বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত?
কর্নেল হাসলেন। হ্যাঁ ডার্লিং। এই হিউম্যান জেনোম ব্যাপারটা সম্পর্কে ওঁর সঙ্গে আলোচনা করা দরকার।
বিজ্ঞানী চন্দ্ৰকান্তের সঙ্গে আমাদের অনেক বছরের পরিচয়। উনি থাকেন এখান থেকে এক কিমি উত্তরে একটা প্রত্যন্ত এলাকায়। সদর রাস্তা থেকে আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ রাস্তায় ঢুকে আরও জঙ্গুলে এলাকায় ওঁর ডেরা। নিরিবিলি বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপযুক্ত জায়গা। ওঁর একটি রোবট আছে। তার নাম ধুন্ধুমার। ডাকনাম ধুন্ধু। এই বিকট নামের কারণ আছে। শব্দটি উচ্চারণ করলে যে ধ্বনির সৃষ্টি হয় তা রোবটটিকে নাকি সক্রিয় করে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় মনুষ্যাকৃতি রোবটটিকে সোনিক রোবট বলা চলে।
তবে ধুন্ধুকে আমার বড় ভয় করে। যন্ত্রমানুষ আর পোষা বাঘ প্রায় একই জিনিস।
গাড়ির হর্ন দিতেই অটোমেটিক গেট খুলে গেল। বিজ্ঞানী প্রবরকে সহাস্যে এগিয়ে আসতে দেখলাম। চিবুকে তেকোনা দাড়ি, একরাশ আইনস্টাইনি চুল। বেঁটেখাটো মানুষটি বড়োই সদালাপী। কর্নেল এবং আমার সঙ্গে কড়া হ্যান্ডশেক করে ড্রইংরুমে ঢোকালেন। ধুন্ধুকে দেখতে না পেয়ে নিশ্চিন্ত হলাম।
আরও নিশ্চিন্ত হলাম শুনে যে, ধুন্ধুর কী ভাইরাসঘটিত অসুখ হয়েছে। ল্যাবে তার চিকিৎসা চলছে।
চন্দ্রকান্ত বললেন, আজকাল আর সিন্থেটিক কফি খাই না। ন্যাচারাল কফি খাওয়াচ্ছি।
কর্নেল বললেন, কফি পরে হবে। আগে কাজের কথা সেরে নিই।
বলুন! এ বেলা আমার হাতে অঢেল সময়।
হিউম্যান জেনোম সম্পর্কে আমার কিছু প্রশ্ন আছে।
বিজ্ঞানী ভুরু কুঁচকে তাকালেন। জেনোম? আপনি কি জেমস ডি ওয়াটসনের তত্ত্বের কথা বলছেন? নোবেল- লরিয়েট ওয়াটসন?
হ্যাঁ। ওঁর হিউম্যান জেনোম প্রজেক্টের কথা শুনেছি।
চন্দ্রকান্ত হাসলেন। আমি জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের কারবারি। তবে ইদানীং কোনও কোনও ক্ষেত্রে আমার লাইন জেনেটিকসের কাছাকাছি এসে পড়ছে। তো জেনোম প্রজেক্ট! মানুষের প্রতি দেহকোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম আছে। ক্রোমোজোমের মধ্যে আছে মালার মতো সাজানো অসংখ্য জিন। সঠিক হিসাব এখনও করা যায়নি। ওয়াটসনের মতে, একজন মানুষের দেহে ৫০ হাজার থেকে এক লক্ষ জিন আছে। প্রতিটি জিনে আছে তিনশো কোটি ডি এন এ। এই ডি এন এ-র মধ্যে সংকেতে লুকনো আছে মানুষের বংশগত বহু লক্ষণ বা চরিত্র। ওয়াটসন ডি এন এ-র গঠন খুঁজে সেই সংকেতগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। সেটাই ওঁর জেনোম প্রকল্প।
জেনোমতত্ত্ব কেউ কি এ পর্যন্ত বাস্তবে কাজে লাগাতে পেরেছেন?
