ওঁর কথার ওপর বললাম, প্রচুর রহস্য।
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত চোখ নাচিয়ে বললেন, চলুন কর্নেল! গোপালপুর অন-সি নিরিবিলি জায়গা। রাজেনবাবুর রোবটটিকে জব্দ করে জেনেটিক্সের মিস্ট্রি সলভ করা যাবে। এই চান্স ছাড়া উচিত নয়।
কর্নেল চোখবুজে দাড়িতে হাত বললেন, গেলে আপনাকে খবর দেব।
আমি উৎসাহ দেখিয়ে বললাম, নওরোজি জানতে পেরেছিলেন, কে হিরে চুরি করেছে। তাই তাকে মরতে হল। এবার হালদারমশাইয়ের বরাতে সাংঘাতিক বিপদ ঘটে না যায়। আমাদের যাওয়া উচিত, কর্নেল!
হালদারমশাইকে কানমলার পরামর্শ দিয়েছি ডার্লিং! ভেবো না।
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি কিন্তু যাচ্ছি। বিজ্ঞানের এমন রহস্যময় আবিষ্কার হাতে-নাতে যাচাইয়ের চান্স ছাড়তে রাজি নই কর্নেল! গোপালপুর উপকূলের মতো সুনসান নির্জন জায়গা ভারতের কোনও সমুদ্র তীরে নেই। আমি রাজেনবাবুর অজ্ঞাতসারে রোবটটির ওপর পরীক্ষা চালাব।
উনি খুব জোরে বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল ধ্যানস্থ। বললাম, চলি বস। আপনি ধ্যান করুন।
তবু কর্নেলের সাড়া নেই। অগত্যা মনে-মনে চটে গিয়ে উঠে দাঁড়ালাম এবং বেরিয়ে গেলাম।
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করে একটা কাজে বেরোতে যাচ্ছি, কর্নেলের ফোন এল। জয়ন্ত! তৈরি হয়ে থাকো। আমি আধঘণ্টর মধ্যে যাচ্ছি।
কী ব্যাপার?
আমরা গোপালপুর-অন-সি রওনা হব।
অ্যাঁ?
হ্যাঁ। এইমাত্র ম্যাডানসায়েবের জামাই কুসরো এসেছিলেন। আজ ভোরবেলায় গোপালপুরে–অন-সি বিচে তার শ্বশুর ম্যাডানসায়েবকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশ ট্রাংককলে লালবাজারের থ্রু দিয়ে খবর দিয়েছে।
মার্ডার নাকি?
তা আর বলতে? তবে ঘাড় মটকে মারা হয়েছে।
সেই শয়তান রোবটটা! সেই দানো ব্যাটাচ্ছেলে!
তৈরি থেকো ডার্লিং! যাচ্ছি।
ফোন নামিয়ে রেখে দেখি, এই শীতে ঘাম দিচ্ছে। শরীর কাঁপছে। আবার সেই বিভীষিকার মুখোমুখি হওয়া কি ঠিক হবে? জীববিজ্ঞানী রাজেন অধিকারী যদি তাঁদের দানোর কানের বদলে এবার অন্য কোনও প্রত্যঙ্গে গোপনে রিসিভারযন্ত্র ফিট করে রাখেন?
.
০৪.
