কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন। কোনও কথা বললেন না। আমি বললাম, আপনি বিজ্ঞানী। এ-যুগে ফ্র্যাংকেনস্টাইন কাহিনি কি বাস্তবে সম্ভব নয়? আপনিই বললেন, জেনোমতত্ত্ব কাজে লাগিয়ে শরীরের গড়ন বদলানো যায়। শারীরিক শক্তিও তা হলে বদলানো যায়?
চন্দ্রকান্ত বললেন, তা যায়। তবে
কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, আপনার ধুন্ধুমার যন্ত্রমানুষ মাত্র। কিন্তু কৃত্রিম চামড়া, কৃত্রিম পেশি-শিরা-উপশিরা, কৃত্রিম হৃৎপিন্ড-ফুসফুস এবং কৃত্রিম রক্ত তো তৈরি করা সম্ভব হয়েছে এ যুগে। বাকি রইল কৃত্রিম মগজ। কোনও বিজ্ঞানী কি এইসব জুড়ে কৃত্রিম মানুষ তৈরি করতে পারেন না?
পারেন, স্বীকার করছি। কিন্তু সেই কৃত্রিম মানুষও আসলে রোবট ছাড়া কিছু নয়। কারণ, তার কৃত্রিম মগজ মানুষের মগজের মতো স্বাধীন চিন্তা করতে পারবে না। যে তাকে তৈরি করছে, তারই চিন্তাভাবনা বা ইচ্ছা তাকে কনট্রোল করবে।
কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন। তা হলে তাকে রিমোট কনেট্রোল সিস্টেমে চালানো যাবে।
ঠিক। একশোভাগ ঠিক। চন্দ্রকান্ত চাপাস্বরে বললেন, এখন কথা হচ্ছে, রাজেন অধিকারী তা করতে পেরেছেন কি না।
আমি না বলে পারলাম না, ম্যাডানসায়েবের হিরে চুরি তা হলে রাজেনবাবুরই কীর্তি। জেনোম রিসার্চের জন্য প্রচুর টাকার দরকার। হিরেটার দাম এ-বাজারে প্রায় দেড় কোটি টাকা।
কর্নেল অট্টহাসি হাসলেন। জয়ন্ত খাঁটি সাংবাদিক হতে পারল না বলে ওর সমালোচনা করি বটে, তবে ওর মধ্যে সাংবাদিক সুলভ চটজলদি সিদ্ধান্ত করার স্বভাব আছে। ডার্লিং! তোমাকে বারবার বলেছি, বাইরে থেকে যা যেমনটি দেখাচ্ছে, ভেতরে তা তেমনটি নয়।
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। চলুন না, রাজেন অধিকারীর সঙ্গে আলাপ করে আসি। যদি উনি এতক্ষণ না ফিরে থাকেন, আমি এম পি ডি দিয়ে বাইরে থেকে কিছু ডেটা সংগ্রহ করে নেব।
বললাম, এম পি ডি মানে?
মাল্টিপারপাস ডিটেক্টর। আমারই আবিষ্কার। চন্দ্রকান্ত সগর্বে বললেন। ওঁর বাড়ির ভেতর কী কাজকর্ম হয়, তার হদিস পেয়ে যাব।
কর্নেলও উঠলেন। বললেন, আমার ভয় হচ্ছে, হালদারমশাই কোনও কেলেঙ্কারি না বাধান। একগুঁয়ে মানুষ। আত্মবিশ্বাস প্রচণ্ড। আবার ওই জিনিসটা তাকে বিপদে ফেলে। অন্তত তার অবস্থা জানার জন্যও আমাদের ওখানে আবার যাওয়া দরকার মনে হচ্ছে।
বিজ্ঞানী নিজের গাড়ি বের করলেন। ওঁর গাড়ি আগে, আমাদেরটা পেছনে। বিজ্ঞানীর গাড়ি বলে কথা! সদর রাস্তায় পৌঁছে রকেটের বেগে উধাও হয়ে গেল। বললাম, কী অদ্ভুত মানুষ!
কর্নেল হেসে বললেন, সম্ভবত আমরাও আরও অদ্ভুত মানুষের পাল্লায় পড়তে চলেছি ডার্লিং।
আপনি কি কৃত্রিম মানুষের কথা সত্যিই বিশ্বাস করেন– মানে যাকে গত রাতে হালদারমশাই দেখেছেন?
