বোঁচকাটা ঝটপট বেঁধে হালদারমশাই বললেন, আপনি কাইল রাত্তিরে দেখছিলেন, একটা কঙ্কাল আমারে বলি দিতে চাইছিল? হেই ব্যাটাই! কিন্তু খড়্গ গেল কই?
বললাম, কাপালিকের কাছে।
হঃ। ঠিক কইছেন। বলে হালদারমশাই বারান্দায় এলেন। ধপাস করে বসে জোরে শ্বাস ছাড়লেন। বোঝা গেল, এতক্ষণে উনি বেজায় উত্তেজিত।
একটু করে কফি খেতে খেতে আমরা গুপ্তধন রহস্য নিয়ে আলোচনা করছি, রঘুলাল ব্যাপারটা বোঝবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছে এবং লনে দাঁড়িয়ে উদাস চোখে ঝিলের দিকে তাকিয়ে আছে, হঠাৎ বলল, কর্নেলসাব আসছেন। ওই দেখুন।
ঝিলের ধারে জঙ্গলের ভেতর কর্নেলকে হন্তদন্ত আসতে দেখলাম। হালদারমশাই হন্তদন্ত গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে গেটের নীচে কর্নেলের টুপি দেখা গেল। হালদারমশাই জয়ের উল্লাসে বলে উঠলেন, বোঁচকার ভেতর স্কেলিটন অ্যান্ড স্কাল!
সাড়ম্বরে ঘটনার বিবরণ দিতে দিতে হালদারমশাই কর্নেলের সঙ্গে বাংলোর বারান্দায় ফিরে এলেন। রঘুলাল আবার কফি করতে গেল। বললাম, গেলেন তো থানায়। ফিরলেন জঙ্গল থেকে। নিশ্চয় অর্কিড খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন না জঙ্গলে?
কর্নেল হাসলেন। মুখে ক্লান্তির ছাপ। বললেন, ফাঁদ পাততে গিয়েছিলাম।
কিসের ফাঁদ?
কাপালিক ধরার। হালদারমশাই ওর ডেরার খোঁজ দিয়েছেন। সেই ডেরায় ঢুকে গুপ্তধনের সূত্র অর্থাৎ সিলটা রেখে এলাম। সঙ্গে একটা চিঠি। সন্ধ্যা সাতটায় ঝিলের পুবের ঘাটে বুড়ো শিবের মন্দিরের সামনে দেখা করতে লিখেছি। শর্ত দিয়েছি, গুপ্তধনের আধাআধি বখরা চাই। দেখা যাক টোপ গেলে কি না। গুপ্তধনের লোভ অবশ্য সাংঘাতিক।
অবাক হয়ে বললাম, সিলটা রেখে এসেছেন! করেছেন কী!
কর্নেল চাপা স্বরে সকৌতুকে বললেন, বলেছি ডার্লিং, আজ রাতে কঙ্কালের নাচ দেখব। আর হালদারমশাই স্বচক্ষে দেখবেন তাকে কে বলি দেবে বলে শাসাচ্ছিল।
হালদারমশাই বললেন, সে-ব্যাটা তো ওই বোঁচকার ভেতর বাঁধা আছে।
হালদারমশাই! প্রেতাত্মা তার কঙ্কালসুদ্ধ বোঁচকা থেকে বেরিয়ে পড়বে। যাইহোক, রঘুলালকে দিয়ে ওটা আপাতত বাথরুমে রাখতে হবে। এখন সাড়ে পাঁচটা বাজে। পৌনে সাতটায় আমরা বুড়ো শিবমন্দিরের ওখানে পৌঁছোব।
.
একটা চুড়ান্ত মুহূর্তের দিকে পৌঁছোতে গেলে যা হয়। সময় যেন কাটতে চায় না। সাড়ে ছটায় আমরা বেরিয়ে পড়লাম। নীচের রাস্তা দিয়ে ঘুরে ঝিলের উত্তর পাড় ধরে কর্নেল এগোলেন। স্তূপ, খানাখন্দ, ঝোপঝাড় পেরিয়ে মোটামুটি ফাঁকা জায়গা দেখা গেল। সবে চাঁদ পুবের গাছপালার মাথা আলো করে উঁকি দিচ্ছে। হালদারমশাই ফিশফিশ করে বললেন, আরে! এখানেই তো কাপালিক মাটি খুঁড়ছিল।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। খুলি পোঁতা ছিল এখানেই। ওই দেখুন, বুড়ো শিবের মন্দির। চুড়োয় একটা ত্রিশূল পোঁতা আছে।
এই সময় কাছাকাছি কেউ বলে উঠল, এসে গেছি কর্নেল!
