হাঃ হাঃ হাঃ! কর্নেল আমার পাশে বসে আছেন। কথা বলুন।
কর্নেলের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। ডার্লিং! তখন যে কথাটা তোমাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, আবার বুঝতে চেষ্টা করো। কানমলা! প্রতিপক্ষকে জব্দ করতে হলে তার কান ধরে ফেলবে। কেমন? যখনই কেউ তোমার ওপর হামলা করবে, তোমার লক্ষ্য হবে তার কান। ভুলো না কিন্তু।
চটে গিয়ে বললাম, এই নাক-কান মলে প্রতিজ্ঞা করছি–।
নাক নয়, কান। তুমি কান মলে প্রতিজ্ঞা করার ব্যাপারটা লক্ষ্য করো, জয়ন্ত। তা হলেই বুঝতে পারবে, কান একটা ভাইটাল প্রত্যঙ্গ। মানুষ শুধু নাকমলে প্রতিজ্ঞা করে না, কানও মলতে হয়। তবে নাহ। নিজের কান নিজে মলে নিজেকে জব্দ করার অর্থ হয় না।
ছাড়ছি।
কান ধরে আছ নাকি?
নাহ। ফোন।
ফোনের সঙ্গে কানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ডার্লিং! ফোন মানে ধ্বনি। ধ্বনি আমরা কান দিয়েই শুনি।
খাপ্পা হয়ে টেলিফোন রেখে দিলাম। ঠিক করলাম, এসব উদ্ভুটে ব্যাপারে কিছুতেই নাক গলাব না। এমনকী, ওই বৃদ্ধ ঘুঘুর মুখদর্শনও আর করব না।
পরদিন বিকেলে পত্রিকা-অফিসে রাজেন অধিকারীর টেলিফোন পেলাম। রাজেনবাবু বললেন, মি. জয়ন্ত চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে চাই।
জয়ন্ত চৌধুরী বলছি।
মি. চৌধুরী! খবরটা তো বেরোল না আপনাদের কাগজে? খুব আশা করে ছিলাম।
বেরোবে। আসলে আমাদের কাগজে বিজ্ঞাপনের চাপ খুব বেশি তো! সবসময় সব খবরকে জায়গা দেওয়া যায় না।
শুনুন! ব্যাপারটা সায়েন্টিফিক কিনা! কাজেই জটিল। আপনার লেখার সুবিধে হবে বলে আমি একটা আর্টিকল-আকারে লিখে লোক দিয়ে পাঠাব কি?
পাঠাতে পারেন। কিন্তু এখনই আমাকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে যেতে হবে। ফিরতে দেরি হতে পারে। নীচের রিসেপশনে দিয়ে যেতে বলবেন আপনার লোককে।
— না জয়ন্তবাবু! ওটা আপনার হাতে সরাসরি পৌঁছোনো দরকার। কারণ এর আগে আমি সব কাগজে রাইট-আপ পাঠিয়েছি। ছাপা হয়নি। প্রেস কনফারেন্স ডেকেছি। কেউ আসেনি। আমাকে আসলে কেউ পাত্তা দিতে চায় না। হ্যাঁ, ছোটোখাটো কাগজ ছেপেছে। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। হয় না। বড়ো কাগজে বেরোলে লক্ষ লক্ষ লোকের নজরে পড়ে।
বুঝেছি। আপনি এক কাজ করুন। খামে আমার নাম লিখে পাঠান। তা হলেই আমি পেয়ে যাব।
ঠিক আছে। আসলে আমি আজই কদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি। তাই এত তাড়া।
এক মিনিট মি. অধিকারী! কাল সকালে কি আপনার বাড়িতে চোর ঢুকেছিল? হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো!
একটু পরে সাড়া এল। ঢুকেছিল। কিন্তু আপনি কী করে জানলেন?
রিপোর্টারদের খবরের সোর্স বলা বারণ। হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো!
