রাজেন অধিকারী ফুঁসে উঠল। তুমিও কম পাপী নও। আমার ল্যাব থেকে হিরে চুরি করে ম্যাডানসায়েবকে চিঠি লিখেছিলে এখানে আসতে। তুমি থাকো ডালে-ডালে, আমি থাকি পাতায়-পাতায়। এবার ম্যাডানসায়েবের জামাইকে হিরে ফেরত দেওয়ার চক্রান্ত করেছ। সে-খবরও আমি রাখি, যাক গে বলো-হিরে কোথায় রেখেছ?
হালদারমশাই বলে উঠলেন, বসন্তবাবু! আপনি ভুল করছেন। হিরে কলকাতায় ম্যাডানসায়েবেরে দিয়া দিলেই পারতেন। এই ট্রাবল হইত না!
রাজেন অধিকারী ঘুরে দাঁড়াল। তবে রে ব্যাটা টিকটিকি! বলে তেমনই হুংকার দিতেই টাম্বো গিয়ে হালদারমশাইয়ের চুল খামচে ধরল। হালদারমশাই আর্তনাদ করলেন।
বসন্তবাবু বললেন, আপনি ভালো বলেছেন মশাই! কলকাতায় হিরে দিলে এই রাজু ব্যাটাচ্ছেলে ঠিক টের পেয়ে যেত। ওর যন্তরমন্তরে সব ধরা পড়ে যেত। সেজন্যেই গোপালপুরে আসতে লিখেছিলাম। আমার চেনা জায়গা। তা আপনাকে দেখছি জ্যান্ত পুঁতেছে? হিহি-হোহো করে একচোট হাসার পর বসন্তবাবু এতক্ষণে আমাকে দেখতে পেলেন। বললেন, মলো ছাই। এ আবার কে? ও রাজু! একে কেন পুঁতলি?
রাজেন অধিকারী তেড়ে এল। চুপ! এই শেষবারের মতো বলছি, বলো হিরে কোথায়?
বসন্তবাবু ভেংচি কেটে বললেন, তোর বাপের হিরে? দাঁড়া তোর বাপের আত্মাকে ডাকি। সে নিজে এসে বলুক, হিরে কার? বলে ঘাড় ঘুরিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকালেন। চাপা গলায় বললেন, রাতবিরেতে তোর বাপ পাখি হয়ে সমুদ্রের ওপর চক্কর দিয়ে বেড়ায়। আমি নিজের চোখে দেখছি। তা জানিস?
রাজেন অধিকারী বলল, তাহলে মরো! টাম্বো! টাম্বো! টাম্বো!
তার হাতে টর্চের মতো একটা জিনিস থেকে নীলচে আলো জ্বলে উঠল। তারপর যা দেখলাম, শিউরে উঠলাম। দানোটা হালদারমশাইয়ের চুল ছেড়ে দিয়ে বসন্তবাবুর সামনে এসে দাঁড়াল এবং পকেট থেকে কী একটা বের করল। সেটা আর কিছু নয়, একটা কালো রঙের ছোটো সাপ। সাপটার লিকলিকে জিভ। বসন্তবাবুর মুখের কাছাকাছি সে সাপটাকে নিয়ে গেল। বসন্তবাবু আর্তনাদ করলেন, প্রমথ! প্রমথ! বাঁচাও!
তিনি সম্ভবত রাজেন অধিকারীর বাবার প্রেতাত্মাকে ডাকার জন্য সমুদ্রের দিকে মুখ ঘোরালেন। তারপরই চেঁচিয়ে উঠলেন, ওই সে আসছে! ওই দ্যাখ রাজু। পাখি হয়ে তোর বাপ উঠে আসছে।
অতিকষ্টে মুখ ঘুরিয়ে দেখি, কী অদ্ভুত। সমুদ্রের আকাশে বিশাল লম্বা ডানাওলা একটা পাখি উঠে আসছে এই বালিয়াড়ির দিকে।
রাজেন অধিকারী পাখিটাকে দেখামাত্র হুংকার দিল। তখন দানোটা এক লাফে বাইরে চলে গেল। নীলচে আলোটা নিভিয়ে রাজেন অধিকারীও বেরোল। বাইরে এক পলকের জন্য চোখ ঝলসানো আলো দেখলাম। সেই আলোয় দেখতে পেলাম, কেউ রাজেন অধিকারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তারপর ধস্তাধস্তি, হাঁকডাক, বালিতে ধুপধুপ শব্দ। জ্যোৎস্নায় অনেক ছায়ামূর্তির ছুটোছুটি।
হালদারমশাই চাপা স্বরে বলে উঠলেন, খাইছে!
