দীপু অবাক হয়ে বলল, এ কী! শঙ্করকাকা না?
হ্যাঁ। তোমার বাবার জ্ঞাতিভাই শঙ্করনাথ ভট্টাচার্য। তোমাদের বাড়ি থেকে পাঁচ হাজার টাকা চুরি করে পালিয়েছিল। তুমি তখন আসানসোলে কলেজ-স্টুডেন্ট। তোমার বাবার কাছে জেনে নিয়ো কী সাংঘাতিক আর জঘন্য চরিত্রের লোক এই শঙ্করনাথ। মি. ধাড়া! আসামি নিয়ে থানায় চলুন। আমি পরে দেখা করব।
দারোগাবাবু এবং কনস্টেবলরা আসামি নিয়ে চলে গেলেন। হালদারমশাই কঙ্কালটা পরীক্ষা করছিলেন। খি-খি করে হেসে বললেন, কী কাণ্ড! আমি ভাবছিলাম বোঁচকা থেকে বেরিয়ে– খি-খি-খি!
বললাম, কিন্তু ওই অদ্ভুত ছড়াটার মানে কী?
কর্নেল, বললেন, ওই দ্যাখো, বার-পনেরো-চাঁদা উঠেছে। বুড়ো শিবের ত্রিশুলের ছায়া কোথায় পড়েছে লক্ষ্য করো! ওখানে খুলিটা পোতা ছিল। হুঁ, গোড়া থেকে বুঝিয়ে দিই। আঁটঘাট বাঁধা নয়, কথাটা হল আটঘাট বাঁধা। এই ঝিলের চারদিকে বাঁধানো ঘাট আছে। বুড়ো শিবের মন্দির তো দেখতেই পাচ্ছ। বার পনেরো চাঁদ মানে বারো নম্বর মাস অর্থাৎ চৈত্র মাস। পনেরো হচ্ছে চাঁদে পঞ্চদশী তিথি। তার মানে চৈত্র মাসে পূর্ণিমার চাঁদ যখন বুড়ো শিবের ত্রিশূলের মাথায় দেখা যাবে, ত্রিশূলের ছায়া যেখানে পড়বে, সেখানেই খুলি পোঁতা আছে। তাই ছড়ায় আছে : বুড়ো শিবের শূলে। আমার মাথায় ছুঁলে। কিন্তু চূড়ার জট ছাড়ানোর আগেই জগাই খুলির খোঁজ দিয়েছিল শঙ্করনাথকে।
গুপ্তধনের কী হল?
তুমি ভুলে গেছ জয়ন্ত, পাতালঘরের দেওয়ালে আমরা সিদুরে আঁকা স্বস্তিকাচিহ্ন দেখেছি। সিলের একপিঠে স্বস্তিকা আছে। অন্যপিঠে দেবী চণ্ডিকার মূর্তি। ওই মূর্তিটাই গুপ্তধন। প্রায় এক কেজি ওজনের সোনার দেবীমূর্তি। থানায় খবর দিয়ে দিপুদের বাড়ি গিয়ে গুপ্তধন উদ্ধার করেছি। স্বস্তিকা আঁকা ছিল যেখানে, সেখানে খুঁড়তেই সোনার মূর্তি পাওয়া গেল। কাজেই সিলটা শঙ্করনাথের ডেরায় রেখে এসেছিলাম। ওটাই ফাঁদ। বুঝলে তো?
হালদারমশাই উদাস চোখে চাঁদ দেখছিলেন। বললেন, চলেন কর্নেলস্যার। বাংলোয় গিয়া বোঁচকাটা দেখা দরকার।
.
কর্নেল কঙ্কালটা দিব্যি ভাঁজ করে গুটিয়ে বললেন, বোঁচকা আছে। শঙ্করনাথ-তান্ত্রিক আদিনাথের কঙ্কাল আর খুলিতে সিল না পেয়ে খাপ্পা হয়ে ওটা রামুর গাধার পিঠে বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু গাধাটাকে এই কাজে লাগাতে হলে রামুকে ভয় দেখিয়ে ঘাট থেকে তাড়ানো দরকার ছিল। তাই ম্যাজিকবাবুর কঙ্কাল দেখিয়ে বেচারাকে ভাগিয়ে দেয়। আস্ত কঙ্কালের নাচ দেখে রামুর পাগল হওয়া স্বাভাবিক। তবে এবার ওকে সুস্থ করা যাবে।
.
