সূর্য অস্ত গেল সিহেরার পেছনে লাল পাথরের উঁচু পাহাড়ের আড়ালে। কর্নেল কফি খেয়ে চুরুট ধরিয়ে বললেন-এসো ডার্লিং! ওঁরা দেখছি খুব ক্লান্ত হয়ে জিরোচ্ছেন। ওঁদের আর ডেকে কাজ নেই। নদীটা একবার দর্শন করে আসি।
বিনায়ক শর্মার বয়স পঞ্চান্নর কাছাকাছি। রোগা লম্বাটে গড়নের মানুষ। রাজকুমার আমার বয়সী যুবক। বেশ স্বাস্থ্যবান সুদর্শন। অভিজাত রাণাবংশের ছাপ চেহারায় স্পষ্ট। রাজকুমার বলল- কর্নেল, কোথায় যাচ্ছেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন লুনিদর্শনে, তুমি ক্লান্ত বলে ভাবছিলুম ডাকব না। বিশ্রাম নাও।
–কী যে বলেন! বলে রাজকুমার উঠে এল। উঠের পিঠে আমার জন্ম বলতে পারেন।
বিনায়ক বললেন আপনারা নদীতে যাচ্ছেন? ঠিক আছে। কিন্তু ওপারে যাবেন না-সন্ধের মুখে ওপারে যাওয়াটা ঠিক নয়।
কর্নেল অবাক হয়ে বলললেন- কেন বলুন তো?
রাজকুমার জানে। বলবে আপনাকে। বলে বিনায়ক শর্মা ওরফে শর্মাজি ক্যাম্পচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে দুলতে শুরু করলেন।
পা বাড়িয়ে রাজকুমার হাসতে হাসতে চাপা গলায় বললেন- শর্মাখুড়োকে দেখছেন। উনি বিজ্ঞানী হলে কী হবে? কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মানুষ। কবে এখানে এসে শুনে গেছেন, লুনি নদীর ওপারে ভূতের রাজত্ব।
কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে ওপারটা দেখতে দেখতে বললেন-ওটা কি কোনো কেল্লা নাকি রাজকুমার?
রাজকুমার বলল- হ্যাঁ। ব্রিটিশ যুগে এই এলাকা ছিল আমার দাদু রানা উদয়ভানুজির রাজ্য। করদ রাজ্য আর কী! ওই কেল্লাটা আমাদেরই পূর্বপুরুষের। কয়েক পুরুষ আগেই ভেঙেচুরে গেছে। বালির ভেতরটা অনেকটা ঢাকা পড়েছে।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে নদীর বালিতে নেমে গেলুম। অসংখ্য পাথর পড়ে আছে। তার ওধারে গিয়ে দেখি একজন লোক একপাল ছাগলকে জল খাওয়াচ্ছে। আমাদের দেখে সে খুব অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। জলটায় জুতোর তলা পর্যন্ত ডোবে না। পেরিয়ে যাচ্ছি যখন, তখন সে আমাদের ডাকল- শুনিয়ে শুনিয়ে!
আমরা ঘুরে দাঁড়ালুম। কর্নেল বললেন-কিছু বলছ ভাই?
লোকটা বলল- সায়েব! আপনারা এখন ওপারে যাবেন না। একটু আগে আমি কেল্লার ওপাশে কাটার জঙ্গলে ছাগল চরাতে চরাতে হলদে রঙের একটা দানো দেখতে পেয়ে পালিয়ে এসেছি। দানোটা শুয়ে ঘুমোচ্ছে। তাই আমাকে দেখতে পায়নি। নইলে বচ্চন সিংয়ের দশা হত আমার।
কর্নেল হাসি চেপে বললেন-কী দশা হয়েছিল বচ্চন সিংয়ের?
– সে খুব ভয়ংকর ঘটনা সায়েব! লোকটা চোখ বড় করে বলল–বচ্চন তো বটেই, আর তিরিশটা ছাগলও মারা পড়েছিল দানোটার নিশ্বাসের বিষে। আর সায়েব, দানোর নিশ্বাস মানে কী? প্রচণ্ড গরম ঝড়। সিহৌরাতক এসে ধাক্কা মেরেছিল! সব বাড়ি উড়ে গিয়েছিল। আর সে কী তাপ! খরার সময় দুপুরবেলাতেও এমন তাপ দেখা যায় না!
