হালদারমশাই হাসতে গিয়ে গম্ভীর হলেন। ম্যাডান বললেন, কর্নেলসায়েব! আমি কিন্তু আপনার কাছে এসেছি। দয়া করে আপনি কেসটা নিন। আমার বিশ্বাস, আপনিই পবিত্র হিরে উদ্ধার করে দিতে পারবেন।
কর্নেল চোখ বুজে দাড়িতে হাত বুলোতে থাকলেন। কোনও কথা বললেন না।
ম্যাডানসায়েব দ্বিধার সঙ্গে বললেন, দয়া করে যদি আমার সঙ্গে আসেন, আমার বাড়ির গোপন বেসমেন্ট এবং ভল্ট দেখাতে পারি। আমার মনে হচ্ছে, আপনার দেখা দরকার।
কর্নেল বললেন, আপাতত দরকার দেখছি না।
তা হলে আপনি কেস নিচ্ছেন না?
আপনি কবে ফিরছেন বাইরে থেকে?
আগামী রবিবার।
ফিরে এসে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
ম্যাডানসায়েব গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন।
হালদারমশাই লাফিয়ে উঠলেন। ক্যাসটা লইলেন না কর্নেলসার? প্রচুর রহস্য! প্রচুর।
তার চেয়ে সাংঘাতিক রহস্যের খবর আপনি এনেছেন। বলে কর্নেল টেলিফোন তুলে ডায়াল করতে লাগলেন। একটু পরে কাকে বললেন, সোমা নাকি? আমি কর্নেল না! না! শোনো! গত রাত্রে যশোর রোডে একটা অ্যাকসিডেন্ট– হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি ইনটারেস্টেড। পরিচয় পাওয়া গেছে? এক সেকেন্ড। লিখে নিচ্ছি। কর্নেল টেবিলে রাখা প্যাড টেনে কী সব লিখে নিলেন। চাপা দুর্বোধ্য কিছু কথাবার্তাও বললেন।
হালদারমশাই বললেন, ক্কী? ক্কী?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ম্যাডানসায়েবের হঠাৎ এতদিন পরে আমার কাছে আসার কারণ খুঁজছিলাম, হালদারমশাই! আমার যখনই সন্দেহ হয়, কেউ কোনও তথ্য গোপন করে আমার সাহায্য চাইছে, তখন তার কেস নেওয়া আমি পছন্দ করি না। গত রাত্রে আপনার দেখা ভূতটা যাকে আছাড়ে মেরেছে, তার নাম জামসিদ নওরোজি।
চমকে উঠে বললাম, পারসি নাম!
হ্যাঁ। তার চেয়ে বড়ো কথা, ভদ্রলোকের একটা কিউরিয়ো শপ আছে। প্রত্নদ্রব্যের দোকান। বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। আবার তার দোকানটাও ম্যাডান জুয়েলার্সের ওপরতলায়। কাজেই চলুন হালদারমশাই, সেই ভূতের আখড়াটি দেখে আসা যাক। জয়ন্ত! তুমিও চলো তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার জন্য কয়েক কিস্তি লোভনীয় খাদ্য পেয়ে যাবে।
.
০২.
প্রথমে চোখে পড়ল জংধরা ছোট্ট গেটের পাশে সাঁটা একটুকরো চৌকো ফলক। তাতে ইংরেজিতে লেখা আছে : Human Genome Research Centre.
দোতলা বাড়িটা সত্যিই হানাবাড়ি। গেটে তালা বন্ধ। ভেতরে আগাছার জঙ্গল। চারদিকে দেওয়ালঘেরা এই বাড়ির অবস্থাও জরাজীর্ণ। পলেস্তারা খসে গেছে কোথাও-কোথাও। কার্নিসে গাছ গজিয়ে আছে। পুরোনো আমলের বাগানবাড়ি হতে পারে। ডাইনে বিশাল এলাকা জুড়ে কী কারখানা গড়া হচ্ছে। বাঁ দিকে একফালি খোয়াবিছানো রাস্তা এবং নতুন পুরোনোয় ঘেঁষাঘেষি অনেক বাড়ি। একটাতে ঘন গাছপালা। হঠাৎ করে মনে হয় গ্রাম শহরে মেশানো কোনও মফস্সল জনপদ।
কর্নেল বাইনোকুলারে গেট থেকে ভেতরটা দেখছিলেন। বললাম, এ কিসের গবেষণাকেন্দ্র?
কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, জেনেটিক্সের।
হালদারমশাই অবাক হয়ে বললেন, ক্কী? ক্কী?
জবাব না দিয়ে কর্নেল ফুটপাত ধরে এগিয়ে গেলেন একটা পান-সিগারেটের দোকানের দিকে। হালদারমশাই আমার দিকে তাকালেন। বললাম, জেনেটিক ব্যাপারটা আমিও বুঝি না হালদারমশাই। শুধু এটুকু বলতে পারি, এখানে সম্ভবত কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেন্দ্র গড়া হবে। তাই আগেভাগেই ফলক সেঁটে দিয়েছে।
গভমেন্টের কারবার! দেখি, নস্য পাই নাকি। বলে হালদারমশাইও সেই দোকানটার দিকে হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন।
আমি আমার ক্রিমরঙা মারুতি গাড়িতে গিয়ে ঢুকলাম। এভাবে একানড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না। পড়েছি দু-দুজন ছিটগ্রস্তের পাল্লায়। বরাতে কী আছে কে জানে। বসে থাকতে থাকতে গেটের ভেতর দিয়ে বাড়িটার দিকে তাকালাম। সেইসময় হঠাৎ দোতলার একটা জানালা খুলে গেল এবং একটা মুখ দেখলাম।
নাহ। ভূতের মুখ বলে মনে হল না। গোলগাল অমায়িক এবং বেশ সভ্যভব্য মানুষের মুখ। আপনমনে হাসছেন তিনি। উৎসাহে গাড়ি থেকে নেমে ওঁকে ডাকব ভাবছি, হঠাৎ জানালাটা বন্ধ হয়ে গেল। তা হলে বাড়িটাতে এখন কেউ আছেন। কিন্তু বাইরের থেকে গেটে তালা কেন? খটকা লাগল।
কর্নেল এবং হালদারমশাই ফিরে এলে কথাটা বললাম। কর্নেল বললেন, হ্যাঁ, তুমি বসন্তবাবুকে দেখেছ। শুনলাম ভদ্রলোক বদ্ধ পাগল। তাই ওঁর ছোটোভাই রাজেনবাবু ওঁকে বাড়িতে আটকে রেখে বাইরে যান। রাজেন অধিকারী নাকি বাঙ্গালোরে কী চাকরি করতেন। সম্প্রতি এই পৈতৃক বাড়িতে এসে উঠেছেন।
হালদারমশাই ততক্ষণে গেটের কাছে হেঁড়ে গলায় ডাকাডাকি শুরু করেছেন, বসন্তবাবু! বসন্তবাবু! মি. অধিকারী।
কর্নেল বললেন, হালদারমশাই, বসন্তবাবুকে ডেকে লাভ নেই, তা ছাড়া পাগলের পাল্লায় পড়া কাজের কথা নয়। আসুন আমরা একবার এক জায়গায় যাব।
হালদারমশাই চাপা গলায় বললেন, কর্নেলসাব, এই চান্স। ছাড়া ঠিক নয়। কাল রাত্তিরে যা স্বচক্ষে দেখেছি, তার তদন্ত করা দরকার।
আপনি তা হলে তদন্ত করুন। আমরা চলি।
হালদারমশাই কান করলেন না। গেটের গ্রিলের খাঁজে পা রেখে উঠে গেট পেরিয়ে গেলেন। বললাম, সর্বনাশ। হালদারমশাই করছেন কী।
কর্নেল গাড়িতে ঢুকে বললেন, ওঁর কাজ উনি করুন। গাড়ি ঘোরাও। আমরা এবার যাব চন্দ্রকান্তবাবুর বাড়ি।
