থ্যাংকস বস! কিন্তু কালই পুলিশকে জানিয়ে দেননি কেন?
হালদারমশাই জানিয়েছিলেন। পুলিশ গিয়ে কোনও হদিস পায়নি। মাঝখান থেকে হালদারমশাই পুলিশের জেরায় জেরবার হয়েছেন।
উনি কোথায় আছেন? ফোনে পাচ্ছি না কাল থেকে।
দমদমে ওঁর সেই আত্মীয়ের বাড়িতে আছেন। আসলে রাজেনবাবুর বাড়ির দিকে সারাক্ষণ নজর রাখার জন্য ওখানে ডেরা পেতেছেন।
আমার নার্ভ বিগড়ে গেছে, বস! রাখছি।
সকালে চলে এসো। চন্দ্রকান্তবাবুর আসার কথা আছে।
যাব।
ফোন রেখে দিয়ে কিছুক্ষণ আচ্ছন্ন অবস্থায় বসে রইলাম। কলকাতা মহানগরে এমন একটা সাংঘাতিক বিপজ্জনক দানো ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ কি বিশ্বাস করতে চাইবে?
সারাটা রাত প্রায় জেগেই কাটিয়েছিলাম। একটু শব্দ হলেই চমকে উঠি। ওই ভয়ংকর দানোকে কোনও অস্ত্রেই জব্দ করা যাবে না। শুধু কান মললেই ব্যাটাচ্ছেলে কাত। কাজেই যদি সে রাতবিরেতে হানা দেয়, তার কান মলে দেওয়ার জন্যই জেগে থাকা দরকার।
শেষ রাতে কখন একটুখানি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, সেটা জেগে ওঠার পর বুঝলাম। নিজের ওপর চটে গেলাম। ভাগ্যিস দানোটা ওত পাততে আসেনি।
যখন কর্নেলের তেতলার অ্যাপার্টমেন্টে পোঁছোলাম, তখন প্রায় সাড়ে নটা বাজে। ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখি, বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত ভাষণ দিচ্ছেন এবং কর্নেল মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। ইশারায় আমাকে বসতে বললেন কর্নেল। ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে গেল।
চন্দ্রকান্ত বলছিলেন, ক্লোনিং আর জেনোম এক জিনিস নয়। ক্লোনিং বলতে সাদা বাংলায় কলম করা। হাজার বছর আগেও মানুষ জেনেটিকস না জেনেও ক্লোনিং করেছে। এক জাতের উদ্ভিদের সঙ্গে আর এক জাতের উদ্ভিদ কিংবা এক জাতের প্রাণীর সঙ্গে আর এক জাতের প্রাণীর ক্লোনিং করেছে। কিন্তু আধুনিক জেনেটিকসের থিয়োরির অপব্যাখ্যা করে কেউ কেউ বলছেন, দেহকোষের ডি এন এ অণুতে কারচুপি করে মানুষকে গাধা করা যায়। কিংবা ধরুন, একই মানুষের অসংখ্য আদল গড়া যায়। হুবহু তারা এক। এভাবে অসংখ্য কর্নেল কিংবা এই চন্দ্রকান্ত চৌধুরী বাজারে ছাড়া যায়। কিন্তু আমি বলব, এটা বাড়াবাড়ি। এটা স্রেফ গুল। বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞান। মশাই, মানুষ ইজ মানুষ! জেনোম থিয়োরি কখনও দাবি করছে না, মানুষকে গাধা কিংবা দানো বানানো যায়।
কর্নেল বললেন, সিন্থেটিক ম্যানের ব্যাপারটা বলুন চন্দ্রকান্তবাবু!
চন্দ্রকান্ত হাসলেন। রাজেন অধিকারীর বাড়িতে অদ্ভুত ধ্বনিতরঙ্গ অ্যানালিলিস করে বুঝেছি, আমার তৈরি শ্রীমান ধুন্ধুর মতোই কোনও রোবোট আছে। কিন্তু সে রোবোট ধুন্ধুর চেয়ে বহুগুণে উন্নত। তার দেহ ধাতু দিয়ে তৈরি নয়।
কৃত্রিম হাড়-মাংস-চামড়া দিয়ে তৈরি!
ঠিক, ঠিক। চন্দ্রকান্ত নড়ে বসলেন। কিন্তু ওইসব জিনিসকে একেবারে কৃত্রিম বলতে দ্বিধা হচ্ছে। সম্ভবত মৃত মানুষের দেহকোষের ডি এন এ অণুতে কোনও প্রক্রিয়ায় কারচুপি করে হাড়-মাংস-রক্ত-চামড়া ইত্যাদি তৈরি করেছেন রাজেন অধিকারী। তারপর জোড়া দিয়ে একটা মানুষ গড়েছেন।
জেনোম প্রজেক্ট তা হলে সফল করতে পেরেছেন রাজেনবাবু?
