বাঁদিকে বালিয়াড়িতে কালো লম্বাটে জিনিসগুলো দেখেই বুঝলাম জেলেদের ভেলানৌকো। সেখানে আবছা একটা মূর্তি দেখতে পেলাম। এত রাতে সামুদ্রিক শীতের হাওয়া খেতে কে বেরোল কে জানে!
একটু পরে মূর্তিটা সটান এসে এই বাড়ির নীচের রাস্তায় দাঁড়াল। চেঁচিয়ে বললাম, হালদারমশাই নাকি?
তখনই ছায়ামূর্তিটা বাঁ দিকের রাস্তায় চলে গেল। তারপর একেবারে নিপাত্তা। ব্যাপারটা সন্দেহজনক। ঘরে ঢুকে দেখি, কর্নেল উঠে দাঁড়িয়েছেন। আমি কিছু বলার আগেই বললেন, চলো বেরোনো যাক।
দরজায় তালা এঁটে আমরা নেমে এলাম। রাস্তায় পৌঁছে সন্দেহজনক লোকটার কথা বললাম। কর্নেল কোনও মন্তব্য করলেন না। খুব ভয়ে ভয়ে হাঁটছিলাম। কখন কোথায় দানোটা এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে, বলা যায় না। রাস্তা খাঁ খাঁ, জনহীন। ল্যাম্পপোস্টগুলো দূরে-দূরে। তাই কোথাও কোথাও জ্যোৎস্না-কুয়াশা-আঁধার মিলেমিশে আছে।
প্রায় মিনিট কুড়ি হাঁটার পর বললাম, আমরা যাচ্ছিটা কোথায়?
কর্নেল সামনে আঙুল তুলে বললেন, ওই যে আলো জুগজুগ করেছ, ওখানে।
যেখানে পৌঁছেছি, সেখানটা কাঁচা রাস্তা। বালিতে ভর্তি। দু-ধারে ঝোপঝাড়। কিছু উঁচু গাছ কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেলের হাতে টর্চ আছে। কখনও পায়ের সামনে আলো ফেলছে। হঠাৎ একটা ছোট্ট ঢিল এসে আমার গায়ে লাগল। ভীষণ চমকে উঠে বললাম, কর্নেল! কে ঢিল ছুঁড়ছে।
কর্নেল বললেন, ভূত! চলে এসো।
কী আশ্চর্য! সত্যি ঢিল ছুঁড়ল যে!
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আবার পর-পর কয়েকটা ছোট্ট ঢিল এসে পড়ল। কর্নেল টর্চের আলো ফেলামাত্র ঢিল ছোঁড়া বন্ধ হল। কেউ কোথাও নেই। অথচ কে ঢিল ছুঁড়ছে রাতদুপুরে? কর্নেল চারদিকে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে চাপা স্বরে বললেন, দৌড়োতে হবে। কুইক!
কর্নেল সত্যি দৌড়োতে শুরু করলেন। আমিও ভ্যাবাচাকা খেয়েও ওঁকে অনুসরণ করলাম। এই সময় পেছনে কোথাও খিখিখিখি… হিহিহিহি… হোহোহোহো…এই ধরনের বিকট হাসি শোনা গেল।
কিছুদূর দৌড়ে গিয়ে কর্নেল দাঁড়িয়ে গেলেন। বললাম, কী অদ্ভুত–
ভূত! কর্নেল হাঁসফাঁস করে বললেন, রোসো! মিনিট দু-তিন জিরিয়ে নিই। বাপস! বালিতে দৌড়োনো সহজ নয়।
কিছুক্ষণ পরে সেই আলোর কাছে পৌঁছে দেখি, গাছপালার আড়ালে একটা বাড়ি এবং গেটে সঙিনধারী পুলিশ। বুঝলাম থানায় এসেছি।
দুজন অফিসার একটা ঘরে বসেছিলেন। কর্নেলকে দেখেই এক গলায় সম্ভাষণ করলেন, হাই ওল্ড বস!
আলাপ-পরিচয় হওয়ার পর জানলাম একজন সি আই ডি ইনস্পেকটার সুখরঞ্জন দাস, অন্যজন অফিসার-ইন-চার্জ জগপতি রাউত। দুজনেই চমৎকার বাংলা বলেন। সুরঞ্জনবাবু বললেন, দেরি দেখে ভাবছিলাম ওশান হউসে গিয়ে খোঁজ নিই! কোনও অসুবিধে হয়নি তো?
