আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম। একটু পরে বললাম, হিরেটা এখানে এল কী করে? আনল কে? কেনই বা আনল?
চন্দ্রকান্ত চিবুকের দাড়ি খুঁটতে-খুঁটতে বললেন, তা জানি না মশাই! কর্নেল ওসব রহস্য জানেন বলেই আমার ধারণা।
কর্নেল চিঠিটা পকেটস্থ করে বললেন, চন্দ্রকান্তবাবু! মি. কুসরো বাংলোয় ফিরে গেছেন। লাঞ্চের সময় হয়ে এল। উনি আপনার জন্য অপেক্ষা করবেন।
বিজ্ঞানী তখনই উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, হ্যাঁ চলি! আমার একটা লম্বা ঘুমও দরকার।
উনি চলে গেলে বললাম, প্রাক্তন মন্ত্রী ভদ্রলোক কি চন্দ্রকান্তবাবুর পরিচিত?
পরিচিত না হলে চন্দ্রকান্তবাবু ওখানে উঠবেন কেন? বাংলোটা বেশ বড়ো। অনেক ঘর। কাজেই প্রাক্তন মন্ত্রীমশাইয়ের পক্ষে তার একাধিক প্রিয়জনকে ঠাঁই দেওয়ার অসুবিধে নেই। কেয়ারটেকার গোমস তার প্রিয়জনদের সেবার জন্য বহাল রয়েছে। বলে কর্নেল উঠলেন। তুমি কি স্নান করবে? আমি বলি, বরং সমুদ্রে স্নান করে এসো। স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো।
আঁতকে উঠে বললাম, মাথাখারাপ? এখানকার সমুদ্র মানুষখেকো। সবসময় হাউমাউখাঁউ করে চ্যাঁচাচ্ছে। জলের ভেতর পাথরগুলো যেন সমুদ্রের দাঁত। বুঝলেন তো? পেলেই পাথরের দাঁতে চিবিয়ে গিলে ফেলবে।
তা হলে সুইচ টিপে মারিয়াম্মাকে ডাকো। গরম জল করে দেবে। আমি তো সপ্তাহে একদিন স্নান করি। আজ আমার স্নানের দিন নয়।
দুপুরের খাওয়ার পর একটু ঘুমিয়ে নেওয়া আমার অভ্যাস। পুরোনো বাংলায় একে বলে ভাতঘুম। কিন্তু কর্নেল বাদ সাধলেন। বললেন, এখনই মিলিটারির জিপ আসবে। তৈরি থাকো।
মনে পড়ে গেল, এখানে সেনাবাহিনীর একটা ঘাঁটি আছে। ঢেঁকি নাকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এখানে এসেছেন একটা রহস্যের সমাধনে। কিন্তু এসেই কখন সেনাবাহিনীর কোনও স্নেহভাজন কর্তাব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলেছেন দেখা যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পরে মিলিটারি জিপে আমরা যেখানে পৌঁছোলাম, সেটা উঁচুতলার অফিসারদের কোয়ার্টার এলাকা। বাংলোবাড়ি এবং সুদৃশ্য লন, ফুলবাগিচা। একটা বাংলোর লনে ঘাসের ওপর চেয়ারটেবিল পেতে একজন শিক সামরিক অফিসার পাইপ টানছিলেন। কর্নেলকে দেখে এগিয়ে এসে সম্ভাষণ করলেন। কর্নেল পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইনিও এক কর্নেল। কর্নেল পরমজিৎ সিং।
পরমজিৎ বললেন, পুরোনো ক্যানটিং-রেকর্ডে আপনার দেওয়া নামটা পাওয়া গেছে। হ্যাঁ, ভদ্রলোক সোলজার্স ক্যানটিনে ফুড সাপ্লায়ার ছিলেন।
কর্নেল বললেন, ওশান হাউসের মি. মিথের কাছে কথায়-কথায় জানতে পারি, এই নামের ভদ্রলোক একসময় এখানে ছিলেন। ফুড কনট্রাক্টরি করতেন। ধন্যবাদ কর্নেল সিং। অসংখ্য ধন্যবাদ!
