কর্নেল বললেন, আপনার ল্যাব আছে নিশ্চয়?
আছে- মানে, সবে গড়তে শুরু করেছি।
জয়ন্তকে আপনার ল্যাব দেখিয়ে ব্যাপারটাকে বুঝিয়ে বলুন। তা হলে ও সেইভাবে কাগজে লিখবে। আর দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় লেখা মানেই প্রচণ্ড প্রভাব সৃষ্টি।
জানি, জানি। বলে উৎসাহে উঠে দাঁড়ালেন রাজেন অধিকারী। আসুন আপনারাও আসুন!
ল্যাবরেটরি মানেই বিদঘুটে যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক জিনিসপত্র, নানারকম গন্ধ। তার সঙ্গে একালে হরেক সাইজের কম্পিউটার এবং ভিশনস্ক্রিন যুক্ত হয়েছে। তা চন্দ্ৰকান্তের ল্যাব এবং রাজেনবাবুর ল্যাবের মধ্যে একটাই ফারাক চোখে পড়ল। জারে রঙিন তরল পদার্থে চুবানো ইঁদুর, আরশোলা টিকটিকি ইত্যাদি সরীসৃপ-পোকামাকড়। তারপর আঁতকে উঠলাম দেখে, কবজি থেকে কাটা একটা হাত। মানুষের হাত। আমার চমক লক্ষ্য করে রাজেনবাবু বললেন, হাসপাতালের মর্গ থেকে জোগাড় করেছি। এবার জেনোম ব্যাপার বুঝিয়ে বলি।
আমার পকেটে রিপোর্টারস নোটবই সবসময় থাকে। উনি বকবক শুরু করলে আমি নোট নেওয়ার ভান করে যা খুশি লিখতে থাকলাম। চন্দ্রকান্ত একটা কম্পিউটারের দিকে ঝুঁকে আছেন দেখলাম। কিন্তু কর্নেল কোথায় গেলেন?
প্রায় আধ ঘন্টা টানা বকবক করে এবং এটা ওটা দেখিয়ে রাজেন অধিকারী যখন থামলেন, তখন আড়চোখে তাকিয়ে কর্নেলকে ঢুকতে দেখলাম।
একটু পরে আমাদের বিদায় দিতে গেট পর্যন্ত এলেন রাজেন অধিকারী বললেন, আপনাদের জন্য সব সময় দরজা খোলা।
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত কেন কে জানে, একটি কথাও না বলে তার গাড়ি নিয়ে আগের মতোই উধাও হয়ে গেলেন। আমরা এগোলাম ভি আই পি রোডের দিকে। যেতে যেতে বললাম গোপন তদন্তের ফল বলতে আপত্তি আছে?
কর্নেল হাসলেন, বন্দি হালদারমশাইকে উদ্ধার করতে পেরেছি। তিনি ভোঁ-কাট করেছেন।
চমকে উঠে বললাম, অ্যাঁ?
কর্নেল শুধু বললেন, হ্যাঁ।
.
০৩.
কোনও গুরুতর চিন্তাভাবনার সময় আমার বৃদ্ধ বন্ধুটির চোখ বুজে যায়। ডাকলেও সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। হালদারমশাইয়ের ব্যাপারটা তখনকার মতো জানা গেল না। শুধু ভাবছিলাম, জারে চুবোনো সেই কাটা হাতটার কথা এবং শিউরে উঠছিলাম। হালদারমশাই জোর বাঁচা বেঁচেছেন তা হলে। আমরা পৌঁছোতে দেরি করলে গোয়েন্দা ভদ্রলোককে নিশ্চয় কুচিকুচি করে কেটে জেনোমবিজ্ঞানী রাজেন অধিকারী জারে চুবিয়ে রাখতেন।
কর্নেলের বাড়ির লনে গাড়ি ঢুকিয়ে দেখি, উনি তখনও ধ্যানস্থ। বললাম, এসে গেছি বস।
কর্নেল চোখ খুলে বললেন, কখনও কানমলা খেয়েছ, ডার্লিং?
হঠাৎ এই অদ্ভুত প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, কানমলা? তার মানে?
