জ্যোৎস্নার সমুদ্রের আকাশে সেই বিশাল পাখিটাকে ক্রমশ দুরে কুয়াশায় মিলিয়ে যেতে দেখলাম। হালদারমশাই চমকানো গলায় বলে উঠলেন, কী? কী?
কর্নেল হাসলেন। পাখি নয়, হালদারমশাই। হ্যাং গ্লাইডার।
সঙ্গে-সঙ্গে আমার মনে পড়ে গেল, বিজ্ঞানী চন্দ্ৰকান্তের যে একটা হ্যাং গ্লাইডার আছে। কী ভুলো মন আমার। বললাম, কর্নেল, তা হলে মারিয়াম্মা যে ভূতুড়ে পাখির কথা বলছিল–।
আমার কথার ওপর কর্নেল বললেন, ডার্লিং। তুমি সবই বোঝো। তবে দেরিতে। চন্দ্রকান্তবাবু কলকাতা থেকে হ্যাং গ্লাইডারে চেপে এসেছিলেন। এখন ফিরে যাচ্ছেন।
বসন্তবাবু পা বাড়িয়ে বললেন, যাই। ম্যাডানসায়েরের জামাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ওকে ওর শ্বশুরের হিরে ফেরত দিই গে।
কর্নেল বললেন, হিরে উনি ফেরত পেয়েছেন বসন্তবাবু।
কী বললেন? বসন্তবাবু হি-হি হো-হো করে বেজায় হাসতে লাগলেন। হিরে ফেরত পেয়েছে? কী করে পাবে মশাই? এমন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছি, কার সাধ্যি খুঁজে বের করে?
যাকে আপনি প্রমথবাবুর আত্মা বললেন, তিনিই খুঁজে বের করেছেন। ব্যাকওয়াটারের ওখানে একটা মন্দিরের ভেতর আপনি পুঁতে রেখেছিলেন। কালো রঙের একটা ছোট্ট কৌটোতে। তাই না?
সর্বনাশ। বলে বসন্তবাবু দৌড়ে বিচে নামতে থাকলেন।
কর্নেল চেঁচিয়ে বললেন, বরং ম্যাডানসায়েবের জামাই যে-বাংলোতে উঠেছেন, সেখানে চলে যান বসন্তবাবু।
হালদারমশাই এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বললেন, এখানে থাকা ঠিক না, কর্নেল সার। হেভি ক্ষুধা পাইছে। তাছাড়া আমার সন্দেহ হয়। রাজেন অধিকারীর ভূতটা কোথাও ঘাপটি পাইত্যা-বইয়্যা রইছে। পুলিশ অরে ধরতে পারে নাই।
টাম্বোকে চন্দ্রকান্তবাবু লেজার পিস্তলের একটা শটেই ছাই করে দিয়েছেন হালদারমশাই।
অ্যাঁ? কই? কই?
কাল সকালে এসে দেখবেন। চলুন, এবার ফেরা যাক।
কর্নেল আমাদের সোজা নিয়ে গিয়েছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রীমশাইয়ের সেই বাংলোতে। কুসরো অপেক্ষা করছিলেন কর্নেলের জন্য। ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখি, বসন্তবাবু খুশি-খুশি মুখে বসে পা দোলাচ্ছেন এবং মিটিমিটি হাসছেন। আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা ছিল। ডিনার টেবিলে বসে হালদারমশাই খাদ্যে মন দিলেন। কর্নেল বললেন, বসন্তবাবু আমাদের গতরাতে ঢিল ছুঁড়ে ভয় দেখাচ্ছিলেন কেন বলুন তো?
বসন্তবাবু মুরগির ঠ্যাং কামড়ে ধরে বললেন, টিল নয়। ছোটো-ছোটো বালির গোটা।
কিন্তু কেন?
আপনারা আমার কাজে বাগড়া দেবেন ভেবেছিলাম। বুঝলেন না? পুলিশ এতে নাক গলাক, এটা আমার পছন্দ নয়। পুলিশ যদি জানতে পারত, আমার কাছে হিরে আছে, কেলেঙ্কারি হত না? আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে বেদম পিটিয়ে কথা বের করে ছাড়ত। ওরে বাবা! আমি পুলিশ দেখলেই কেটে পড়ি।
আর একটা কথা বসন্তবাবু!
