হালদারমশাই গুলি-গুলি চোখে তাকিয়ে কফি খাচ্ছিলেন। বললেন, কর্নেলস্যার! ঠিক ধরেছেন। লোকটার চেহারা সাহেবগো মতো।
এবার একটু আগ্রহ দেখিয়ে বললাম, ব্যাপারটা খুলে বলুন তো হালদারমশাই!
কফি শেষ করে হালদারমশাই যা বললেন তা মোটামুটি এই :
গতকাল সন্ধ্যায় তিনি দমদম এলাকায় এক অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে গিয়েছিলেন। ফিরতে রাত প্রায় দশটা হয়ে যায়। যশোর রোডের মোড়ে ট্যাক্সি বা বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন। শীতের রাত। ঘন কুয়াশা। রাস্তাঘাট সুনসান নিঝুম। হঠাৎ দেখলেন, তার পাশ দিয়ে একটা লোক রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার মধ্যিখানের আইল্যান্ডে বাগান করেছে পুরসভা। ঝোপঝাড়ে কালো হয়ে আছে। লোকটা সেখানে যেতেই কেউ সেই ঝোপ থেকে বেরিয়ে গুলি ছুঁড়ল। অমনই লোকটা তাকে দু-হাতে ধরে ওপরে তুলে আছাড় মারল। তারপর হনহন করে এগিয়ে ওপারের একটা বাড়ির গেটে ঢুকে গেল। কয়েক সেকেন্ডের ঘটনা।
পর-পর কয়েকটা গাড়ি চলে যাওয়ার পর হালদারমশাই দৌড়ে গেলেন। আবছা আলোয় দেখলেন, দলপাকানো রক্তাক্ত একটা দেহ ফুটপাত ঘেঁষে পড়ে আছে। এক্ষেত্রে অন্য কেউ হলে চ্যাঁচামেচি করে লোক ডাকত। কিন্তু হালদারমশাই স্বভাব-গোয়েন্দা। তাই সেই শক্তিমান লোকটার খোঁজেই ছুটে গেলেন।
গেটটা জরাজীর্ণ এবং ভেতরে প্রায় একটা জঙ্গল। তার ভেতর হানাবাড়ির মতো একটা দোতলা বাড়ি। ছায়ার আড়ালে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে হালদারমশাই পাঁচিল ডিঙোলেন। আগাছার জঙ্গলে ঢুকে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছেন, হঠাৎ নীচের একটা ঘরে আলো জ্বলে উঠল।
সাহস করে এগিয়ে একটা খোলা জানালায় উঁকি দিয়ে দেখলেন, সেই লোকটা বাথরুমে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজের মুখ দেখছে। একটা চোখ রক্তাক্ত। হালদারমশাই বুঝলেন, আততায়ীর গুলি তার চোখেই লেগেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, সে সেই চোখটা উপড়ে নিয়ে বেসিনে ট্যাপ খুলে ধুল। চোখের গর্ত থেকে সম্ভবত খুদে গুলিটাও টেনে বের করে ফেলল। তারপর চোখটা আবার পরে নিল।
দৃশ্যটা শুধু ভয়ংকর নয়, বীভৎসও। এই পর্যন্ত দেখে হালদারমশাইয়ের নার্ভের অবস্থা শোচনীয়। তিনি আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপতে-কাঁপতে পালিয়ে এলেন। ততক্ষণে রাস্তায় কিছু লোক জড়ো হয়েছে। গাড়ি চাপা পড়ে দুর্ঘটনা ধরে নিয়েই তারা উত্তেজিত। কিন্তু গোয়েন্দার স্বভাব। হালদারমশাই গুলির শব্দ শুনেছেন। তাই আগ্নেয়াস্ত্রটি খুঁজছিলেন। একটু পরে তা দেখতেও পেলেন। পয়েন্ট ২২ ক্যালিবারের কালচে রঙের রিভলভারটা পড়ে আছে হাত তিরিশেক দূরে ফুটপাতের ওপর। লোকের চোখ এড়িয়ে সেটি কুড়িয়ে নিলেন। তারপর গ্যারাজগামী একটি বাস দৈবাৎ পেয়ে গেলেন।
সারারাত ঘুমোতে পারেননি হালদারমশাই। পুলিশকে জানাতে ভরসা পাননি। কারণ তাকে নিয়ে পুলিশ মহলে প্রচুর ঠাট্টাবিদ্রূপ চালু আছে। তাছাড়া নিজেই এই রহস্যের সমাধান করার লোভ রয়েছে। তাই ভেবেচিন্তে কর্নেলস্যারের লগে কনসাল্ট করতে এসেছেন।….
