কেল্লা থেকে নেমে গেলুম। ভাঙা ফটকের পাথরগুলো ডিঙিয়ে চলতে চলতে রাজকুমার বলল কর্নেল! শুনেছি এই কেল্লায় গুপ্তধন ছিল। রানা ভানুপ্রতাপের কোনো দামি রত্ন ওখানে পড়ে নেই তো? হয়তো কোন যুগে কারা গুপ্তধন আবিষ্কার করে নিয়ে পালাচ্ছিল। সেই সময় ওখানে কীভাবে একটা রত্ন পড়ে গিয়েছিল। বাতাসের দাপটে এতদিনে বালি সরে গিয়ে সেটা বেরিয়ে পড়েছে?
কর্নেল একটু হেসে বললেন–তুমি যে অত্যন্ত যুক্তিবাদী, তাতে সন্দেহ নেই রাজকুমার। বিজ্ঞানীদের কাছে সবসময় সব ঘটনার যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যাই আশা করব। ড. শর্মা হলে হয়তো ব্যাপারটা ভূতুড়ে বলেই ব্যাখ্যা করতেন। অথচ উনি একজন প্রবীণ বিজ্ঞানী। আসার পথেও আমাকে বলেছিলেন, সিহৌরা এলাকায় নাকি অদ্ভুত অদ্ভুত ফেনোমেনা দেখা যায়। ওঁর বিশ্বাস, বৈজ্ঞানিক উপায়ে সেগুলো বোঝা সম্ভব নয়। কারণ
হঠাৎ উনি থেমে গেলেন। আমরাও থমকে দাঁড়ালুম। রংবেরংয়ের আলোর ঝিলিক আর দেখা যাচ্ছে না।
কর্নেল কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন- কী কান্ড! এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। অথচ আর একটু এগোলে আর দেখা যাচ্ছে না, তার মানে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে চোখের রেটিনায় ওই বিচ্ছুরণটা ক্রিয়াশীল। ভাববার কথা। এক কাজ করা যাক। রাজকুমার। তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি আর জয়ন্ত এগিয়ে যাই; তুমি চেঁচিয়ে বলে দেবে ঠিক জায়গায় যাচ্ছি কি না।
রাজকুমার দাঁড়িয়ে রইল। আমরা দুজনে এগিয়ে গেলুম। রাজকুমার চেঁচিয়ে নির্দেশ দিতে থাকল ডাইনে-এবার সোজা! হ্যাঁ, এগিয়ে যান। বাঁদিকে। না–একটু ডাইনে। হ্যাঁ- এবার সোজা। ঠিক আছে। …