সেই সময় বাইরে কর্নেলের সাড়া পেলাম। জয়ন্ত! জয়ন্ত!
চেঁচিয়ে বললাম, এখানে! এখানে!
টর্চের আলো এসে পড়ল আমাদের ওপর। তারপর কর্নেলকে দেখতে পেলাম। বললেন, কী সর্বনাশ! হালদারমশাইকেও পুঁতেছে দেখছি।
হালদারমশাই শ্বাস ছেড়ে বললেন, হঃ!
কয়েকজন পুলিশ ঘরে ঢুকে বাঁধন খুলে দিয়ে বালি সরিয়ে আমাদের ওঠাল। আমি পা ছড়িয়ে বসলাম। হালদারমশাই কিন্তু তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে পা ছোঁড়াছুড়ি করে বললেন, আই অ্যাম অলরাইট। বাট হেভি ক্ষুধা পাইছে।
বসন্তবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, যাই। প্রমথের আত্মাকে দেখা করে আসি।
কর্নেল বললেন, বসন্তবাবু! প্রমথ কে?
ওই শয়তানটা রাজুর বাবা। বড্ড ভাল লোক ছিল মশাই। না, না! যাই দেখা করে আসি। পর-পর দু’বার পাখি হয়ে উড়ে এল আমার সঙ্গে দেখা করতে।
.
বসন্তবাবু বেরিয়ে গেলেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। মাথা কেমন ঝিমঝিম করছে। পা বাড়াতে গেছি, হঠাৎ পায়ের কাছে কর্নেলের টর্চের আলোয় সেই সাপটাকে দেখতে পেলাম। চমকে উঠে সরে গেলাম। কর্নেল সাপটাকে কুড়িয়ে নিয়ে বললেন, এ-ও কিন্তু কৃত্রিম সাপ জয়ন্ত! তবে টাম্বোর মতো নয়। জেনোম থিয়োরির সঙ্গে এটার সম্পর্ক নেই। এটা নেহাত খেলনা সাপ। চলো, বেরোনো যাক।
বাইরে গিয়ে দেখি, পুলিশের দঙ্গল ছায়ামূর্তির মতো বিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। একটা দেওয়ালের আড়াল থেকে সি আই ডি অফিসার সুরঞ্জনবাবু বেরিয়ে এলেন। বললেন, সায়েন্টিস্ট ভদ্রলোকের কাণ্ডকারখানা দেখছিলাম কর্নেল। দিনে-দিনে পৃথিবীটা ওঁরা একেবারে অন্যরকম করে দিচ্ছেন। মাথা ঠিক রাখা কঠিন।
কর্নেল বললেন, চন্দ্রকান্তবাবুর চেয়ে সেরা বিজ্ঞানী এখন আপনাদের হাতে মি. দাস! শিগগির গিয়ে ওঁকে আর্মির কর্নেল সিংহের জিম্মায় রাখার ব্যবস্থা করুন। কিছু বলা যায় না। পুলিশের হাজত ওকে আটকে রাখার মতো শক্ত জায়গা নয়। রাজেন অধিকারী এ-যুগের এক জাদুকর বিজ্ঞানী।
সুরঞ্জনবাবু হন্তদন্ত চলে গেলেন। আমরা সামনে বালির টিলার দিকে যাচ্ছিলাম। টিলার মাথায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। জ্যোৎস্নায় আবছা দেখা যাচ্ছে তাকে। কর্নেল ডাকলেন, বসন্তবাবু!
কোনও সাড়া এল না। কাছে গিয়ে আবার কর্নেল বললেন, বসন্তবাবু। দেখা হল প্রমথবাবুর আত্মার সঙ্গে?
বসন্তবাবু গলার ভেতর বললেন, নাহ। দেরি দেখে প্রমথ উঠে গেল। ওই দেখুন যাচ্ছে।