রাজকুমার বলল- যত্তোসব! এ অঞ্চলে এরকম আকস্মিক ঘূর্ণিঝড় কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে। আবহবিজ্ঞান সম্পর্কেও আমার কিছু জানাশোনা আছে। এখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে পঞ্চাশ-ষাট মাইল গেলেই কচ্ছের রান অঞ্চল শুরু। ওখানে লুনি নদী মিশেছে জলাভূমিতে। জলাভূমির সঙ্গে আরবসাগরের যোগাযোগ আছে। মধ্য রাজস্থানের মরুতে প্রচণ্ড তাপের ফলে যখন বাতাস হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। তখন সেই ফাঁক পূরণ করার জন্য আরবসাগর থেকে কচ্ছ পেরিয়ে প্রচণ্ড জোরে বাতাস ছুটে আসে। ভুপৃষ্ঠে তাপের হেরফেরের জন্য ঝড়টা কয়েকটা কেন্দ্রে বৃত্ত হয়ে ওঠে। সেগুলোকে বলব একেকটা ঘূর্ণাবর্ত।
কথা বলতে বলতে আমরা পাথরের ওপর দিয়ে ওপারে পৌঁছে গেছি। তখনও দিনের শেষ আলো লালচে রঙে ছড়িয়ে আছে আদিগন্ত। বাঁদিকে উত্তরে বহুদূরে বালিয়াড়ি, সমুদ্রের মতো ঢেউখেলানো অবস্থায় চলে গেছে। ডানদিকে পাথুরে লাল মাটির প্রান্তর এবং কাঁটাগুল্মের জঙ্গল তারপর পাহাড়। পূর্বে কেল্লার ওদিকে ন্যাড়া চটান জমি পাথরে ভর্তি বহুদূর বিস্তৃত।
কর্নেল বাইনোকুলারে ওদিকটা দেখছিলেন। হঠাৎ বলে উঠলেন–সর্বনাশ! সত্যিই তো একটা হলুদ দানো দেখতে পাচ্ছি!
প্রথমে রাজকুমার, তারপর আমি বাইনোকুলারটা নিয়ে জিনিসটা দেখলুম। কিছু বুঝতে পারলুম না। পাথরের আড়ালে লম্বাটে হলুদ রঙের একটা জিনিস সত্যি দেখা যাচ্ছে। কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, এসো তো। দেখি।
কেল্লা বাঁদিকে রেখে কিছুদূর এগিয়ে আমার মাথার ভেতর কী একটা ঝিলিক দিল। বললুম কর্নেল! ওটা সেই ইন্দ্রনীল রায়ের গ্লাইডার নয় তো? ইন্দ্রনীল গ্লাইডারসহ নিখোঁজ হয়েছে বলে কাগজে পড়ছিলুম না?
কর্নেল হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন। পঁয়ষট্টি বছরের বুড়ো মানুষ এমন হাঁটতে পারেন ভাবা যায়! কাছাকাছি গিয়েই বলে উঠলেন –হ্যাঁ জয়ন্ত! হ্যাং গ্লাইডার!
গ্লাইডার পড়ে আছে পরিষ্কার জমিতে। সেখানে কোনো পাথর বা কাঁটা গুল্ম নেই। মাটিটাও বালি থাকায় যথেষ্ট নরম। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, গ্লাইডারটার একটুও ক্ষতি হয়নি। দেখে মনে হচ্ছে, যেন ইন্দ্রনীল এখানে ইচ্ছে করেই আস্তেসুস্থে নেমেছে। দুজনের মধ্যিখানে এনামেল রঙের ফ্রেমে কোনো রকমে বসার মতো ছোট্ট একটুখানি আসন এবং তার তলায় ইঞ্জিন ও কনট্রোল বক্স অটুট আছে। কিন্তু তাহলে ইন্দ্রনীল কোথায় গেল?
কর্নেল বালিমাটিতে পায়ের চিহ্ন খুঁজছিলেন। আমরাও খুঁজতে শুরু করলুম। রাজকুমার তো অনেকটা চক্কর মেরে এল। এসে বলল আশ্চর্য তো! কোথাও পায়ের ছাপ নেই। তাহলে কি ভদ্রলোক আকাশ ভেসে থাকার সময়ই দৈবাৎ কোথাও পড়ে গেছেন। তারপর গ্লাইডারটা এসে পড়ে গেছে?