বিজ্ঞানী চিবুকের দাড়ি চুলকে বললেন, সম্ভবত।
আমি চুপ করে থাকতে পারলাম না। বললাম, কাল রাতে দানোটা আমাকে
হাত তুলে চন্দ্রকান্ত বললেন, শুনেছি। কিন্তু কান ধরলে কেন ও জব্দ হয় জানেন কি? আমার কাছে শুনুন। আপনাকে আমার সোনিম থিয়োরির কথা বলেছি। রাজেনবাবুর এই রোবটটিও ধ্বনিতরঙ্গের সাহায্যে চালিত হয়। কানই ধ্বনিতরঙ্গের একমাত্র গমনপথ। কাজেই ওর কান চেপে ধরলে রাজেনবাবুর রিমোট কনট্রোল থেকে পাঠানো ধ্বনিতরঙ্গ ওর ব্রেনে ঢুকতে বাধা পায়। তখন স্বভাবত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
কর্নেল বললেন আমার ধারণা, ওর কানের সঙ্গে কোনো সূক্ষ্ম রিসিভিং যন্ত্র ফিট করা আছে। কানে চাপ পড়লে কিছুক্ষণের জন্য সেটা অকেজো হয়ে যায়।
বললাম, রাজেনবাবুর দাদা বসন্তবাবু সেটা জানেন?
যেভাবে হোক, জানতে পেরেছেন। বলে কর্নেল চুরুট ধরিয়ে চোখ বুজলেন।
কিন্তু সম্রাট ইয়াজদার্গিদের হিরের কোনও খোঁজ পেলেন না চন্দ্রকান্তবাবু? আপনার ডিটেক্টরে কোনও খোঁজ মেলেনি?
চন্দ্রকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, নাহ। রাজেনবাবুর বাড়িতে কোনও হিরেটিরে নেই মশাই!
কর্নেল চোখ খুলে বললেন, চন্দ্রকান্তবাবু! আপনার ওই যন্ত্রটি কতটা দূরত্বের পরিধি খুঁজতে পারে?
চারদিকে একশো মিটার পরিধির দূরত্ব খুঁজতে পারে।
ওপরের দিকে?
ভার্টিক্যালি? চন্দ্রকান্ত একটু হাসলেন। আমি হাত তুললে যতটা উঁচু হয়, ততদূর পর্যন্ত।
তার মানে দোতলার কিছু ডিটেক্ট করা যায় না আপনার যন্ত্রে?
নাহ। হাতে ওটা দেখলে ওঁর সন্দেহ হত কি না বলুন?
এই সময় টেলিফোন বাজল। কর্নেল রিসিভার তুলে বললেন, হ্যাঁ। কে? হালদারমশাই নাকি? কোথা থেকে বলছেন? … কী আশ্চর্য! ওখানে কেন গেলেন? … বলেন কী! কাকে দেখেছেন? বসন্তবাবুকে? …হ্যাঁ, প্রচুর রহস্য।… হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক আছে। ওয়েট অ্যান্ড সি।…উইশ ইউ গুড লাক। রাখছি।
কর্নেল ফোন রেখে প্রথমে একচোট হাসলেন। তারপরে বললেন, হালদারমশাই গোপালপুর-অন-সি থেকে ট্রাংককল করে জানালেন, গত রাতে রাজেনবাবু এবং তার দানোটিকে ফলো করে হাওড়া স্টেশনে যান। তখন রাত প্রায় এগারোটা। মাদ্রাজ মেল ছাড়ার কথা রাত আটটা ৪৫ মিনিটে। আড়াই ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ে। ওঁর ধারণা, রাজেনবাবু সে খবর জেনেই দেরি করে স্টেশনে যান। যাইহোক, গোয়েন্দামশাই ওঁদের ফলো করে গোপালপুর অন-সি-তে পৌঁছেছেন। উঠেছেন আমার বন্ধু স্মিথসায়েবের ওশান হাউসে। দোতলার বারান্দা থেকে এক পলকের জন্য নাকি সামনে বালিয়াড়িতে একটা ভাঙা ঘরের ভেতর বসন্তবাবুকে দেখেছেন। নেমে গিয়ে তার আর পাত্তা পাননি। এদিকে রাজেনবাবু উঠেছেন লাইটহাউসের ওদিকে ওবেরয় গ্র্যান্ডে। কাজেই–।
