হ্যাঁ। জগাইকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিল, এসে গেছি। যাই হোক, এবার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিই। বলে কর্নেল তার কিটব্যাগ থেকে প্যাড বের করে আঁকজোক শুরু করলেন। তারপর বললেন, এটা একটা ওলটানো ত্রিভুজ।
…এ বিন্দু ভজুয়া, বি বিন্দু জগাই এবং সি বিন্দু ম্যাজিকবাবু শচীন হাজরা, মাঝখানে ডি বিন্দু হল শঙ্কর নামে একটা লোক। যে কোনো কারণেই হোক শঙ্কর প্রকাশ্যে কঙ্কগড়ে আসতে পারে না। অথচ সে দেবী চণ্ডিকার গুপ্তধন-রহস্য জানে। সে তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল।
এতদিন পরে সে ম্যাজিকবাবুর সাহায্যে প্রথমে তান্ত্রিক আদিনাথের ধড় হাতাল। কিন্তু সিলের অর্ধাংশ পেল না। তখন ম্যাজিকবাবু ওটা হাতিয়েছে সন্দেহ করে তাকে খতম করল। তারপর জগাই মুন্ডু উদ্ধার করে দিলে। কিন্তু মুণ্ডুতেও সিলের বাকি আধখানা নেই। থাকবে কী করে? মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। সন্দেহক্রমে খাপ্পা হয়ে সে জগাইকে খতম করল। কারণ সে ধরেই নিয়েছিল গুপ্তধনের লোভে তাকে ওরা ফাঁকি দিচ্ছে। বাকি রইল ভজুয়া। আমার ধারণা, ভজুয়ার সঙ্গে বোঝাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিল শঙ্কর। নিশ্চয় ওকে লোভ দেখিয়ে বাগে এনেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকেও সন্দেহক্রমে খতম করেছে। গুপ্তধনের লোভ পেয়ে বসলে মানুষ হিংস্র হয়ে ওঠে। তিন-তিনজনকে সে অবশ করে দেবী চণ্ডিকার থানে এনে বলি দিয়েছে। দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে। কিন্তু সে আশা ছাড়েনি। দিপুর বাবা গোয়েন্দা এনেছেন কলকাতা থেকে, সে জেনে গিয়েছে। তাই ভেবেছে, গোয়েন্দার ওপর বাটপাড়ি করবে। আসলে আমাদের হালদারমশাই অতি-উৎসাহে- ঠিক তোমার মতোই…।
বাধা দিয়ে বললাম, জ্যান্ত কঙ্কাল চোখের সামনে নাচতে দেখলে মাথার ঠিক থাকে না।
কর্নেল সেই কালো আধখানা সিলটা লোশন দিয়ে পরিষ্কার করতে থাকলেন। বললেন, আজ পুর্ণিমা। আজ রাতে আবার কঙ্কালের নাচ দেখাব তোমাকে। শিয়োর!
দুপুরে আমার ভাতঘুমের অভ্যাস আছে। কিছুক্ষণ পরে কর্নেলের ডাকে ঘুমটা ভেঙে গেল। কর্নেল সিলের টুকরো দুটো জোড়া দিয়েছেন। বললেন, একপিঠে দেবী চণ্ডিকার রণমূর্তি। অন্যপিঠে শুধু স্বস্তিকাচিহ্ন। ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। গুপ্তধনের সূত্র কোথায়? দেবী চন্ডিকা আর স্বস্তিকা। কর্নেল টাকে হাত বোলাতে থাকলেন। চোখ বুজে গেল।
একটু পরে চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। বললাম, গুপ্তধনটা গুলতাপ্পি নয় তো?
কিছু বলা যায় না। যাকগে চলো। বেরোনো যাক।
গুপ্তধনের খোঁজে?
