দীপক চমকে উঠে বলল, ভজুয়ার সাহায্যে? অসম্ভব।
সম্ভব ডার্লিং! কর্নেল সোফায় বসে চুরুট ধরালেন। যখের ধনের লোভ সবচেয়ে সাংঘাতিক লোভ। চিন্তা করে দ্যাখো। ওই পাতালঘর থেকে ভজুয়ার সাহায্য ছাড়া কারও পক্ষে কাজটা সম্ভব ছিল না। তোমার ঠাকুরদার বইয়ে লেখা আছে, কবন্ধ লাশ দুমড়ো-মুচড়ে কাপড়ে বেঁধে সিন্দুকে ঢোকানো হয়েছিল। এতকাল পরে কাপড় আস্ত থাকার কথা নয়। কাজেই হাড়গোড়গুলো আবার একটা কাপড়ে বা চটের থলেয় ভরে নিয়ে গিয়েছিল দুজনে। এদিকে মাংস গলে পচে কাপড় গুড়ো হয়ে এই জিনিসটা সিন্দুকের তলায় খসে পড়েছে এবং সেঁটে গেছে।
জিনিসটা কর্নেল দেখলেন বাংলোয় দেখা আধখানা চাঁদের গড়ন সেই সিলের বাকি টুকরো বলে মনে হল। বললাম, একটা গোটা সিল দু-টুকরো করার কারণ কী?
কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, বইয়ে তান্ত্রিক আদিনাথের ছবি আছে। শিবের জটায় চন্দ্রকলার ছবি দেখেছ তো? ওঁর জটাতেও তেমনই আধখানা খুদে চাঁদের মতো জিনিস আছে। প্রথমে গ্রাহ্য করিনি। পরে দেখলাম ওঁর ডান বাহুতে তাগার মতো অবিকল একই জিনিস বাঁধা আছে। আতশ কাচে দুটোই পরীক্ষা করে বুঝলাম একটা খুদে সিলের দুটো টুকরো। কী সব খোদাই করা আছে ওতে! তখনই বুঝলাম তান্ত্রিক আদিনাথ যত বুদ্ধিমান ছিলেন, তাঁর ভাইপো হরনাথ মানে, দিপুর ঠাকুরদাও তত বুদ্ধিমান ছিলেন। হরনাথ লিখেছিলেন, দেবী চণ্ডিকার ধনে লোভ করা উচিত নয়। বইয়ে ধ হরফ এবং লো হরফ পোকায় কেটেছে। তাই দিপুর বাবা ব্যাপারটা প্রথমে বুঝতে পারেননি। দু-দুটো নরবলির পর ওঁর সন্দেহ হয়। তাই আমার কাছে ছুটে গিয়েছিলেন?
দিপু বলল, বাপস! মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। সেকালের লোকেরা কী অদ্ভুত ছিল!
হ্যাঁ। এখন তা-ই মনে হচ্ছে। কিন্তু হরনাথ ধর্মপ্রাণ মানুষ। দেবী চণ্ডিকার ধনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বংশধরদের হাতে দিতে চেয়েছিলেন। ওই ছড়াটা উনি তাই নিজেই রচনা করে লিখে গেছেন। এর মধ্যে একটা সূত্র লুকানো আছে। সিলের আধখানা তো সিন্দুকে নিরাপদে রইল। বাকি আধখানা খুঁজে বের করার জন্য ওই ছড়া! কিন্তু ছড়াটা কাজে লাগেনি। জগাই জানত, মুন্ডু কোথায় পোঁতা আছে।
বললাম, কিন্তু তান্ত্রিক আদিনাথকে বলি দিল কে? কর্নেল হাসলেন। ওটা গপ্পো। আমার থিয়োরি হল, আসলে জ্যাঠামশাইয়ের মৃত্যুর পর দেবী চণ্ডিকার লুকিয়ে রাখা ধন যাতে সহজে কেউ খুঁজে না পায় তাই হরনাথ একটা সাংঘাতিক কাজ করেছিলেন। মৃতদেহের মুণ্ডু কেটে কোথাও পুঁতে রাখার জন্য…
বাধা দিয়ে বললাম, বোগাস। আপনার থিয়োরর মাথামুণ্ডু নেই। সিলের টুকরো দুটো লুকিয়ে রেখে গেলেই পারতেন! কোনও বদ্ধ পাগল ছাড়া মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা দিতে পারে না।
কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সাড়ে বারোটা বাজে। চলি দিপু! ওবেলা এসে তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করব।
দীপক হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বাইরে গিয়ে বললাম, জগাই কী করে জানল কোথায় মুণ্ডু পোঁতা আছে?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, তুমি তো কথাটা শেষ করতেই দিলে না। আমি কি বলেছি হরনাথ নিজের হাতে তান্ত্রিক জ্যাঠার লাশের মুণ্ডু কেটে ছিলেন? মড়া কাটার জন্য ওঁর একজন লোকের দরকার ছিল। জগাইরা পুরুষানুক্রমে এই কাজ করে। হরনাথের বইয়ে একজনের উল্লেখ আছে। তার নাম গদাই। নিশ্চয় জগাইয়ের ঠাকুরদা বা তার বাবা। নামে নামে মিল। এদিকে তো পূর্বপুরুষের কোনও গোপন কথা বংশানুক্রমে পরিবারে চালু থাকে। এই পরিবারেও ছিল। আমার থিয়োরি নিখুঁত, ডার্লিং!
