আমাদের হালদারমশাইয়ের খবর নিয়েছেন?
আজ দুপুরে থানায় এসেছিলেন। আপনি আসছেন কি না জানতেই এসেছিলেন। কিন্তু উনি তো ওশান হাউসেই আছেন?
আছেন। তবে দেখা হয়নি। ওঁর সম্পর্কে আমার দুর্ভাবনা আছে, মি. দাস! খুব অ্যাডভেঞ্চার প্রবণ মানুষ। কোনও বিপদে না পড়েন?
সুখরঞ্জনবাবু হাসতে হাসতে বললেন, কথাবার্তা হাবভাবেই সেটা বুঝেছি। আমাকে পরামর্শ দিয়ে গেছেন, রিটায়ার করেই যেন কলকাতা চলে যাই এবং ওঁর প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিতে ঢুকি।
সুখরঞ্জনবাবু চলে গেলেন। এবার কর্নেল অন্য রাস্তায় এগোলেন। এটা পিচমোড়া সুন্দর রাস্তা। দু-ধারে ল্যাম্পপোস্ট। কর্নেল বললেন, ওই রাস্তাটা শর্টকাট ছিল। এই রাস্তায় ওশান হাউস অনেকটা দূর। কিন্তু উপায় নেই ডার্লিং! এই শীতের রাতে ভূতের ঢিল খেতে আমার আপত্তি আছে।
বললাম, ভূত-টুত নয়। রাজেনবাবু সেই দানোকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন! আমাদের ছাই করে দিতে পারেন।
আঁতকে উঠে বললাম, সর্বনাশ! তা হলে বড্ড বেশি ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে যে?
কর্নেল হাসলেন। তা হচ্ছে। চিন্তা করো, ম্যাডানসায়েবের বাড়ির মাটির তলার ঘরে লুকোনো ইস্পাতের ভল্ট গলিয়ে হিরে চুরি! তাছাড়া লেসারঅস্ত্র দূর থেকে প্রয়োগ করা যায়। দানোটা তোমাকে কানমলার সুযোগই দেবে না।
হেসে ফেললাম। ভ্যাট! হেঁয়ালি করা আর ভয় দেখানো আপনার স্বভাব।
হঠাৎ কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে চাপা স্বরে বললেন, স্বভাব কী বলছ জয়ন্ত! ওউ দ্যাখো, গাছের আড়ালে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। কুইক! আমরাও লুকিয়ে পড়ি।
রাস্তার দু-ধারে গাছ এবং ঝোপঝাড়। মাঝে-মাঝে একটা করে বাংলোবাড়ি। কর্নেল আমাকে টেনে একটা ঝোপের আড়ালে নিয়ে গেলেন। গুঁড়ি মেরে কিছুক্ষণ বসে রইলাম দুজনে। আমি কিন্তু কাউকে দেখতে পাইনি।
এক সময় কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তেমনই চাপা স্বরে বললেন, চলো!
রাস্তায় গিয়ে বললাম, কোথায় লোক দেখলেন?
কর্নেল বললেন, ওই দ্যাখো, চলে যাচ্ছে!
আন্দাজ তিরিশ মিটার দূরে রাস্তার বাঁকে একটা আবছা মূর্তি সদ্য মিলিয়ে যাচ্ছে। হন্তদন্ত হেঁটে বাঁকে পৌঁছে দেখি, আবছা মৃর্তিটা যেন হাঁটছে না। রাস্তার ওপর ভেসে যাচ্ছে।
সে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেলে কর্নেল বললেন, কপালে দুর্ভোগ আছে ডার্লিং! আবার বালি আর জঙ্গল ভাঙতে হবে। একটা বালির টিলা ডিঙোতেও হবে। এসো।
পা বাড়িয়ে বললাম, ও কে?
সেই দানোটা বলেই মনে হল। হুঁ, তুমি ঠিকই বলেছিলে। বড্ড বেশি ঝুঁকি নিয়েছিলাম। তবে ঝুঁকি নেওয়ার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। ম্যাডানসায়েবকে মেরে রাজেন অধিকারী গোপালপুর-অন-সি ছেড়ে চলে যায়নি এটা জানা গেল। কিন্তু কেন যায়নি, সেটাই রহস্য। এটা জানা গেলেই রহস্যের সমাধান হবে। এমনকী, ইয়াজদার্গিদের হিরেও সম্ভবত উদ্ধার করতে পারব।
বালিয়াড়ি, জঙ্গল এবং একটা আস্ত বালির পাহাড় ডিঙিয়ে সমুদ্রের বিচে পৌঁছোতে ঘণ্টাখানেক লেগে গেল। তারপর ওশান হাউসে যখন পৌঁছোলাম, তখন আমার অবস্থা শোচনীয়। পা নাড়তেই যন্ত্রণা কটকট করে উঠছে।
হালদারমশাইয়ের স্যুটে তেমনই তালা আঁটা। ফেরেননি। কোনওরকমে জুতো খুলে বিছানায় গড়িয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাঙল কর্নেলের ডাকে। অভ্যাসমতো প্রাতভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। মুচকি হেসে বললেন, যেভাবে ঘুমোচ্ছিলে, দানোটা এসে তোমার ঘাড় মটকাবার চমৎকার সুযোগ পেত।
বললাম, আপনি যেভাবে মর্নিংওয়াকে বেরিয়েছিলেন, আপনারও ঘাড় মটকানোর সুযোগ ছিল।
দেখা যাচ্ছে, সে এসব সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে না।
কিন্তু গত রাতে সে গাছের আড়ালে ওত পেতে দাঁড়িয়েছিল!