নাহ। থানায়।
থানায় যেতে আমার ভালো লাগে না। আপনি যান।
কর্নেল উঠে দরজার কাছে গিয়ে বললেন, ঠিক আছে। বরং তুমি রামুর গাধাটা ধরতে হালদারমশাইকে সাহায্য করতে পারো। ওই দ্যাখো, ঝিলের দক্ষিণের ঘাটে হালদারমশাই ওত পেতে বসে আছেন।
বারান্দায় গিয়ে দেখি, সত্যি তাই। হালদারমশাই ঘাটের পাশে একটা ঝোপের ধারে বসে আছেন! গাধাটা দেখতে পেলাম না। কর্নেল চলে যাওয়ার পর রঘুলালকে ঘরের দিকে লক্ষ্য রাখতে বলে বেরিয়ে পড়লাম। নীচের রাস্তায় নেমেছি, হালদারমশাইয়ের চিৎকার শোনা গেল।
জয়ন্তবাবু! জয়ন্তবাবু! গাধা! গাধা!
পিঠে বোঁচকাবাঁধা গাধাটা জঙ্গল ফুঁড়ে ছুটে আসছিল। আমি দু-হাত তুলে এগিয়ে যেতেই ঝিলের ঢালে নেমে গেল। তারপর দিব্যি জলজঘাসের দিকে মুখ বাড়াল। আমি রঘুলালকে ডাকলাম। সে দৌড়ে এল। বললাম, গাধাটা ধরতে হবে। বকশিশ পাবে রঘুলাল।
হালদারমশাই থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, গাধা কয় আর কারে!
রঘুলাল একটা মজার কাজ পেয়ে গেল যেন। সে বলল, চ্যাঁচামেচি না করে তিনজনে তিনদিক থেকে ঘিরে ধরতে হবে স্যার। রামুর গাধাটা খুব বদমাশ! লাথি ছুঁড়তে পারে।
হালদারমশাই বললেন, দড়ি লও রঘুলাল! আমার কাছে দড়ি আছে।
রঘুলাল দড়ি নিয়ে পা টিপেটিপে এগোলো। বললাম, দড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলেন নাকি?
হালদারমশাই হাসলেন। নাহ। কাইল রাত্রে কাপালিক আমারে এই দড়ি দিয়া বাঁন্ধছিল না?
রঘুলাল চাপা গলায় বলল, আপনারা দু-দিকে রেডি থাকুন সার?
সে কাছাকাছি যেতেই গাধাটা ঘুরল। অমনই রঘুলাল তার গলায় দড়ির ফাঁস আটকে দিল। হালদারমশাই এবং আমি গিয়ে দড়ি ধরে ফেললাম। টাগ অব ওয়ারে শেষ পর্যন্ত গাধাটা পরাস্ত হয়ে ঘাসে পড়ে গেল। হালদারমশাই তার পিঠ থেকে বোঁচকাটা খুলে নিয়ে বললেন, খুব জব্দ এবার। রঘুলাল! ওকে ছেড়ে দাও! কিন্তু ইস্! বোঁচকাটায় কী বিটকেল গন্ধ!
গাধা বেচারা গলায় দড়ির ফাঁস নিয়ে নড়বড় করে দৌড়ে রাস্তায় উঠল। বুঝলাম, বুদ্ধিমান গাধা। জঙ্গলে ঢুকলে দড়িটা কোথাও আটকে গিয়ে বিপদে পড়ত।
হালদারমশাই বাংলোয় এলেন আমার সঙ্গে। কর্নেল নেই শুনে নিরাশ হলেন। বোঁচকা থেকে সত্যি বিকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। সেটা এনে ফেলে রেখে বারান্দায় বসলাম আমরা। রঘুলাল কফি করতে গেল। হালদারমশাই সন্দিগ্ধভাবে বললেন, বোঁচকায় কী আছে যে, এমন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। গাধার পিঠে এটা বাঁধলই বা কে?
হাসতে-হাসতে বললাম, খুলে দেখুন না! গুপ্তধন থাকতেও পারে।
হালদারমশাইয়ের ধৈর্য রইল না আর। উঠে গিয়ে নোংরা কাপড়ের বোঁচকাটা খুলে ফেললেন। তারপর লাফিয়ে উঠে বললেন, সর্বনাশ! মড়ার খুলি আর হাড়গোড়ে ভর্তি।
চমকে উঠেছিলাম। বুক ধড়াস করে উঠেছিল। বললাম, এই সেই তান্ত্রিক আদিনাথের কঙ্কাল।