কী করে অত নিশ্চিত হচ্ছেন?
জগাই একইভাবে খুন হয়ছে বলে। কর্নেল গেট পেরিয়ে একটা সাইকেল রিকশা ডাকলেন। তারপর বললেন, বাংলোয় ফিরে বুঝিয়ে দেব।
বাংলোয় পৌঁছে দেখি, হালদারমশাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। উত্তেজিতভাবে এগিয়ে এসে চাপা স্বরে বললেন, কাপালিকের ডেরা ডিসকভার করেছি কর্নেল! গড়খাইয়ের ওপারে একটা গুহার মতো গম্বুজঘরে সে থাকে। কম্বলের তলায় ভাজকরা এই চিঠি ছিল।
কর্নেল ওঁর হাত থেকে ইনল্যান্ড লেটার নিয়ে বললেন, দিপু আপনার জন্য ভেবে সারা। শিগগির গিয়ে ওকে দেখা দিন। আর শুনুন! একটা দায়িত্ব দিচ্ছি। রামুর গাধার পিঠে একটা বোঁচকা বাঁধা আছে। গাধাটা নয়, বোঁচকাটা খুব দরকার।
হালদারমশাই লাফিয়ে উঠলেন। কই? কই সে?
খেয়েদেয়ে খুঁজতে বোরোবেন। ঝিলের জঙ্গলেই দেখা পেতে পারেন। কিছুক্ষণ আগে ওকে তাড়া করে ওদিকেই পাঠিয়ে দিয়েছি।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ সবেগে উধাও হয়ে গেলেন।
খাওয়াদাওয়ার পর কর্নেল ইনল্যান্ড লেটার পড়ে আমাকে দিলেন। চিঠিতে লেখা আছে :
শঙ্করদা,
পত্রপাঠ চলে আসুন জগাই রাজি হয়েছে। ভজুয়াও রাজি। গতবারের মতো সেজে আসবেন। শ্মশানতলায় থাকবেন। মা চণ্ডীর কৃপায় এবার আর ব্ল্যর্থ হব না। প্রণাম রইল। ইতি
নাম ঠিকানা ইংরেজিতে লেখা! শ্রী এস. এন. ভট্টাচার্য। কেয়ার অব জয়চণ্ডি অপেরা। ৩৩/১, ঠাকুরপাড়া লেন, কলকাতা-৫।
বললাম, যাত্রাদলের লোক?
কর্নেল হাসলেন। তাই তো মনে হচ্ছে। তার পক্ষে কাপালিক সাজা সহজ। এবার এই চিরকুটটা দ্যাখো। ম্যাজিকবাবু শচীন হাজরার বাকসে পেয়েছি।
চিরকুটটা দেখেই বললাম, আমাকে যে চিরকুটটা ছুঁড়ে কাল বিকেলে ভয় দেখিয়েছিল, তারই লেখা। ম্যাজিকবাবুকে শ্মশানতলায় ডেকেছিল দেখছি। তলায় ইংরেজিতে এস লেখা, সেই শঙ্করদা!