কর্নেল চোখ বুজে শুনছিলেন। দাঁতের ফাঁকে জ্বলন্ত চুরুট। বললেন, সাহেবের মতো চেহারা?
হালদারমশাই বললেন, কতকটা মানে, মড়ার মতো দেখতে। মাথায় ঝাঁকড়া চুলগুলি কেমন লালচে। গড়নে আমার মতো লম্বা। তবে রোগাও না, মোটাও না।
বয়স অনুমান করতে পারেন?
হালদারমশাই আমাকে দেখিয়ে বললেন, জয়ন্তবাবুর কাছাকাছি হইব।
তা হলে যুবক বলা চলে।
হঃ! জয়ন্তবাবুর মতোই গোঁফদাড়ি কিছু নাই।
পোশাক?
প্যান্ট সোয়েটার। সোয়েটারের রং ব্লু– সরি! নেভি-ব্লু। বলে হালদারমশাই জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে খুদে একটি আগ্নেয়াস্ত্র বের করে কর্নেলকে দিলেন।
কর্নেল রিভলভারটি কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে দেখার পর বললেন, সিক্স রাউন্ডার চিনে অস্ত্র। কাজেই চোরা বেআইনি জিনিস। এটা আমার কাছে রাখতে আপত্তি আছে হালদারমশাই?
হালদারমশাই জোরে মাথা নেড়ে বললেন, নাহ। তবে কর্নেলস্যার, এখনই সেই বাড়িটা চেক করনের দরকার। চলেন, যাই গিয়া।
উৎসাহের সঙ্গে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, সেই সময় ডোরবেল বাজল। ষষ্ঠী একটু পরে একটা নেমকার্ড এনে বলল, এক সায়েব বাবামশাই! বেরৎ নাক।
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, নিয়ে আয়। তারপর অস্ত্রটি টেবিলের ড্রয়ারে ঢোকালেন।
হালদারমশাই ধপাস করে বসে পড়েছিলেন। আমিও একটু চমকে উঠেছিলাম। সায়েবভূতের কথা শোনার পর বেরৎ অর্থাৎ কিনা বৃহৎ নাকওয়ালা সায়েবের আবির্ভাবে বুক ধড়াস করে ওঠারই কথা। হালদারমশাই গুলি-গুলি নিষ্পলক চোখে বাইরের দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। কর্নেল কার্ডটা টেবিলে রেখে বললেন, পার্ক স্ট্রিটের বিখ্যাত ম্যাডান জুয়েলার্সের মালিক এফ এস ম্যাডান।
হালদারমশাই আশ্বস্ত হয়ে শ্বাস ছাড়লেন। আমিও।
সুটপরা ঢ্যাঙা রোগাটে গড়নের এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে করজোড়ে নমস্কার করে ইংরেজিতে বললেন, আমি কর্নেলসায়েবের সঙ্গে গোপনে কিছু কথা বলতে চাই।
হিরেচুরি সম্পর্কেই কি?
ম্যাডান একটু হেসে বললেন, তা হলে আমি ঠিক লোকের কাছেই এসেছি।
আপনি বসুন। তবে কী অর্থে আমাকে ঠিক লোক বললেন, জানি না। আপনার বাড়ির গোপন বেসমেন্টে রাখা ইস্পাতের ভল্ট থেকে ১৮২ ক্যারেটের একটা হিরে চুরির খবর গত মাসে কাগজে সবিস্তার বেরিয়েছিল। আপনার দাবি, হিরেটি নাকি ঐতিহাসিক।
