ম্যাডান আমাদের দেখে নিয়ে বললেন, আমার কিছু গোপন কথা আছে।
কর্নেল আমাদের দুজনের পরিচয় দিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন, আপনার গোপন কথা এঁদের কাছে আমি গোপন রাখতে পারব না, মি. মাদান। কাজেই–
ম্যাডান ওঁর কথার ওপর বললেন, কী বললেন? মাদান? আপনি তা হলে পারসি ভাষা জানেন?
সামান্যই। ম্যাডান স্ট্রিট যাঁর নামে, তিনিও আপনাদের জোরাস্তারি ধর্মের লোক ছিলেন। বাঙালি বসু যেমন ইংরেজিতে বোস হয়েছেন, মাদানও তেমনি ম্যাডান। যাইহোক, বলুন আপনার গোপন কথা।
ম্যাডান একটু ইতস্তত করে বললেন, একমাস হয়ে গেল, পুলিশ কিছু করতে পারল না। ফরেন্সিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, লেসার রশ্মি দিয়ে ইস্পাতে ভল্টের একটা অংশ গলিয়েছে চোর। বেসমেন্টে ঢোকার গোপন দরজার লকও গলিয়েছে। এই পর্যন্তই।
আপনি বলেছেন, হিরেটা ঐতিহাসিক। একটু বুঝিয়ে বলুন।
পারসিক সাসানীয় বংশের শেষ সম্রাট ইয়াজদাগির্দের মকুটে এই হিরে বসানো ছিল। তিনিও আমাদের জোরাস্তারি ধর্মাবলম্বী ছিলেন। বর্তমান বাগদাদের কিছু দূরে হিরার যুদ্ধে খ্রিস্টিয় সপ্তম শতকে তিনি আরবদের হাতে পরাজিত হন। তার মুকুট থেকে পবিত্র হিরেটি খুলে নিয়ে পালায় তার এক অনুচর। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। প্রায় সাড়ে তেরশো বছর এ-হাত ও-হাত ঘুরে হিরেটি যায় এক ব্রিটিশ সামরিক অফিসারের হাতে। তার বংশধর গত জুন মাসে নিউইয়র্কের নিলামঘরে সেটি বেচতে দেন। ১২ লক্ষ ডলারে আমার এজেন্ট কিনে নেন। বিশ্বের সব বড়ো নিলামকেন্দ্রে আমার এজেন্ট আছেন। ম্যাডান একটু দম নিয়ে বললেন, দুঃখের কথা কী জানেন কর্নেল সরকার? এই অধম ফিরুজ শাহ মাদানেরই পূর্বপুরুষ সম্রাট ইয়াজদার্গিদের সেই অনুচর। প্রামাণিক ঐতিহাসিক তথ্যও আপনাকে দেখাতে পারি।
কর্নেল একটু চুপ করে থেকে বললেন, পবিত্র হিরে আপনি উদ্ধার করে দিন। এর জন্য যত টাকা লাগে আমি দিতে রাজি। আমি বেশ বুঝতে পেরেছি, পুলিশের পক্ষে এ কাজ দুঃসাধ্য।
নিউ ইয়র্কের নিলামঘরে আপনার এজেন্টের নাম কী?