লাইন কেটে গেল। বুঝলাম, বোকামি করে ফেলেছি। কিছুক্ষণ পরে হালদারমশাইকে ফোন করলাম। রিং হতে থাকল। কিন্তু কেউ ফোন ধরল না। টেলিফোনের গন্ডগোল অথবা হালদারমশাই কোথাও পাড়ি জমিয়েছেন। ভদ্রলোক রহস্য-অন্ত-প্রাণ যাকে বলে। হয়তো ইয়াজদার্গিদের হিরের খোঁজেই হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছেন।
রাত দশটায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলাম প্রতিদিনের মতো। রাজেন অধিকারীর কোনও রাইট-আপ বা আর্টিকল কেউ রিসেপশনে জমা দিয়ে যায়নি। সত্যি, মুখ ফসকে কথাটা বলা বোকামি হয়েছে। লোকটা সতর্ক হয়ে গেছে।
সল্টলেকে নতুন কেনা ফ্ল্যাটে মাসখানেক হল উঠেছি। রাস্তা খাঁ খাঁ জনহীন। শীতের রাতে কুয়াশা জমে আছে গাছপালায়। হঠাৎ দেখি প্রায় তিরিশ মিটার দূরে একটা লোক রাস্তার মাঝখান দিয়ে আসছে। হর্ন দিয়েও তাকে সরানো গেল না। পাগল-টাগল হবে। তাকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে আবার সামনে এসে দাঁড়াল। দুটো ল্যাম্পপোস্টের মধ্যবর্তী জায়গা। দু-ধারে গাছ এবং ঝোপঝাড়। ব্রেক কষেই দেখি তার গায়ে নেভিব্লু সোয়েটার।
তারপর তার চেহারার দিকে চোখ গেল। ও কি মানুষ? ও কী মানুষ?
হালদারমশাইয়ের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে আমার গাড়ির সামনে এসে ঝুঁকে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, গাড়িটা সে দুহাতে উলটে ফেলে দেওয়ার মতলব করছে।
এক লাফে গাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। অমনই সে আমার দিকে এগিয়ে এল। অদ্ভুত জ্বলজ্বল নীলচে চোখে হিংস্রতার ছাপ।
মুহূর্তে কর্নেলের কথাটা মনে পড়ে গেল। আমাকে ধরার আগেই মরিয়া হয়ে আমি তার ওপর ঝাঁপ দিয়ে তার কান দুটো ধরে মোচড় দিলাম। অমনই সে ধড়াস করে নেতিয়ে পড়ল। একেবারে চিৎপাত।
এরপর আর নার্ভ ঠিক রইল না আমার। সটান গাড়িতে ঢুকে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলাম।
ফ্ল্যাটে ফিরে প্রতিজ্ঞা ভুলে কর্নেলকে রিং করলাম। আমার হাত তখন কাঁপছিল। কর্নেলের সাড়া পেয়েই বললাম, এইমাত্র দানোটার পাল্লায় পড়েছিলাম। আপনার কথামতো–।
কানমলে জব্দ করেছ তো?
হ্যাঁ। সাংঘাতিক ব্যাপার। ভাগ্যিস আপনার পরামর্শটা মনে পড়েছিল। নইলে জামসিজ নওরোজির মতো হাড়গোড়-ভাঙা দলাপাকানো মাংসপিণ্ড হয়ে পড়ে থাকতাম। শীতের রাতে সল্টলেকের ব্যাপার তো জানেন। চেঁচিয়ে মাথা ভাঙলেও কেউ বেরিয়ে আসত না।
কর্নেলের হাসি শোনা গেল। বললেন, ডার্লিং! তোমার ওপর তো রাজেনবাবুর রাগ হওয়ার কথা নয়। উনি কাগজে প্রচার চান।
আমারই বোকামি। উনি বিকেলে ফোন করেছিলেন। বলে ঘটনাটা সবিস্তার জানিয়ে দিলাম।
কর্নেল বললেন, হালদারমশাই গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে বরাবরই বন্দি হন, সে তো জানো! এবারও মুখে টেপ-সাঁটা অবস্থায় বাথরুমে বন্দি ছিলেন। হাত-পা শক্ত করে বাঁধা ছিল। দরজায় পাহারা দিচ্ছিল তোমার দেখা দানো আমার ভাষায় কৃত্রিম মানুষ। বিজ্ঞানী চন্দ্ৰকান্তের সিন্থেটিক কফির মতো সিন্থেটিক ম্যানও বলতে পারো। তো তার পাল্লায় পড়ে আমারও বাঁচার কথা ছিল না। দৃশ্যটা কল্পনা করো জয়ন্ত! বাথরুম খোলা। হালদারমশাই পড়ে আছেন। দানোটা দরজার সামনে আমাকে দেখেই দু-হাত বাড়াল। জায়গাটা করিডরমতো। কয়েক হাত দূরে দোতলার সিঁড়ি। হঠাৎ দেখি সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছেন এক ভদ্রলোক। মুখে শিশুর হাসি। দেখামাত্র বুঝলাম রাজেনবাবুর দাদা সেই পাগল ভদ্রলোক। মিটিমিটি হেসে চোখ নাচিয়ে চাপা গলায় বললেন, কান মলে দিন ব্যাটাচ্ছেলের! জব্দ হবে। ব্যস! দানোটা হাত বাড়াতেই আমি তার কান দুটো ধরে জোরে মলে দিলাম। কাজেই তোমাকে কান মলে দেওয়ার কথা বলে আসলে সতর্ক করেই দিয়েছিলাম।
