কর্নেল বাইনোকুলারে ডান দিকটা দেখে এগিয়ে গেলেন। বললেন, এই যে! এখানে কেউ, দাঁড়িয়েছিল। মাই গুডনেস! সে একলাফে প্রায় তিরিশ ফুট নীচে পড়েছে। ওই দেখুন গভীর দুটো ছাপ কর্নেল নেমে গেলেন হন্তদন্ত। আবার খুঁটিয়ে দেখে বললেন, ডেডবডির দূরত্ব এখান থেকে আরও তিরিশ ফুট। জোয়ারের জল ওখান পর্যন্ত আসে না। তার মানে, সে দ্বিতীয় লাফে ম্যাডানসায়েবকে ধরে ফেলেছে। অস্বাভাবিক লং জাম্প!
সুখরঞ্জনবাবু ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলে উঠলেন, অসম্ভব! একেবারে অসম্ভব।
.
০৫.
রাজেন অধিকারীর দানোটার কথা বলার জন্য উশখুশ করছিলাম। কিন্তু কর্নেলের হাবভাব আঁচ করেছি, পুলিশকে তিনি হাতের তাস দেখাতে চান না। অবশ্য বরাবর তার এই স্বভাব।
সুখরঞ্জনবাবু বললেন, কর্নেল! আপনার এই থিয়োরিটা কিন্তু মানতে পারছি না। যে তিরিশ ফুট লং জাম্প দিতে পারে, সে অলিম্পিকের মেডেল জেতা খেলোয়াড়। আপনি কি বলতে চাইছেন খুনি কোনও খেলোয়াড়?
কর্নেল বাইনোকুলারে দূরে বিচের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন দেখছিলেন। বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, চলুন ফেরা যাক। তারপরে হাঁটতে-হাঁটতে ফের বললেন, খেলোয়াড় বইকি। মি. দাস, আমরা এক সাংঘাতিক খেলোয়াড়ের প্রতিদ্বন্দ্বী।
সুখরঞ্জনবাবু গম্ভীর হয়ে গেলেন। একটু পরে ঘড়ি দেখে বললেন, আমাকে এখনই এক জায়গায় যেতে হবে। পরে যোগাযোগ করব’খন।
উনি চলে যাওয়ার পর আমরা বিচ ধরে হাঁটছিলাম। ডাইনে সমুদ্রে এখানে-ওখানে কালো-কালো ছোটোবড়ো পাথর দেখা যাচ্ছে। ঢেউয়ে নাকানি-চোবানি খাচ্ছে। মুহুর্মুহু ব্রেকারের গর্জনে কানে তালা ধরে যাচ্ছে। চাপ চাপ ফেনা ছড়িয়ে পড়ছে। বিচের মাথার পাথরে তৈরি ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপ। প্রকাণ্ড সব পাথরের চাঙড় বিচে এসে পড়েছে। একটা ভাঙা ঘরে জানালায় কাউকে উঁকি মারতে দেখলাম। গোলগাল মুখ। মুখে কেমন একটা হাসি। হঠাৎ মুখটা চেনা মনে হল। তখনই মনে পড়ে গেল, রাজেনবাবু বাড়ির দোতলার জানালায় এই মুখটাই দেখছিলাম। দ্রুত বললাম, কর্নেল! কর্নেল! ওই দেখুন সেই বসন্তবাবু। রাজেনবাবুর দাদা।
কর্নেল বললেন, দেখেছি। ওঁর সঙ্গে আলাপ করতে চাও কি?
ওঁর কাছে জানা দরকার, উনি এখানে কেন এসেছেন।
চলে যাও তা হলে।
আপনিও চলুন!
কর্নেল হাসলেন। ডার্লিং! আমি পাগলকে বড্ড ভয় করি, সে তো তুমি জানো! তুমি ইচ্ছে করলে ওঁর সঙ্গে আলাপ করতে পারো। যাও, চলে যাও!
