এমন ভঙ্গিতে বসেছিলাম, কেউ দেখলে ভাববে, নিছক সমুদ্রদর্শন করছি। প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে বিচের দিক থেকে একটা লোককে উঠে আসতে দেখলাম। প্রথমে তাকে সায়েব ভেবেছিলাম। পরে দেখি খাঁটি সায়েব নয়। তবে কতকটা সায়েব-সায়েব গড়ন। লম্বা নাকটা দেখার মতো। পরনে জিনস-জ্যাকেট। মাথায় রোদ-বাঁচানো টুপি। বয়স আন্দাজ ত্রিশ-বত্রিশ মনে হল।
লোকটা সেই ঘরের কাছে এসে চাপা গলায় কাকে ডাকল, হ্যালো।
বারকতক ডাকার পর এদিক-ওদিক তাকিয়ে সে ঘরের ভেতর উঁকি দিল। তারপর ফোকর দিয়ে ঢুকে পড়ল।
আমি আর চুপ করে বসে থাকতে পারলাম না। হন্তদন্ত ছুটে গিয়ে সেই ঘরের ফোকরের সামনে দাঁড়ালাম। লোকটা চমকে উঠেছিল। সামলে নিয়ে ইংরেজিতে বলল, এই পাথরের বাড়িগুলো ভারি অদ্ভুত। কে তৈরি করেছিল জানেন কি?
চার্জ করার ভঙ্গিতে বললাম, কে আপনি?
ট্যুরিস্ট, আশা করি আপনিও ট্যুরিস্ট?
তার কথায় কান না করে বললাম, ওখানে একটা চিঠি ছিল, চিঠিটা নিতেই কি আপনি এসেছেন?
চিঠি! কী বলছেন আপনি?
ঠিক বলছি। চিঠিটা আমি দেখেছি। আপনি সেটা নিয়েছেন। এবার বলুন কে আপনি?
পেছন থেকে কর্নেলের কথা ভেসে এল। সাবধান ডার্লিং! সেই দানোর কথা ভুলো যেয়ো না।
শোনামাত্র ভ্যাবাচাকা খেয়ে একলাফে লোকটার কান ধরতে গেলাম। লোকটাও একলাফে সরে গেল। কর্নেল এসে অট্টহাসি হেসে বললেন, সেমসাইড হয়ে যাচ্ছে জয়ন্ত! আলাপ করিয়ে দিই, ইনি ম্যাডানসায়েবের জামাই মি. কুসরো। আর মি. কুসরো! আমার স্নেহভাজন বন্ধু সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী মাঝে-মাঝে অতুৎসাহী হয়ে পড়ে। আসলে এটা ওর ভয় পাওয়ারই প্রতিক্রিয়া!
কুসরো হেসে ফেললেন। সত্যি বলতে কি, আমি ভয় পেয়েছিলাম। যাই হোক, সেই ভদ্রলোক আমার জন্য একটি চিঠি রেখে গেছেন। এই দেখুন।
কর্নেল চিঠিটা নিয়ে চোখ বুলিয়ে বললেন, এটা আমার কাছে থাক। রাত নটা নাগাদ ওশান হাউসে আমার সঙ্গে দেখা করবেন। তারপর সব ব্যবস্থা হবে। আপনি বরং নীচের দিকে না গিয়ে সদর রাস্তা ধরে বাংলোয় যান। সাবধানে যাবেন।
কুসরো তখনই ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে চলে গেলেন। বললাম, শ্বশুর চিঠির ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এবার জামাইকেও চিঠির ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। ব্যাপারটা এই তো?
কর্নেল সে কথার জবাব না দিয়ে বললেন, তখন বসন্তবাবুকে কোথায় হারিয়ে ফেললে?
রাস্তার ওধারে। তো মি. কুসরো কি শ্বশুরের ডেডবডি নিতে এসেছেন?