বাসে চেপে পুরী। পুরী থেকে ফের বাসে চিল্কা রেলস্টেশন। তারপর ট্রেনে গঞ্জাম জেলার বহরমপুর স্টেশন। সেখান থেকে প্রাইভেট কার ভাড়া করে গোপালপুর-অন-সি-তে যখন পৌঁছোলাম, তখন রাত প্রায় দশটা। সমুদ্রের ব্যাকওয়াটারের দিকে স্মিথসায়েবের ওয়াশ হাউস। স্মিথসায়েব আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। অত্যন্ত অমায়িক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। একসময় কলকাতার বন্দর অফিসে চাকরি করতেন। কর্নেলের পুরোনো বন্ধু।
বাড়ির নীচের তলায় উনি থাকেন। ওপরতলায় দুটো স্যুট। একটাতে হালদারমশায় আছেন।
আছেন, মানে ভাড়া নিয়েছেন। কিন্তু এ মুহূর্তে নেই। দরজায় তালা আঁটা। স্মিথসায়েব তার গেস্টদের ব্যাপারে নাক গলান না। তবে স্মিথসায়েবের মতে, এই গেস্ট ভদ্রলোক ছিটগ্রস্ত। কারণ আজই বিকেলে তাঁক বিচের মাথায় মুঘল আমলের ভাঙাচোরা পাথুরে বাড়িগুলির ভেতর সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছেন। সন্ধের দিকে একবার তাকে বিচে জগিং করতেও দেখেছেন। স্মিথসায়েব ওঁর প্রতি বেজায় অখুশি।
স্মিথসায়েব গেস্টদের জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ওঁর পরিচারিকা মারিয়াম্মা আমাদের খাবার দিয়ে গেল। দেখলাম কর্নেল তার সুপরিচিত।
কর্নেল তাকে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, পাশের ভদ্রলোক কি খেয়ে বেরিয়েছেন?
মারিয়াম্মা বলল, উনি বাইরে খান। কখন আসেন কখন যান, জানি না।
সে এঁটো থালাবাটি গুছিয়ে চলে যাচ্ছে, কর্নেল ডাকলেন, একটা কথা, মারিয়াম্মা!
বলুন স্যার!
আসার পথে শুনলাম নীচে নাকি কে খুন হয়ে পড়ে ছিল আজ?
মারিয়াম্মা বুকে ক্রস এঁকে ভয় পাওয়া গলায় বলল, সে এক বীভৎস দৃশ্য স্যার! শয়তান ছাড়া এ কাজ কার হতে পারে? মাথাটা মুচড়ে পিঠের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। সে এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে গলার স্বর চাপা করল। জেলেবস্তিতে শুনেছি, গতকাল সন্ধ্যায় ওরা একটা অদ্ভুত পাখিকে সমুদ্রের দিক থেকে উড়ে আসতে দেখেছে। পাখিটার ডানা নাকি বিশাল। দক্ষিণে লাইটহাউসের ওধারে উঁচু বালির টিলা আছে। সেদিকেই পাখিটা এসে নেমেছিল। শয়তান ছাড়া আর কিছু নয়।
মারিয়াম্মা চলে গেলে বললাম, মারিয়াম্মার গল্পটা বিশ্বাস করলেন?
কর্নেল দাড়ি নেড়ে চুরুটের ধোঁয়ার ভিতর বললেন, হ্যাঁ!
আমি পাখিটার কথা বলছি!
আমিও তা-ই বলছি।
গুল! বলে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কর্নেল এসবে বিশ্বাস করেন ভাবা যায় না।
কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানতে টানতে বললেন, হালদারমশাই পাখিটার পাল্লায় পড়লেন কিনা ভাবছি। এখনও ফিরলেন না। যাইহোক, একটু জিরিয়ে নিয়ে বেরোব।
এত রাতে কোথায় বেরোবেন?
কর্নেল হাসলেন! গোপালপুর অন-সি-তে শীতের তত উপদ্রব নেই। সমুদ্রতীরের আবহাওয়া সবসময় নাতিশীতোষ্ণ।
বাইরে খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। এই দোতলা থেকে সামনে বালিয়াড়ির নীচে সমুদ্র দেখা যায়। কুয়াশার আড়ালে সমুদ্র ঢাকা পড়েছে। ছেঁড়া ঘুড়ির মতো চাঁদটাকে অসহায় দেখাচ্ছে। মুঘল আমলের ভাঙচুর বাড়িগুলো কুয়াশামাখানো আবছা জ্যোৎস্নায় বড় বেশি ভূতুড়ে। বিচে ক্রমাগত ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ার গর্জনে কানে তালা ধরে যাচ্ছে। বাতাসে শীতের তীক্ষ্ণতা নেই। কিন্তু বিরক্তিকর।
