তাহলেও এ পর্যন্ত বিশ্বরেকর্ড বলতে ইংলিশ চ্যানেল আকাশপথে হ্যাং গ্লাইডারে পেরুনোর কীর্তি রবিনসন গ্রিফিথের। কিন্তু এই বাঙালি যুবকটি যা করতে গেলেন, সেটা যেন আত্মহত্যার ব্যাপার। কয়েক হাজার মাইলের দূরত্ব যে!
রাজস্থানের জয়পুর থেকে যোধপুরে ট্রেনে আসার পথে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার পাতায় আবার ইন্দ্রনীলের খবর পড়ে চমকে উঠলুম। হ্যাঁ, যা ভেবেছিলাম, তাই ঘটেছে। ইন্দ্রনীল তাঁর গ্লাইডার সহ নিখোঁজ হয়েছেন। তার হলুদ রঙের গ্লাইডার শেষ দেখা গেছে পাঞ্জাবের দক্ষিণ সীমানায় ভাতিণ্ডার কাছে বিমানবাহিনীর অভজারভেটারি থেকে।
খবরটার দিকে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলুম। উনি চোখে বাইনোকুলার স্থাপন করে ট্রেনের জানলা দিয়ে মরু অঞ্চলের পাখপাখালি খুঁজছিলেন সম্ভবত। শুধু বললেন তাই নাকি? তারপর আবার বাইনোকুলারে চোখ দিলেন। মাঝে মাঝে অভ্যাস মতো একরাশ সাদা দাড়িতে হাত বুলোতে ভুললেন না।
আমাদের– ঠিক আমার নয়, কর্নেলের গন্তব্য বারমের স্টেশনে নেমে জালোরের পথে লুনি নদীর তীরে একটি গ্রাম সিহৌরা। বরাবরের মতো এবারও আমি তার সঙ্গী। ভারত সরকারের লোকাস্ট কনট্রোল বোর্ড অর্থাৎ পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ তাকে পঙ্গপালের প্রজননক্ষেত্রে সন্ধানের দায়িত্ব দিয়েছেন। পাখি প্রজাপতি পোকামাকড় আর উদ্ভিদের রহস্য নিয়ে ক্রমশ যেভাবে এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক মেতে উঠেছেন, আমার কেমন একটা অস্বস্তি হয় আজকাল।
ওঁর কাছেই জেনেছি, পরিযায়ী বা মাইগ্রেটরি পাখিদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে মরশুমি অভিযাত্রার মতো পঙ্গপালের ঝাঁকেরও নাকি একই স্বভাব। আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি থেকে শরৎকালের শেষে ওরা আকাশ কালো করে উড়ে আসে। পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতের রাজস্থান মরু অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ওরা আসে প্রজননক্ষেত্রের খোঁজে। সেখানে ডিম পাড়বে। ছানাপোনাগুলো পনেরো দিনের মধ্যেই লায়েক হয়ে যাবে। তখন খারিফ শস্যের মরসুম। শস্যের খেতে গিয়ে হানা দেবে। আকাশ কালো হয়ে যাবে। শস্যের ক্ষেত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে শূন্য করে চলে যাবে অন্য এলাকায়। হেলিকপ্টারে করে বিষ স্প্রে করেও ওদের সংখ্যা কমানো যায় না। নিরক্ষর গ্রামের মানুষ পুজো দিয়ে দেবতার কাছে মাথা ভাঙে। আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া সৃষ্টি করে। এবং অনেকে ঢাকঢোল কাসি ক্যানেস্তারা পিটিয়ে শোরগোল তুলেও পঙ্গপালের ঝাঁক তাড়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। পরিণামে দুর্ভিক্ষের অবস্থা দেখা দেয়।
পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ বারমেরে একটি গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করেছেন। সেখানে পঙ্গপাল নিয়ে প্রচুর গবেষণা চলেছে। জীববিজ্ঞানীরা অবশেষে সুপারিশ করেছেন, ওদের প্রজননক্ষেত্রটি খুঁজে যদি যথাসময়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়, তাহলে উৎপাত ক্রমশ বন্ধ হবে। বয়স্ক পঙ্গপালেরা ডিম পেড়েই অথর্ব হয়ে ক্রমশ সেখানেই মারা যায়। কাজেই ওদের ব্রিডিং ফিল্ডটি খোঁজা দরকার।
কিন্তু কাজটা সহজ নয়। রাজস্থানের বিশাল থর মরুভুমি এখনও দুর্গম। সারা রাজস্থানের বসতি এবং পাহাড় এলাকাতেও কোথাও ব্রিডিং ফিল্ডের সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায়নি। লুনি নদীর অববাহিকায় গতবছর একটি ব্রিডিং ফিল্ড আবিষ্কৃত হয়েছিল। কর্নেল প্রথমে সেখানেই যেতে চান। তার গোয়েন্দাস্বভাব অনুসারে সেখান থেকে সূত্র ধরে এগোতে থাকেন।
যোধপুরে আমাদের জন্য জিপ অপেক্ষা করছিল। ঊষর ধুধু মাটি আর ন্যাড়া টিলাপাহাড়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তা। মাঝে মাঝে বালিয়াড়িও চোখে পড়ছিল ফেব্রুয়ারি মাসের বিকেল। ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটানিতেও বেশ শীত করছিল। বারমের পৌঁছুতে রাত আটটা বেজে গেল।
গবেষণাকেন্দ্রের অতিথিভবনে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে এবার যাত্রা শুরু হল উটের পিঠে। আর গাড়ি চলার রাস্তা নেই। সাতটা উটের পিঠে। কর্নেল, আমি গবেষণাকেন্দ্রের দুই বিজ্ঞানী বিনায়ক শর্মা ও রাজকুমার রানা, তাঁবু এবং অন্যান্য সরঞ্জাম। দুটো বাড়তি উট নেওয়া হয়েছে, সঙ্গে যদি কোনো উট অসুস্থ হয়ে পড়ে, তার জন্য।
পাথুরে মাঠে, বালিয়াড়ি, মাঝমাঝে ন্যাড়া পাহাড়, কাঁটাগুল্ম বা কদাচিৎ বাবলাজাতীয় গাছ সারাপথ এই একঘেয়ে দৃশ্য। কোথাও ছাগল ও ভেড়ার পাল চরাচ্ছে ছেলে-মেয়েরা। ওরা যাযাবর। লুনি নদীর যত কাছাকাছি যাচ্ছি তত কিছু গাছপালা, টুকরো সবুজ তৃণাঞ্চল চোখে পড়ছে।
তিরিশ মাইল উত্তর-পূর্বে এগিয়ে বিকেল নাগাদ আমরা সিহৌরি পৌঁছেলুম। রুক্ষ লাল পাথরের টিলার ধারে একটা ছোট্ট গ্রাম। অধিবাসীরা ভীষণ গরিব। পশুপালনই ওদের জীবিকা। একটু দূরে লুনি নদীর চেহারা দেখে হতাশ হলুম। বালি আর পাথরে ভর্তি নদীর খাত। এক ফাঁকে সামান্য একফালি স্রোত এখনও তিরতির করে বইছে। মার্চেই নাকি তা শুকিয়ে যাবে। তখন সিহৌরার একটিমাত্র কুয়োর জলও যাবে শুকিয়ে। নদীর বালিতে গর্ত করে যেটুকু জল জমবে, গ্রামের খেত এবং তাদের পালিত পশুর দল তাই ভরসা করে বর্ষা পর্যন্ত কাটিয়ে দেবে। এমন ভয়ংকর জীবনযাত্রা এখানে!
কুয়োর কাছাকাছি রুক্ষ পাথুরে মাটির ওপর আমাদের ছ-টা তাঁবু খাটানা হল। এক সপ্তাহের খাদ্যদ্রব্য, কয়েক রকমের যন্ত্রপাতি, ওষুধ, রাসায়নিক দ্রব্য পেস্টিসাইডসের স্টক তিনটে তাঁবুতে ঢোকানো হল। একটা তাঁবুতে কর্নেল ও আমি, অন্যটায় বিনায়ক ও রাজকুমার, বাকি তাঁবুতে গবেষণাকেন্দ্রের দুজন কর্মী। উটচালক রক্ষীরা থাকবে খোলা আকাশের নিচে। ওরা বারমের অঞ্চলেরই লোক।