টেডি পিগার্ড। খুব বিশ্বস্ত লোক। জমিজমা-সম্পত্তির কারবারি। আবার অন্যের হয়ে নিলামঘরে হরেকরকম জিনিস নিলামেও ডাকেন। বলা দরকার কর্নেলসায়েব, আমার মতো ওঁর অনেক মক্কেল আছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে মক্কেলের সঙ্গে ওঁর বোঝাপড়া আছে। কোন্ জিনিস কোন্ মক্কেলের হয়ে নিলামে কিনতে চাইছেন বা কেনেন, তা পিগার্ড এবং সেই মক্কেল ছাড়া ঘুণাক্ষরে আর কেউ জানতে পারবে না। পিগার্ড তা জানাবেন না। আপনি তো জানেন, ব্যবসাবাণিজ্যে কিছু নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা হয়।
হালদারমশাই কান খাড়া করে শুনছিলেন। বলে উঠলেন, হঃ! ট্রেড সিক্রেট।
ট্রেড সিক্রেট। সায় দিলেন ম্যাডান। এভাবে বহু রত্ন আমি পিগার্ডের মারফত কিনেছি। প্রায় কুড়ি বছরের যোগাযোগ তার সঙ্গে। এই পবিত্র হিরে যে নিলামে বিক্রি হবে, তা পিগার্ডই আমাকে জানিয়েছিলেন। তার কারণ বুঝতেই পারছেন। জোরাস্তারি সম্রাটের মুকুটের হিরে এবং আমিও একজন জোরাস্তারি। তো শুনেই আমি আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। আমাদের পরিবারে বংশপরম্পরা এই হারানো হিরের কাহিনি চালু আছে। আমার ঠাকুরদার হাতে লেখা বৃত্তান্তে এর উল্লেখ আছে। খবর পেয়েই চলে গেলাম নিউইয়র্ক। পিগার্ডকে বললাম, এই হিরে আমার চাই। চিন্তা করুন কর্নেলসায়েব, এ-যাবৎকাল সর্বোচ্চ দরে ওই নিলামঘরে একটুকরো হিরে বিক্রি হল। রেকর্ড দর!
কর্নেল বললেন, পিগার্ডকে আপনি বলেছিলেন হিরেটার সঙ্গে আপনাদের পরিবারের সম্পর্ক আছে?
নাহ। ম্যাডানসায়েব চাপা গলায় বললেন, বলিনি। তার কারণ পিগার্ড তা হলে বেশি কমিশন দাবি করতেন।
আপনার বাড়িতে আর কে আছেন?
আমার মেয়ে খুরশিদ আর জামাই কুসরো। আমার স্ত্রী পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন।
আর কেউ আছেন?
আয়া, খানসামা, বাবুর্চি, আমার ড্রাইভার, দারোয়ান- এরা আছে। কিন্তু পবিত্র হিরের ব্যাপারটা তাদের জানার কথা নয়।
আপনার মেয়ে-জামাইয়ের?
তারা জানত।
আপনার জামাই কী করেন?
আমার দোকানের দায়িত্ব তারই হাতে।
কলকাতায় আপনার আত্মীয়স্বজন নিশ্চয় আছেন?
অবশ্যই আছেন।
হালদারমশাই ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠছিলেন। নিজস্ব ইংরেজিতে বললেন, ইয়োর ডটার বাই সিলিপ অব টাং-।
ম্যাডান রুষ্টভাবে বলেন, নো!
হালদারমশাই দমে গিয়ে আবার ফেলে আসা নস্যির কৌটো খুঁজতে থাকলেন। কর্নেল বললেন, যাইহোক। সম্রাট ইয়াজদার্গিদের হিরে যে আপনার বাড়িতে আছে এবং কোথায় লুকোনো আছে, সে কথা কেউ জানতে পেরেছিল। সে যদি সত্যি লেসার রশ্মি ব্যবহার করে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, সে একজন বিজ্ঞানী। কারণ এখনও বিজ্ঞানী ছাড়া লেসার রশ্মি ব্যবহার কেউ করতে জানে না। করার ঝুঁকি সাংঘাতিক।
পুলিশও তাই বলছে।
বলে ম্যাডানসায়েব কৌটোর ভেতর পকেট থেকে একটা ব্যাংকের চেকবই বের করলেন। ফি–বাবদ আপনাকে অগ্রিম কিছু টাকা দিতে চাই কর্নেল সরকার। আমি আজ বিকেলের প্লেনে ক’দিনের জন্য বাইরে যাব। দরকার হলে আমার বাড়ি বা দোকানে টেলিফোনে কুসরোর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। তাকেও বলে যাব আপনার কথা।
ম্যাডান চেকবই খুললে কর্নেল বললেম, দুঃখিত মি. ম্যাডান। আমি ফি নিই না।
সে কি! এই কেসে আপনাকে–।
মি. ম্যাডান, আমি ডিটেকটিভ নই। বলে কর্নেল হালদারমশাইকে দেখিয়ে দিলেন। উনি ডিটেকটিভ। কী হালদারমশাই, কেস নেবেন নাকি?