নিশ্চয় খেয়েছ। বিশেষ করে তোমার ছেলেবেলা পাড়াগাঁয়ে কেটেছে যখন। কর্নেল আস্তে-সুস্থে গড়ি থেকে বেরোলেন। একটু হেসে বললেন, কানমলা খাওয়া খুব অপমানজনক ব্যাপার। কাউকে চূড়ান্ত অপমান করতে হলে কানমলে দেওয়াই যথেষ্ট। কারও কান ধরলেই সে জব্দ হয়। শুধু মানুষ নয় জয়ন্ত! জন্তুজানোয়ারও কান ধরলে জব্দ।
ব্যাপারটা কী?
তুমি কি গাড়িতেই বসে থাকবে, না কি বেরোবে?
ঘড়ি দেখে বললাম, বারোটা বাজে। প্রেস ক্লাবে লাঞ্চের নেমতন্ন আছে। এক মন্ত্রী ভাষণ দিতে আসবেন।
ঠিক আছে। তা হলে তুমি এসো। বলে কর্নেল চলে গেলেন।
একটু অভিমান নিশ্চয় হল। হালদারমশাইয়ের বন্দি হওয়া এবং কানমলা ব্যাপারটা জানার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এই খেয়ালি বৃদ্ধের রকমসকম বরাবর দেখে আসছি। যথাসময়ে নিজে থেকেই জানাতে ব্যস্ত হয়ে উঠবেন। কাজেই গাড়ি ঘুরিয়েই তখন স্থানত্যাগ করলাম।
সন্ধের দিকে একবার ভেবেছিলাম কর্নেলের বাড়ি যাব! কিন্তু উনি যখনতখন হুট করে বেরিয়ে নিপাত্তা হয়ে যান। তাই টেলিফোন করলাম। ষষ্ঠীচরণ ফোন ধরেছিল। এককথায় জানিয়ে দিল, বাবামশাই বেইরেছেন।
হালদারমশাইয়ের ফ্ল্যাটে রিং করলাম। কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।
বিজ্ঞানী চন্ত্রকান্তকে রিং করলাম। ফোনে তখনই সাড়া এল, জয়ন্তবাবু নাকি?
অবাক হয়ে বললাম, গলা শুনেই লোক চেনার যন্ত্র তৈরি করেছেন বোঝা যাচ্ছে।
ঠিক তা-ই। বিজ্ঞানীর হাসি ভেসে এল। আমার সোনিম থিয়োরি–
ঝটপট বললাম, জেনোম থিয়োরির পর সোনিম থিয়োরি এলে আমার বারোটা বেজে যাবে চন্দ্রকান্তবাবু! প্লিজ! থিয়োরি থাক।
সহজ ব্যাপার জয়ন্তবাবু! ইংরেজিতে এস ও এন আই এম সোনিম। শব্দ! ধ্বনি! বুঝলেন তো?
চন্দ্রকান্তবাবু–
ল্যাবে বসে আছি, জয়ন্তবাবু! আমার ঘরে যাঁরা আসেন, তাঁদের গলার স্বর, শব্দ উচ্চারণের বিশেষ বিশেষ ভঙ্গি ইত্যাদি সব রেকর্ড করে রাখি। কম্পিউটারে সেই ডেটা অ্যানালিসিস করে নিই। তারপর টেলিফোনের সঙ্গে কম্পিউটারের কানেকশন! ব্যস! সো ইজি।
প্লিজ! আমি জানতে চাইছি আপনার সেই মাল্টিপারপাস ডিটেক্টর যন্ত্রে রাজেনবাবুর বাড়ি সম্পর্কে কী তথ্য পেলেন?
ডেটা অ্যানালিসিস চলছে। এখনও কিছু বুঝতে পারছি না। আরও দু-একটা দিন লেগে যাবে হয়তো।
কৃত্রিম মানুষের কোনও হদিস পেলেন কি?
নাহ। তবে একটা অদ্ভুত ধ্বনিতরঙ্গ ধরা পড়েছে। কোনও পার্থিব বস্তু বা প্রাণী এই ধ্বনিতরঙ্গের কারণ নয়, এটুকু বলতে পারি।
চন্দ্রকান্তবাবু, আপনি তো হালদারমশাইকে ভালোই চেনেন।
খুউব চিনি।
রাজেনবাবুর বাড়ি ঢুকে উনি বিপদে পড়েছিলেন। আমরা যখন ওঁর ল্যাবে ছিলাম, তখন কর্নেল ওঁকে দেখতে পান। বন্দি অবস্থায় ছিলেন। কর্নেল ওঁকে উদ্ধার করেন।