বলুন। আমার মন খুব ভালো হয়ে গেছে। সব কথার জবাব দেব।
আপনি হিরের কথা কী জানতে পেরেছিলেন?
রাজুর কাছে প্রায়ই একটা লোক আসত। দুজনে চুপিচুপি কথা হত। আড়াল থেকে শুনতাম। পরে বুঝলাম, কী সাংঘাতিক চক্রান্ত চলেছে। লোকটা নাকি আমেরিকার কোন সায়েবের কাছে জানতে পেরেছে, কুসরোসায়েবের শ্বশুর কোনও সম্রাটের হিরে কিনেছেন। সেই হিরে চুরির মতলব করেছে ওরা। কী যেন নাম লোকটার? নও… নও… দুচ্ছাই!
কুসরো বললেন, নওরোজিসায়েবের কিউরিয়য়া শপ আছে। বিদেশে তার অনেক চর আছে। তাদেরই কেউ খবরটা দিয়ে থাকবে- ভদ্রলোক আমার শ্বশুরের চেনা লোক ছিলেন। এদিকে আমার শ্বশুরও তত চতুর মানুষ ছিলেন না। মনে হচ্ছে, কোনও কথায় মুখ ফসকে হিরের কথা তিনিও বলে থাকবেন। এমনকী, হিরেটা দেখিয়েও থাকবেন।
বললাম, নওরোজির সঙ্গে কীভাবে রাজেনবাবুর পরিচয় হল?
কর্নেল বললেন, নওরোজির এক ভাই আমেরিকায় ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনেটিক্সের অধ্যাপক। সেখানেই রাজেনবাবু রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন। গত মাসে সেই অধ্যাপক কলকাতা এসেছিলেন। নওরোজি সেই উপলক্ষে পার্টি দেন। রাজেনবাবুও পার্টিতে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। এসব খবর নিয়ে তবে গোপালপুরে ছুটে এসেছিলাম।
বসন্তবাবু বললেন, রাজু বরাবর এইরকম স্বার্থপর।
কর্নেল বললেন, নওরোজি নিশ্চয় জানতেন না, টাম্বো কৃত্রিম মানুষ। টাম্বোকে তাহলে গুলি করতেন না।
বসন্তবাবু বললেন, শয়তান রাজু নও.. নও, দুচ্ছাই! রাজু সেই লোকটাকে একদিন বলেছিল, হিরে চুরি গেছে। কে চুরি করেছে? না- ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট ওই ভূতটা। কাজেই মারো গুলি! দে বডি ফেলে। হি হি হি হি। বডি ফেলতে গিয়ে নিজেরই বডি পড়ে গেল। হো হো হো হো…।
হালদারমশাই এতক্ষণে বললেন, হঃ। বডি পড়া স্বচক্ষে দেখছিলাম। সে ক্কী পড়া।
কর্নেল বললেন, আপনার বডিও পড়ে যেত। জোর বেঁচে গেছেন।
হঃ। বলে হালদারমশাই জলের গ্লাস তুলে নিলেন।
২.০৩ রামগরুড়ের ছানা
কলকাতা থেকে যাত্রা করার আগেই খবরটা পড়া ছিল। বেহালা ফ্লাইং ক্লাবের এক দুঃসাহসী বিমান শিক্ষার্থী ইন্দ্রনীল রায়ের গ্লাইডার কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা একটানা উড়ে পৌঁছোনো অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল।
বিদেশে হ্যাং গ্লাইডারে ওড়াউড়ি এখন রীতিমতো স্পোর্টস। বিশ থেকে তিরিশ ফুট পর্যন্ত একটা করে লম্বাটে ডানা- কতকটা দেখতে গঙ্গাফড়িংয়ের মতো। প্যারাসুট কাপড়ে তৈরি। মধ্যখানে হালকা ধাতুর রড দিয়ে তৈরি একটা সামান্য ফ্রেম। সেটা আঁকড়ে একটানা অতখানি দূরত্ব অতিক্রম করা কি সম্ভব? পথে বেশ কয়েকটা বায়ুস্রোত আড়াআড়ি পেরুতে হবে। তার ওপর ওই বিন্ধ্য পর্বতশ্রেণি। গ্লাইডার তত বেশি উঁচুতে উড়তেও পারে না। অবশ্য ইন্দ্রনীল তার গ্লাইডারে একটা ছোট্ট ইঞ্জিন ও কনট্রোল ব্যবস্থা ফিট করে নিয়েছেন।