আমরা বাংলোয় ফিরে চললাম।
২.০২ ইয়াজদার্গিদের হিরে
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার অর্থাৎ আমাদের প্রিয় হালদারমশাই সবেগে ঘরে ঢুকে সশব্দে সোফায় বসে ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলেন, অসম্ভব! অবিশ্বাস্য! অদ্ভু-উ-ত!
তার চোখ দুটো গুলি-গুলি এবং গোঁফের ডগা তির তির করে কাঁপছিল। এ-পকেট ও-পকেট খোঁজাখুঁজি করে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, ফ্যালাইয়া আইছি।
বুঝলাম জিনিসটা নস্যির কৌটো। উত্তেজনার সময় ওঁর মুখে মাতৃভাষা বেরিয়ে আসে। তাছাড়া খানিক নাটুকে স্বভাবের মানুষও বটে। সামান্য ব্যাপারে তিলকে তাল করে ফেলেন। পেশাদার গোয়েন্দা হওয়ার দরুন সবসময় সবকিছুতে সন্দিগ্ধ হয়ে রহস্য খোঁজেন।
বিশালদেহী কর্নেল নীলাদ্রি সরকার চোখ বুজে সম্ভবত কোনও দুর্লভ প্রজাতির প্রজাপতি দেখছিলেন এবং সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে সেটির জৈব গোত্র বিচার করছিলেন। জানালা দিয়ে ছিটকে পড়া রোদ্দুরে ওঁর চওড়া টাক ঝকমক করছিল। বললেন, অদ্ভুতের সঙ্গে ভূতের সম্পর্ক আছে হালদারমশাই!
হঃ! ঠিক কইছেন, হালদারমশাই সোজা হয়ে বসলেন। ভূত। ভূত!
হাসি চেপে বললাম, কোথায় দেখলেন হালদারমশাই?
হালদারমশাইয়ের মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। চাপা গলায় বললেন, চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে সার্ভিস করছি। রিটায়ার্ড লাইফে প্রাইভেট ডিটেকটিভ অ্যাজেন্সি খুলছি। ড্যাঞ্জারাস-ড্যাঞ্জারাস ক্যাস হাতে লইছি। কখনও ভূত দেখি নাই। কাইলই রাত্রে স্বচক্ষে দ্যাখলাম।
ভূত দেখলেন?
হঃ! ভূত ছাড়া কী? নিজের একখান চক্ষু খুইলা বেসিনে রাখল। জলে ধুইয়া ফের পইরা লইল।
হাসতে-হাসতে বললাম, নকল চোখ বা নকল দাঁত অনেকেই পরেন।
হালদারমশাই চটে গিয়ে বললেন, জয়ন্তবাবু! আমি পোলাপান না। বেসিনের জলে রক্ত দেখছি।
ভূতের শরীরে রক্ত থাকে নাকি?
হালদারমশাই আরও খাপ্পা হয়ে কী বলতে যাচ্ছিলেন, ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে গেল। ওঁর জন্য স্পেশাল কফি অর্থাৎ তিনভাগ দুধ একভাগ লিকার। উনি কফির দিকে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
আমার বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ বন্ধু এতক্ষণে চোখ খুলে কফির পেয়ালা তুলে নিলেন। অভ্যাসমতো আওড়ালেনও ‘কফি নার্ভকে চাঙ্গা করে’। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ডারউইনসায়েবের বিবর্তনবাদ ভূতের ক্ষেত্রেও খাটে ডার্লিং! নিয়ানডারথ্যাল মানুষ থেকে ক্রোম্যাগনন মানুষ। তা থেকে হোমো-সাপিয়েন্স, আমরা যে-মানুষ। সেইরকম আদিম ভূত থেকে বর্তমান ভূত। এ-ভূতের রক্তও থাকতে পারে। হলিউডে তৈরি সায়েবভূতের ছবি দেখেছে। ড্রাকুলার ভূত রক্তচোষা ভূত ছিল। দিশি ভূত ঘাড় মটকাত। কিন্তু রক্ত খেত না। বিলিতি ভূতের চরিত্রই অন্যরকম। তারা যেমন রক্ত খায়, তেমনই তাদের শরীরে রক্তও থাকে। আধুনিক সায়েবভূত কীরকম, চিন্তা করো!