কর্নেল প্রজাপতি ধরা জাল ঝেড়েমুছে গুটিয়ে রাখছিলেন। বললেন, আমাদের জন্য ওত পাততে যায়নি। জায়গাটা দেখে এলাম। ওড়িশার এক প্রাক্তন মন্ত্রীর বাংলোবাড়ির কাছে সে দাঁড়িয়েছিল। ওই বাড়িতে এমনই কেউ আছে, যার ঘাড় মটকাতে গিয়ে থাকবে। কোনও কারণে সে সুযোগ পায়নি। তাই তাকে রাজেন অধিকারী সরিয়ে নিয়েছে, কিংবা সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। হ্যাঁ- রিমোট কনট্রোলের সাহায্যেই।
সায় দিয়ে বললাম, ঠিক বলেছেন। দানোটা গুলতির বেগে যেন ভেসে যাচ্ছিল।
বাথরুম সেরে এসে দেখি, মারিয়াম্মা ব্রেকফাস্ট এনেছে। খেতে বসে কর্নেল বললেন, বাংলোবাড়িটার দরজায় তালা। পরে খোঁজ নেব, কে আছে ওখানে। প্রাক্তন মন্ত্রী ভদ্রলোক কদাচিৎ আসেন শুনলাম। এলে ওঁর লোকজনও সঙ্গে থাকে। কেউ নেই। সম্ভবত ওঁর কোনও পরিচিত লোক এসে থাকবে। তবে সে যে-ই হোক, তাকে সাবধান করে দেওয়া উচিত।
হালদারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল এতক্ষণে। বললাম, হালদারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে আপনার?
কর্নেল গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়লেন। তখনই উঠে গিয়ে দেখে এলাম, ওঁর স্যুটের দরজায় তেমনই তালা আঁটা। অজ্ঞাত ত্রাসে বুকটা ধড়াস করে উঠল।
কিছুক্ষণ পরে সি আই ডি ইনস্পেকটার সুরঞ্জনবাবু এসে গেলেন। আমরা সামনের বালিয়াড়ি পেরিয়ে গেলাম। বিচে তত কিছু ভিড় নেই। বিচ ধবে প্রায় আধ কিমিটাক হাঁটার পর লাইটহাউসে ছাড়িয়ে গিয়ে বালির একটা টিলার কাছে পৌঁছোলাম। সুরঞ্জনবাবু দেখিয়ে দিলেন, কোথায় ম্যাডানসায়েবের মৃতদেহ পড়ে ছিল।
কর্নেল বাইনোকুলারে বালির বিশাল টিলাগুলো দেখছিলেন। হঠাৎ হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন। তারপর টিলা বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। আমরা ওঁকে অনুসরণ করলাম। টিলার মাথায় উঠে কর্নেল বললেন, ম্যাডানসায়েবের জুতোর ছাপ কিনা জানি না। তবে ছাপগুলো লক্ষ্য করুন মি. দাস! পশ্চিমদিকের ঢাল থেকেই ছাপগুলো উঠে এসেছে। ওই দেখুন। স্বাভাবিক চড়াইয়ে ওঠার ছাপ। ওদিকে বালিটা জমাট। এই টিলার মাথায় আসার পর বিচের দিকে নেমে যাওয়া ছাপগুলো দেখুন। বিচের দিকটা ঢালু। বালি নরম। ক্রমশ স্টেপিংয়ের দূরত্ব বেড়েছে। ছাপও গম্ভীর হয়েছে। বাঁ দিকে কোনাকুনি নেমে গেছে ছাপগুলো। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ভদ্রলোক দৌড়ে নেমেছিলেন। কিন্তু বাঁ দিকে কোনাকুনি কেন? চুড়োয় এসে নীচে বাঁদিকে কি কাউকে দেখতে পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন?