চন্দ্রকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, নাহ। স্রেফ তত্ত্ব। তবে স্বয়ং ওয়াটসনেরই মতে, একে কাজে লাগিয়ে বড়োজোর বংশানুক্রমিক আদিব্যাধি নির্মূল করা যায়। এই পর্যন্তই।
এর অপব্যবহার করা কি সম্ভব?
বাস্তবে কাজে লাগাতে পারলে অপব্যবহার সম্ভব বইকী।
কী ধরনের অপব্যবহার?
চন্দ্রকান্ত খিক-খিক করে খুব হাসলেন। সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করা যায়। শরীরের গড়ন বদলে দেওয়া যায়। তবে তার জন্য জেনোমের দরকার কী? সেটা স্রেফ কিছু খাইয়ে বা অপারেশন করেও করা যায়। মোট কথা, তত্ত্বটা এখনও নিছক তত্ত্বই।
এ-শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটেন-আমেরিকায় জাতিগত বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য জেনেটিক্সের ইউজেনিক তত্ত্ব নিয়ে খুব হইচই বেধেছিল। নাৎসি জার্মানিতে ইউজেনিক তত্ত্ব লক্ষ লক্ষ ইহুদি হত্যার কারণ হয়েছিল। বিজ্ঞানের চেয়ে বিজ্ঞানীরা সাংঘাতিক বিপজ্জনক। ইদানীং দেখছি, জেনেটিক্সের নানা তত্ত্বের উদ্ভট-উদ্ভট ব্যাখা শুরু হয়েছে।
কর্নেল চুরুট জ্বেলে বললেন, জেনোম প্রকল্পের সাহায্যে কৃত্রিম মানুষ তৈরি করা সম্ভব?
চন্দ্রকান্ত আবার ভুরু কুঁচকে তাকালেন। তারপর ফিক করে হাসলেন। বহুবছর আগে নোবেলজয়ী আণবিক জীববিজ্ঞানী জাক মোদে বলেছিলেন, ল্যাবে মানুষ গড়ে ফেলবেন। ফুঃ! মানুষ ইজ মানুষ।
কৃত্রিম ডি এন এ অণু তৈরি কি সম্ভব?
চন্দ্রকান্ত অবাক হয়ে বললেন, আপনার পয়েন্টটা কী?
এই এলাকায় একটি হিউম্যান জেনোম রিসার্চ সেন্টার খোলা হয়েছে বা হবে জানেন?
চন্দ্রকান্ত ভুঁড়ি নাচিয়ে আর এক দফা হাসলেন। আপনি নিশ্চয় রাজেন অধিকারীর কথা বলছেন? আমেরিকার কোনও ইউনিভার্সিটিতে জেনেটিক্স বিভাগে অধ্যাপক ছিলেন ভদ্রলোক। শুনেছি মাত্র। আলাপ হয়নি। এ-ও শুনেছি, ভালমানুষ দাদার ওপর পরীক্ষা চালাতে গিয়ে তাকে পাগল করে ফেলেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা কী?
কর্নেল আগাগোড়া সমস্ত ঘটনার বিবরণ দিয়ে বললেন, আমি আপনার সাহায্য চাই চন্দ্রকান্তবাবু!
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত চিবুকের তেকোনা দাড়ি চুলকোচ্ছিলেন। এটা ওঁর চিন্তাভাবনার লক্ষণ। একটু পরে বললেন, হালদারমশাইয়ের দেখা প্রথম ঘটনাটা, মানে পারসি ভদ্রলোককে তুলে আছাড় মারাটা চিন্তাযোগ্য বিষয়। কিন্তু দ্বিতীয় ঘটনাটা ওঁর দেখার ভুল হতেও পারে। মানে, চোখ উপড়ে বেসিনে দেওয়া এবং রক্ত! তারপর সেই চোখ থেকে গুলি বের করা। হালদারমশাইকে তো বিলক্ষণ জানি!
বলে চন্দ্রকান্ত হেসে উঠলেন। বললাম, গুলির শব্দ শুনেছিলেন হালদারমশাই! ঘটনাস্থলে পাওয়া রিভলভারটা তার প্রমাণ।
গুলিটা নকল পাথুরে চোখে লেগেছিল। চন্দ্রকান্ত আবার দাড়ি চুলকোতে থাকলেন। যাইহোক, লোকটার গায়ের জোরই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে।