কর্নেল বললেন, নাহ, চমৎকার এসেছি।
জগপতিবাবু বললেন, আমি বহরমপুর-গঞ্জাম স্টেশনে জিপ পাঠাতে চেয়েছিলাম। মি. দাস নিষেধ করলেন। আপনি নাকি পুলিশের জিপে চাপা পছন্দ করেন না!
জগপতিবাবু হেসে উঠলেন। কর্নেল বললেন, কখনও কখনও করি না। ওতে আমার কাজের অসুবিধে হয়। যাইহোক, মি. দাস, সেই চিঠিটা দেখতে চাই।
সুখরঞ্জনের ইশারায় জগপতিবাবু দেওয়ালে আঁটা আয়রনচেস্ট থেকে একটা ফাইল বের করলেন। ফাইলের ভেতর একটা কাগজে সাঁটা অজস্র কুচি এবং কুচিগুলোতে কিছু লেখা আছে। কর্নেল ঝুঁকে গেলেন। ইতিমধ্যে তাঁর হাতে আতশকাচ বেরিয়ে এসেছে।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, কুচিগুলো ওবেরয় গ্র্যান্ড হোটেলের ওদিকে নীচু জমিতে পড়ে ছিল। শিশিরে অধিকাংশ চুপসে গেছে। আর পড়ার উপায় নেই। আমি যেভাবে জোড়াতালি দিয়েছি, তা ভুল হতেই পারে। তবে মোটামুটি এটুকু বোঝা যায়, কেউ ম্যাডানসায়েবকে এখানে আসতে বলেছিল। হাতের লেখা হিজিবিজি। তাছাড়া ইংরেজি বানানও ভুল।
জগপতি বললেন, ঠিক তাই। ভদ্রলোককে মার্ডার করার জন্যই ডেকেছিল। জুয়েল ফেরত দেওয়াটা ছল।
বুঝলাম, এঁরা সম্ভবত কেসটা জানেন। বললাম, কিন্তু ঘাড় মটকে খুন সম্পর্কে আপনাদের ধারণী কী?
জগপতি হাসলেন। ভূতের কীর্তি বলে রটেছে। তাছাড়া আগের রাতে নাকি প্রকাণ্ড একটা পাখি সমুদ্র থেকে উড়ে আসতে দেখেছে জেলেরা। তবে মর্গের রিপোর্টে বলছে, সত্যি কতকটা ঘাড় মটকে– মানে মুন্ডুটা মুচড়ে ঘুরিয়ে খুন করেছে। প্রকাণ্ড জোর আছে খুনির গায়ে।
বললাম, তা হলে–।
এবার বাধা দিলেন কর্নেল! রুষ্টভাবে বললেন, প্লিজ জয়ন্ত! এখন কোনও প্রশ্ন নয়।
চুপ করে গেলাম। একটু পরে কর্নেল ফাইলটা দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মি. দাস। কাল সকালে, ধরুন আটটা নাগাদ আমি সি-বিচে অপেক্ষা করব। আপনি আমাকে দেখিয়ে দেবেন, কোথায় ম্যাডানসায়েবের বডি পড়ে ছিল।
সুখরঞ্জনবাবু বললেন, অবশ্যই। আর আপনি বলেছিলেন গ্র্যান্ডে গত তিনদিনের আবাসিকদের লিস্ট দিতে। এই নিন। এতে আপনার বলা নামের কেউ নেই। একুশ নম্বর ডাবলস্যুটে দুজন ভারতীয় আছেন। একজন অবাঙালি মুসলিম মইনুদ্দিন আমেদ এবং অন্যজন তার গোয়ানিজ বন্ধু পিটার নাজারেথ। দুজনেই চামড়াব্যবসায়ী। নাজারেথ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শয্যাশায়ী অবস্থা।
আমেদের মুখে দাড়ি আছে কি?
আছে। ধর্মপ্রাণ মুসলিম। মাথায় টুপি। পরনে শেরোয়ানি-চুস্ত। সুখরঞ্জনবাবু আমাদের বিদায় দিতে এলেন। গেটের কাছে এসে বললেন, আপনার সন্দেহভাজন লোক দুটো এখানকার কোনও হোটেলে ওঠেনি। তন্নতন্ন খোঁজা হয়েছে। তবে কারও বাংলো বা বাড়িতে খুঁজতে সময় লাগবে! আবার এমনও হতে পারে, তারা ম্যাডানসায়েবকে খুন করেই চলে গেছে।