চলে এসো দিপু!
দীপক একটা স্তূপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। হাতে সেই বল্লম আর টর্চ। কর্নেল আমাদের নিয়ে ফাঁকা জমিটায় গেলেন। তারপর বললেন সবাই মন্দিরের আড়ালে যাও। কুইক! দিপু, এদের নিয়ে যাও। সাবধান! টুঁ শব্দটি করবে না।
কতকালের পুরোনো মন্দির। তার একপাশে ঘন ছায়ায় আমরা তিনজনে বসে রইলাম। কর্নেল ফাঁকা জমিটায় পায়চারি করছিলেন। আশ্চর্য ব্যাপার, একটু পরে ওঁকে সেই ছড়াটা আওড়াতে শুনলাম। ছড়াটা বার-দুই আউড়েছেন, কেউ খ্যানখ্যানে গলায় বলে উঠল, ওঁ, হ্রীং ক্লীং ফট! তারপর দপ করে একটা মশাল জ্বলে উঠল। পেছনে ঘন ঝোপ। ঝোপের মাথায় মশালটা আটকানো মনে হল।
হঠাৎ ঝোপ ডিঙিয়ে একটা আস্ত নরকঙ্কাল লাফ দিয়ে এসে দাঁড়াল। তার দু-হাতে ধরা একটা চকচকে খাঁড়া নেড়ে তেমনই ভুতুড়ে গলায় বলল, এসেছিস? আয়, আয়! কাছে আয়!
কর্নেল কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে বললেন, দেবী চণ্ডিকার গুপ্তধন কি উদ্ধার হয়নি?
কাছে আয়। কথা হবে।
আর কিসের কথা মশাই? সিল তো পেয়ে গেছেন।
কঙ্কাল খাঁড়া নামিয়ে বলল, চালাকি? আমি কে জানিস? আমি তান্ত্রিক আদিনাথ। আমার দেবীর ধন। আমার সঙ্গে ফক্কুড়ি? তবে রে ব্যাটা বুড়ো টিকটিকি!
এবার যেন কর্নেলেরই আমার মতো মাথা খারাপ হয়ে গেল। টিকটিকি বলার জন্যই কি খেপে গেলেন? রিভলভার বের করে দৌড়ে গেলেন। কঙ্কালটা তড়াক করে ঝোপ ডিঙিয়ে পালাতে যাচ্ছিল। ঝোপে আটকে গেল। তারপর হঠাৎ ঝোপের ওপাশে অনেক টর্চের আলো জ্বলে উঠল। ধুপধাপ, দুদ্দাড়, ছুটোছুটি শব্দ। আমরা দৌড়ে কর্নেলের কাছে গেলাম। কর্নেল সেই কঙ্কালটা ঝোপের ডগা থেকে নামিয়ে এনে বললেন, ম্যাজিকবাবুর ম্যাজিক কঙ্কাল! ম্যাজিকের স্টেজে পুতুলনাচের কৌশল পেছন থেকে প্লাস্টিকে তৈরি কঙ্কালটাকে দড়ির সাহায্যে কনট্রোল করা হত। হুঁ, খাঁড়াটা দেখছি পিসবোর্ডে মোড়া রাংতার। বলে হাঁক ছাড়লেন, কই মি. ধাড়া! আপনার আসামি কোথায়?
ঝোপের পেছন থেকে সাড়া এল, বড্ড বেয়াড়া আসামি! এক মিনিট কর্নেল!
তারপর সদলবলে বেরিয়ে এলেন সত্যিকার খাড়া হাতে এক দারোগাবাবু। তার পেছনে কনস্টেবলরা লাল কাপড়পরা এক কাপালিককে বেঁধে নিয়ে এল। দারোগাবাবু বললেন, খাড়াটা দেখেছেন? হাতে এটা ছিল বলেই অ্যারেস্ট করতে একটু দেরি হল।
কর্নেল কাপালিকের জটাজুট এবং গোঁফদাড়ি হ্যাঁচকা টানে খুলে দিয়ে টর্চ জ্বেলে বললেন, দ্যাখো তো দিপু, লোকটাকে চিনতে পারো কি না?