তীব্র কৌতূহলের চাপে পড়েই পাথরের চাঙড় বেয়ে উঠতে শুরু করলাম। ওপরে উঠে সেই ভাঙা পাথুরে ঘরটার দিকে হন্তদন্ত এগিয়ে গেলাম। কিন্তু জানলায় দেখা সেই মুখটা নেই।
ভেতরে উঁকি মেরে কাউকে দেখতে পেলাম না। ঘরগুলো বিপজ্জনক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। একটা ফাঁকা জায়গা দিয়ে এগিয়ে চারদিকে তন্নতন্ন খুঁজে আর বসন্তবাবুর পাত্তা পেলাম না। সবখানে বালির স্তূপ। পোড়া পোড় ঘরগুলোর মেঝেও বালিতে ভর্তি। দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে ওধারে পিচ-রাস্তা দেখা যাচ্ছিল। রাস্তায় গিয়ে একপলকের জন্য দেখলাম, বসন্তবাবু ওপাশের একটা পোড়ো জমির পাশে ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঢুকে গেলেন। পাগলের পেছনে দৌড়োনোর মানে হয় না।
বিচে ফিরে গিয়ে কর্নেলকেও দেখতে পেলাম না। অদ্ভুত মানুষ তো!
খানিকটা হেঁটে জেলেদের ভেলানৌকোর কাছে পৌঁছোলাম। উঠে গিয়ে ওশান হাউস চোখে পড়ল। সেখানে গিয়ে দেখি নীচের বারান্দায় বসে স্মিথসায়েব হোমিয়োপ্যাথির ওষুধ বিলোচ্ছেন। একতঙ্গল গরিবগুরবো চেহারার রুগি দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে স্মিথ-সায়েব সম্ভাষণ করলেন, গুড মর্নিং?
মর্নিং মি. স্মিথ! কর্নেলসায়েব কি ফিরেছেন?
ফিরলে দেখতে পেতাম।
মি. হালদার?
স্মিথ উদ্বিগ্নমুখে বললেন, না। আমি চিন্তিত মি. চৌধুরী। পুলিশকে খবর দিয়েছি।
আমার ঘরের চাবি কর্নেলের কাছে। ডুপ্লিকেট চাবি নিশ্চয় স্মিথসায়েবের কাছে আছে। কিন্তু ঘরে বসে থাকার মানে হয় না। আবার বিচে ফিরে গেলাম। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে চমৎকার সময় কাটানো যায়। এদিকটা একেবারে খাঁ খাঁ জনহীন। জেলেবস্তির ছোট্ট ছেলেমেয়ের দঙ্গল খানিকটা দূরে সমুদ্রে নেমেছ। ওটাই ওদের খেলা। কেউ কেউ জলের ভেতর উঁচিয়ে থাকা পাথরেও উঠেছে। ওদের ভয় করছে না?
নিশ্চয় করছে না। সমুদ্র ওদের আপনজন। সমুদ্র ওদের লড়াই করে বেঁচে থাকতে শেখায়। ওরা যেন সমুদ্রের পাঠশালার পড়ুয়া।
কতক্ষণ পরে আনমনে ডানদিকে মুঘল আমলের ভাঙা কুঠিবাড়িগুলোর দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল একটা মাথা উঁকি মেরে এগোচ্ছে। স্তূপের আড়াল দিয়ে কেউ গুঁড়ি মেরে কোথাও চলেছে। একটু পরে আর তাকে দেখা গেল না। মরিয়া হয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বসন্তবাবু নন তো?
বালি ও ধ্বংসস্তূপ এবং ভাঙা ঘরের ফোকর গলিয়ে সাবধানে গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা ঘরের বালিতে পড়ে থাকা একটা কাগজের চিরকুট দেখতে পেলাম। চিরকুটটা পড়ে নেই আসলে। একটুকরো পাথর চাপা দেওয়া আছে এক কোনায়।
চিরকুটটা তুলে দেখি, আঁকাবাঁকা ইংরেজি হরফে যা লেখা আছে, তার মানে দাঁড়ায় :
আজ রাত দশটায় এখানে আসুন। দেখা হবে।
হালদারমশাইয়ের ভাষায় প্রচুর রহস্য। ঝটপট ভেবে নিয়ে চিঠিটা সেই অবস্থায় রেখে দিলাম। তারপর তেমনই গুঁড়ি মেরে এগিয়ে খানিকটা তফাতে একটা ভাঙা দেওয়ালের আড়ালে বসে রইলাম। এখান থেকে ওই ঘর এবং নীচের বিচ মোটামুটি চোখে পড়ে।