হ্যাঁ। ওঁর বাবার বন্ধু এক প্রাক্তন মন্ত্রীমশাই। তার সাহায্যে আর্মির হেলিকপ্টারে ম্যাডানসায়েবের বডি সকালেই কলকাতা পাঠনো হয়েছে। কুসরো যাননি। মানে, কলকাতায় উনি যখন আমাকে ফোন করেন, তখন আমি ওঁকে একটা দিন থেকে যেতে বলেছিলাম। তবে জানতাম না, কুসরো মন্ত্রীমশাইয়ের বাংলোয় উঠেছেন। উঠে অবশ্য ভালোই করেছেন। কারণ আমাদের প্রিয় বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত চৌধুরীর সান্নিধ্যে থাকলে উনি নিরাপদ।
অবাক হয়ে বললাম, ওই বাংলোতে চন্দ্রকান্তবাবুও উঠেছেন নাকি?
হ্যাঁ। চলো, চন্দ্রকান্তবাবুকে ওশান হাউসে বসিয়ে রেখে এসেছি।
বুঝলাম, আমি যখন বসন্তবাবুর পেছনে ছুটছিলাম, তখন কর্নেল আমাকে ফেলে সেই বাংলোয় চলে গিয়েছিলেন। তাই ওঁকে আর দেখতে পাইনি। কিন্তু হঠাৎ ওভাবে চলে না গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারতেন। কেন করেন নি? এমনকী ঘটেছিল যে, প্রাক্তন মন্ত্রীমশাইয়ের বাংলোর দিকে ছুটে গিয়েছিলেন?
যেতে-যেতে কথাটা তুললাম। কর্নেল বললেন, বাইনোকুলারে দেখেছিলাম, বিজ্ঞানী ভদ্রলোক ওঁর ডিটেক্টর যন্ত্র নিয়ে ব্যাকওয়াটারের ওদিকে ঘুরঘুর করছেন। কাজেই ওঁর কাছে না গিয়ে পারলাম না। হ্যাঁ, গত রাতে দানোটা বাংলোয় ঢুকতে পারেনি। বিজ্ঞানীর কারবার! মারাত্মক কী অদৃশ্য রশ্মি দিয়ে নাকি বাংলোটা ঘিরে রেখেছিলেন।
কিন্তু হালদারমশাইয়ের কী হল?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, জানি না।
ওশান হাউসের দোতলায় আমাদের স্যুটে ঢুকে দেখি, বিজ্ঞানীপ্রবর ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছেন। কারণ ওঁর নাক ডাকছে। আমি যেই চন্দ্রকান্তবাবু বলে ডেকেছি, আমনিই তড়াক করে সোজা হলেন এবং বললেন, হিরে আছে! শিয়োর!
হাসতে-হাসতে বললাম, স্বপ্ন দেখছিলেন বুঝি?
চন্দ্রকান্ত চোখ কচলে বললেন, সরি! সারারাত ঘুমোইনি। ঘুমোনো দরকার। বলে আমার দিকে তাকালেন। হ্যালো জয়ন্তবাবু! আসুন, আসুন। আপনার কথা ভাবতে-ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম
কেন বলুন তো?
হিরেটা উদ্ধার হয়ে গেলে আপনাকে একটা রোমহর্ষক স্টোরি দেব। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় বেরোলে হইচই পড়ে যাবে। আমার মাথা তো গুলিয়ে গেছে মশাই। ভাবা যায়? হিরেতে এক ধরনের রশ্মি আছে, যা প্রাণীর দেহকোষের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। হিরে ঠিক যেভাবে কাচ কাটতে পারে, সেইভাবে হিরের সেই বিস্ময়কর রশ্মিপ্রবাহ ডি এন এ অণুতে কেটেকুটে– চন্দ্রকান্ত হঠাৎ কথা থামিয়ে ফিক করে হাসলেন।
কর্নেল আতশকাচ দিয়ে চিঠিটা দেখতে ব্যস্ত। আমাদের কথা দিকে ওঁর কান নেই।
বললাম, চন্দ্রকান্তবাবু! আপনি বললেন, হিরে আছে। কোথায় আছে?
চন্দ্রকান্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, এখানেই।
এখানেই মানে? গোপালপুর-অন-সি-তে?
শিয়োর। ওই ব্যাকওয়াটারের কাছাকাছি কোথাও লুকোনো আছে। ডিটেক্টরে সাড়া পেয়েছি কিন্তু ঠিক জায়গাটা খুঁজে বের করতে পারছি না, এটাই সমস্যা।