বেয়ারা কফি রেখে গেল। কফি খেতে-খেতে পরমজিৎ একটু হেসে বললেন, কিন্তু এবার যে রহস্যটা জানতে ইচ্ছা করছে কর্নেল সরকার? বুঝতে পেরেছি আপনার এবারকার গোপালপুর–অন-সি-তে আসার উদ্দেশ্য সেই বিরল প্রজাতির জগন্নাথ প্রজাপতি ধরা নয়, আমাদের একজন প্রাক্তন ফুড সাপ্লায়ারকে ধরা। কিন্তু রেকর্ডে ওঁর বিরুদ্ধে তো কিছুই নেই। অসুস্থতার জন্য কারবার গুটিয়ে কলকাতা ফিরে যান। উনি কি সেই জুয়েলার ম্যাডানসায়েবের মার্ডার কেসে জড়িয়ে পড়েছেন?
কর্নেল জোরে মাথা নাড়লেন।না, না! উনি অত্যন্ত সদাশয় পরোপকারী মানুষ।
তা হলে ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন, শুনি।
যথাসময়ে জানাব।
এরপর দু জনে সামরিক বিষয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। আলাপ এবং কফি খাওয়া শেষ হলে কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, চলি কর্নেল সিং! পরে দেখা হবে। একটু তাড়া আছে।
কর্নেলের নির্দেশে এবার মিলিটারি জিপ আমাদের লাইট হাউসের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়ে চলে গেল। আমরা বস্তি এলাকার ভেতর দিয়ে একটা নীচু জায়গায় নেমে গেলাম। বললাম, কোথায় যাচ্ছি?
কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে বালির টিলাগুলো দেখে নিয়ে বললেন, চলো তো!
যেতে-যেতে বললাম, সেই ফুট সাপ্লায়ার ভদ্রলোক কে?
বসন্ত অধিকারী।
চমকে উঠে বললাম, অ্যাঁ?
হ্যাঁ। কর্নেল হাসলেন। বসন্তবাবুকে ঠিক বদ্ধ পাগল বলা চলে না। তবে মাথায় একটু গন্ডগোল ঘটেছে, সেটা ঠিকই। এই গোপালপুর-অন-সির প্রত্যেকটি ইঞ্চি ওঁর নখদর্পণে। ডার্লিং! কাল রাত্তিরে উনিই ভূত হয়ে আমাদের ঢিল ছুঁড়ছিলেন। আমুদে চরিত্রের মানুষ। মজা করার সুযোগ পেলে ছাড়তে চান না।
বালির টিলার কাছে পৌঁছে বললাম, কিন্তু আমরা যাচ্ছিটা কোন চুলোয়?
ধৈর্য ধরো জয়ন্ত! বলে কর্নেল টিলায় উঠতে থাকলেন। ক্রমশ সমুদ্রের গর্জন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কিছুক্ষণ পরে সমুদ্র চোখে পড়ল। চুড়োয় ওঠার পর বাইনোকুলারের বাঁ দিকে কিছু দেখে কর্নেল বললেন, ওই যে দেখছ একটা হোটেল। তুমি এখানে বসে লক্ষ রাখো। যদি দ্যাখো, শেরোয়ানিচুস্ত-টুপিপরা কোনও মুসলিম ভদ্রলোক এবং তার সঙ্গী বিচে নামছেন, তুমি গিয়ে ওঁদের সঙ্গে ভাব জমাবে। যেভাবে হোক, কথায়-কথায় ওঁদের আটকে রাখবে। আমি সেই সুযোগে হোটেলে ঢুকে স্যুটে হানা দেব।
কর্নেল হনহন করে সোজা এগিয়ে গেলেন। তারপর অদৃশ্য হলেন। হতবুদ্ধি হয়ে বসে রইলাম। শীতের বেলা পড়ে আসছিল। বসে আছি তো আছি। কতক্ষণ পরে দেখি, সেই মুসলিম ভদ্রলোক এবং তার সঙ্গী কখন আমার ঠিক নীচে বিচের ওপর চলে এসেছেন। দু জনে বিচ ধরে দক্ষিণে এগোচ্ছেন। তবে হাঁটার গতি বেশ দ্রুত।