নিছক একটা থিয়োরি, জয়ন্ত। বলে কর্নেল বাইনোকুলার তুলে রাস্তার ধারের গাছে হয়তো পাখি খুঁজতে থাকলেন।
সেই বাড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড় করালাম। বিজ্ঞানী প্রবরের গাড়িটা খুঁজে পেলাম না। বললাম, সর্বনাশ। চন্দ্রকান্তবাবুকে কৃত্রিম মানুষ হাপিস করে দেয়নি তো?
কর্নেল গাড়ি থেকে বেরিয়ে বললেন, চন্দ্রকান্তবাবুর অভ্যাস খোদার ওপর খোদকারী করা। ন্যাচারাল কফির বদলে সিন্থেটিক কফি খান। খিদে পেলে নাকি এনার্জি ক্যাপসুল খান। কৃত্রিম অর্থাৎ ওঁর ভাষায় সিন্থেটিক মানুষের প্রতি আসক্তি স্বাভাবিক। যাই হোক, গেটের দরজায় আর তালা আঁটা নেই। হুঁ ওই দ্যাখো ওঁর গাড়ি!
বলে কর্নেল গেট ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে গেলন! আমি গাড়ি ঢোকাতে সাহস পেলাম না। বেরিয়ে গিয়ে ওঁকে অনুসরণ করলাম।
এবড়োখেবড়ো খোয়া-ঢাকা রাস্তা। দু-ধারে বিচ্ছিরি জঙ্গল। বাড়িটার সামনে চন্দ্ৰকান্তের গাড়ি দাঁড় করানো। আমরা সেখানে যেতেই তার সাড়া পাওয়া গেল ঘরের ভেতর থেকে। চলে আসুন। কর্নেল!
সেকেলে হলঘর বললেই চলে। ঝাড়বাতিও আছে। পুরোনো আসবাবপত্রে সাজানো বনেদি পরিবারের বৈঠকখানা। চন্দ্রকান্ত আলাপ করিয়ে দিলেন রাজেন অধিকারীর সঙ্গে। রাজেনবাবুর বয়স আন্দাজ ষাটের কাছাকাছি। রোগা হাড়গিলে চেহারা। পরনে গলাবন্ধ কোট আর ঢোলা পাতলুন। মাথায় কাঁচাপাকা সন্নেসিচুল। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। কেমন ভুতুড়ে চেহারা যেন।
তবে হাসিটা অমায়িক এবং হাবভাবেও বড়ো বিনয়ী। শশব্যস্তে অভ্যর্থনা করে আমাদের বসালেন। বললেন, হিউম্যান জেনোম রিসার্চ সেন্টার সম্পর্কে ক্রমশ আপনাদের মতো বিশিষ্ট মানুষদের আগ্রহ জাগাতে পেরেছি, এ আমার সৌভাগ্য। দেশে ফিরে আসার পর বিজ্ঞানী মহলে শুধু ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের পাত্র হয়ে উঠেছিলাম। এখন দেখছি, সমঝদার বিজ্ঞ মানুষেরও অভাব নেই। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জ্যোতিঃপদার্থবিদ মি. চন্দ্রকান্ত চৌধুরীকেও আমি আকর্ষণ করতে পেরেছি।
চন্দ্রকান্ত সহাস্যে বললেন, এবং একজন প্রকৃতিবিজ্ঞানীকেও! উনি কর্নেলের দিকে আঙুল তুললেন।
কর্নেল বললেন, এবং একজন নামকরা সাংবাদিককেও! কর্নেল আমার দিকে তাকালেন। ঠোঁটের কোনায় দুষ্টু হাসি।
রাজেনবাবু বললেন, জয়ন্তবাবু! আমার এই প্রজেক্ট সম্পর্কে কিছু লিখুন। এদেশে এই প্রথম বেসরকারি উদ্যোগে জেনোম প্রজেক্ট। গভর্নমেন্ট মানেই আমলাতন্ত্র। কিন্তু সরকারি বিজ্ঞানীদের আমলাতন্ত্র আরও সাংঘাতিক। বলে, টাকা দিচ্ছি। তবে বোর্ড গড়তে হবে। তাতে ওঁরা থাকবেন। বুঝুন ব্যাপার! লাল ফিতের ফাঁসে দম আটকে শেষে আমিই মারা পড়ব।
